—সাড়া নেই।
—আবার ডাকলুম—মেজদি। আমার ডাক শুনেই মেজদি যেন তাড়াতাড়ি সরে যেতে চাইলো। আমি আবার ডাকলুম–কে?
এবার আমার ডাক শুনেই পেছন ফিরে চাইলো মূর্তিটা। তার মুখখানা দেখেই চমকে উঠেছি। আর সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে দাতে দাত লেগে গিয়েছে। আমার শাশুড়ী তখন বেঁচে। জ্ঞান হতে দেখি, শাশুড়ী মাথার কাছে বসে। বললেন—একলা রাত্রে বাইরে এসো না বৌমা—যখনি উঠবে চিন্তাকে সঙ্গে নিও।
ভূতনাথ বললে—আমিও একদিন দেখেছি বোঠান।
—তুই আর আমিই শুধু দেখেছি—এ-বাড়ির আর কেষ্ট দেখলে না।
সত্যি সত্যি, আর কেউ দেখলে তো এ-বাড়ির ইতিহাস অন্যরকম হতো। এই তো সেদিন হঠাৎ বড়বাড়ি আবার উৎসবের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছিল। এবার অনেক সাহেব, অনেক মাৰোয়াড়ী এসেছে। সকাল থেকেই হৈ-চৈ হট্টগোল। দেউড়িতে ব্রিজ সিং নতুন উর্দি পরে সেজে-গুজে হাজির। সারা বাড়ি ধোয়া মাজা। সাহেবী হোটেল থেকে বিলিতি খানাও এল।
ভূতনাথও প্রথমে বুঝতে পারেনি। বংশীকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে—ব্যাপার কী বংশী?
বংশী বললে কে জানে শালাবাবু, কিছুই তো শুনিনি।
লোচনের আজ বেশি কাজ নেই। এ বিলিতি ব্যাপার। এতে তামাক খাবার আয়োজন নেই। সায়েব সুবো যারা আসবে সবাই খাবে সিগারেট। তবু নেহাৎ রাখতে হয়। কেউ যদি চেয়ে বসে। সে-ও তাই ধোয়া-মোছা করে তৈরি হয়ে থাকছে। বলে—বলা নেই কওয়া নেই—এ কী হুজুং বলুন তো—আজকে আমার দোকানের বায়না হবার দিন।
-কীসের দোকান লোচন?
–আমার সেই পানের দোকান আজ্ঞে, আমি তো বাড়ি ছেড়ে যেতে পারিনে—হঠাৎ যদি ডাক পড়ে তখন? আমাকে কাল সকালে খবর দিলে সরকার মশাই।
—কী হবে এখানে!
–এই যেমন হয় মাঝে-মাঝে তেমনি আর কি, বাবুরা খাবেদাবে, গল্প-গুজব করবে—তবে এদানি তত বাবুদের এ-সব বহুদিন ছিল না, আগে ঘন-ঘন হতো, আবার হয় তো খেয়াল হয়েছে—কে জানে!
—তা তামাক খাবে না কেউ? সব সিগারেট খাবে।
—আজ্ঞে, সরকার মশাই তো তাই বললে। আমি বললামতামাক আনিয়ে দিতে হবে, শুনে সরকার মশাই বললে-ওই যাতামাক তোমার আছে ওতেই চালিয়ে নাও, আজ আর সাহেবরা কেউ তোমার তামাক খেতে আসবে না, সিগারেট চুরেটের খদ্দের সব, বুঝলে।
জিজ্ঞেস করলাম—এসব কোন্ সাহেব?
