বৌঠান বললে–বড় আস্তে আস্তে যাচ্ছে যেন গাড়িটা।
ভূতনাথ গলা বাড়িয়ে বললে–মিয়াজান, জোরসে চালাওবড়বাড়ি ফিরে গিয়ে আবার বরানগরে যেতে হবে।
—জী হুজুর-বলে মিয়াজান ঘোড়ার গায়ে সপাং করে চাবুক মারলো, আর হাওয়ার বেগে ছুটতে লাগলো গাড়ি। এবার
বৌঠানের সমস্ত শরীর দুলছে। ভূতনাথও দুলছে।
ভূতনাথ বললে—বৌঠান, গাড়িটা উল্টে না যায়।
বৌঠান বললে উল্টে যাবে না, কিন্তু তা গেলেই বা দোষ কী।
ভূতনাথ বললে—তখন তুমি তো বেঁচে যাবে কিন্তু আমাকেই ধরবে সবাই। বলবে, ঘরের বউ নিয়ে পালাচ্ছিলো।
-আমাকেও কি রেহাই দেবে নাকি? লোক জানাজানি হবার আগেই তো আমাকে পুতে ফেলবে মাটিতে, একেবারে বড়বাড়ির তলায়-নইলে যে বংশে কালি লাগবে। কোনো রকমে বেঁচে যাই তো ডাক্তার বদ্যি ডাকবে, ওষুধ খাওয়াবে, কিন্তু মরে গেলে পুতবে ঠিক মাটিতে, দেখে নিস।
-কেন, পুঁতবে কেন?
বৌঠান বললে—বড়বাড়ি খুড়লে কত মানুষের হাড় পাওয়া। যায় জানিস না, আমার শাশুড়ীর কাছে শুনেছি, একবার সুখচর থেকে এক প্রজা এসেছিল কর্তাদের কাছে নালিশ করতে, অন্য প্রজাদের হয়ে কথা বলতে, কর্তারা খাজনা কমাবে না, সে-ও ফিরে যাবে না, না খেয়ে পড়ে রইল ওই দেউড়িতে, দিনের পর দিন খায় না দায় না কিছু না। কর্তাদের বাইরে বেরুতে অসুবিধে, শেষে চাবুক মারা হলো, গা দিয়ে তার রক্ত পড়তে লাগলো, অজ্ঞান হয়ে গেল, টেনে ফেলে দিয়ে এল বাইরে—তখনও নড়ে না। শেষে আর দেখা পাওয়া গেল না তার। গাঁ থেকে তার ছেলেমেয়ে বউ এল খবর নিতে, দেশেও ফিরে যায় নি, শাশুড়ীর কাছে শুনলুম—তাকে নাকি পুতে ফেলেছে।
-কোথায়?
–বড়বাড়ির খিড়কির দিকে যে-সিঁড়ি আছে, তার তলায় যেখানে ফেলে দিলে কেউ জানতেও পারবে না—সেখানেই নাকি ফেলে দিয়েছে তাকে।
-কত বছর আগে?
–সে কি আজকের কথা রে, তখন ছোটকা হয়নি, আমিও হইনি, তুইও হোসনি—আর এ কি একবার?
–এখনও খুড়লে পাওয়া যায় তাদের হাড়?
–কে আর সেখানে দেখতে যাচ্ছে বল, ওপর থেকে তো বোঝবার উপায় নেই, কেউ তো আর তার সন্ধান জানে না, জামে শুধু খাজাঞ্চীবাবু, আর বড়কর্তারা। প্রজারা বিদ্রোহ করলে যা করবার তা তো করতেই সুখচরে, আর যারা কলকাতা পর্যন্ত দৌড়ে আসতে তাদের জন্যেই ব্যবস্থা ওই বৈকুণ্ঠ। এসব আমার শাশুড়ীর কাছ থেকে শোনা, শাশুড়ী আবার তার শাশুড়ীর কাছে গল্প শুনেছে—তাই তো যখন বেশি রাত্তিরে একল-একলা জেগে থাকি, কিছুতে ঘুম আসতে চায় না, অনেক সময় কী সব শব্দ হয় না মনে হয় যেন কারা অনেক দূর থেকে সুর করে করে কাঁদছে— শকুনের গলার আওয়াজের মতো—এক-এক সময় বড় ভয় করে।
কথাটা শুনে ভূতনাপেরও মনে পড়লো—সে-ও যেন সে-কান্না শুনেছে অনেকদিন। এই কলকাতা শহরের সব শব্দ যখন থেমে যায়, বড়বাড়ির সমস্ত কোলাহল যখন এক সময়ে ঝিমিয়ে আসে, তখন মনে হয় কোথায় যেন কে নিঃশব্দে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে বড়বাড়ির চারিদিকে, সে-শব্দ শুনে যেন হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যায় ভূতনাথ! ফতেপুরে গাঙে যাবার পথে শাড়া গাছতলায় দাঁড়িয়ে যেমন অনেকবার তার হয়েছে। হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, থেমে যায় গাছের মর্মর শব্দ, পাতার কঁপুনি। যেন কে এসে কাছে দাঁড়ালো। বোঝা যায় না দেখা যায় না তাকে। তবু মনে হয় কেউ যেন এল। এসে দাঁড়ালো একেবারে গা ঘেঁষে। তোমার দিকে চেয়ে আছে সে অপলক দৃষ্টিতে। তুমিও চেয়ে আছে। এখানেও আস্তাবল বাড়িতে ঘোড়ারা তখন আর পা ঠোকে না। তোষাখানায় শেষ চাকরটা পর্যন্ত আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়েছে। দক্ষিণের বাগানের ধারে করবী গাছটায় একটা পাখ ভাকতে ডাকতে হঠাৎ আচমকা থেমে গেল। রাস্তার কুকুরগুলো। পর্যন্ত নির্জীব হয়ে পড়েছে কিছুক্ষণের জন্যে। হয় তো ইব্রাহিমের ঘরের সামনের রেড়ির তেলের আলোটা তখন সারা রাত জ্বলে জ্বলে নিবে গিয়েছে। প্রথম রাত্রের দিকে দাশু জমাদারের ছেলের বাঁশীতে সেই ‘ওঠা নামা প্রেমের তুফানের সুর তখন থেমে গিয়েছে। ঠিক সেই সময়ে অনেকদিন ভূতনাথের মনে হয়েছে কে যেন বড়বাড়ির ইতিহাসের কালো পা সরিয়ে বেরিয়ে এল লোকালয়ে, এসে প্রদক্ষিণ শুরু করলো সারা বাড়িটা। দেউড়ি থেকে শুরু করে খিড়কি। নারকোল গাছটার পাশ দিয়ে দক্ষিণের পুকুরটা ঘুরে দাসু জমাদার আর ধোপাদের ঘরগুলো পেরিয়ে ইব্রাহিমের ঘরের সামনে