সরকার মশাই বললে—এসব বড় বড় সাহেব, ম্যাকফারলেন সাহেব আসবে কার্টার কোম্পানীর, ফাগুসন সাহেব আসবে, নতুন এসেছে বিলেত থেকে, মেজবাবুর সব নতুন বন্ধু, আরো সব অনেকে আসবে, বড়বাজারের গদি থেকে মারোয়াড়ী মহাজনরাও আসবে, সকলে ফর্সা জামা কাপড় পরবি, নোংরা হয়ে যেন কেউ না থাকে—এই তো শুনলুম শালাবাবু।
সন্ধ্যেবেলা মোটরগাড়ি আর ঘোড়ার গাড়িতে ছেয়ে গেল বনমালী সরকার লেন। এ-মোড় থেকে ও-মোড় পর্যন্ত। বিলিতি হোটেলের খানসামা বাবুর্চি গাড়ি করে খাবার-দাবার বইয়ে নিয়ে এল। নাচ ঘরের ভোল গেল বদলে। ফরাস সরিয়ে চেয়ার টেবিল সার-সার সাজানো হলো। টেবিলের ওপর সাদা ধবধবে চাদর। তার ওপর ফুলদানীতে ফুলের তোড়া। গোলাপজল, আতর, ছাইদানী। সিগারেট, চুরোট, পান। আর মদ। বিলিতি হোটেলের খানসামার বোতল খোলে আর ঢালে গেলাশে। নাচঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরের ব্যাপার বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না কিন্তু। মায়োয়াড়ী মহাজন সাহেব সুবো ছাড়া এবার এসেছে হাবুল দত্ত, ননীলাল। ছুটুকুবাবুও এবার আসরে গিয়ে বসেছে। মেজবাবু একাই এক শ’। ছোটকর্তা চুপচাপ।
দেখা হতেই ননীলাল মাথা নাড়লে। ভূতনাথ ভিড় ঠেলে পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে অনেক সাহেব-মেম। বললে তোর সঙ্গে পরে কথা হবে ভূতেদেখা করিস।
তবু কৌতূহল চেপে রাখা শক্ত। ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে ব্যাপার কী?
ননীলাল বললে-ঝুলিয়ে দিলাম আর কি।
তবু ভূতনাথ বুঝতে পারলে না। বললে—তার মানে?
—শেষ পর্যন্ত কোলিয়ারিতে নামলে ছুটুক—কিন্তু সহজে কি নামতে চায়, বনেদী চালের বংশ তো, হঠাৎ কিছু করবে না, ভয় পায় কেবল, ভাবে সবাই বুঝি ঠেকিয়ে নেবে টাকাগুলো।
–মেজকর্তা রাজি হয়েছে?
–কর্তারাই তো রাজি হতে দেরি করলো-নইলে এতদিন কবে কেনা হয়ে যেতো। আমি বোঝালাম, হাবুল দত্ত বোঝালে, মেজকর্তা কিছুতেই রাজি হতে চায় না। ঝুমুটমল মারোয়াড়ীকে দিয়ে বোঝালাম, ম্যাকফারলেন সাহেব নিজের কোলিয়ারির ব্যালেন্স শীট দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলে, টুয়েন্টিফাইভ পার্সেন্ট লাভ দেখেও বুঝতে চায় না। জমিদারীতে তো সেন্ট পার্সেন্ট লাভ পেয়ে আসছে কিনা।
-ম্যাকফারলেন সাহেব বোঝালো কিন্তু জমিদারীতে চিরকাল এমন থাকবে কিনা গ্যারান্টি কোথায়?
মেজকর্তা বললে—জমিদারী আমাদের হলো লক্ষ্মী—এইতেই আমদের পূর্বপুরুষ খেয়ে পরে বাবুয়ানি করে মানুষ হয়ে গিয়েছে— বড়দা’ বলে গিয়েছিলেন…
চুড়ো বললে—না কাকা, তোমরা যদি না কিনতে চাও তো আমার শেয়ার আমায় দিয়ে দাও–আমি কিনব।
শেষে ক’দিন কাকা ভাইপোতে মনকষাকষি চললো। কথাবার্তা বন্ধ। হাবুল দত্ত ছুটে এসেছে আমার কাছে। শেষে কি অত বড় সংসার ভেঙে যাবে। তা ভেঙে যাবারই মতন অবস্থা। হাবুল দত্তর নতুন জামাই। ওরই ভাবনা বেশি। ছোটকর্তা রেগে আগুন। মেজকর্তা আর ছোটকর্তা একদিকে আর অন্যদিকে চুড়ো একলা আর তার শ্বশুর। শুনলাম—বালকবাবু, মানে ওদের উকিলকে ডেকে পরামর্শ হয়েছে আলাদা হবে কিনা। চূড়োর লেখা-পড়া হয় না। সারাদিন কেবল শ্বশুরের সঙ্গে ফিস ফিস। ক’দিন কী ঝঞ্ঝাটই যে গিয়েছে।
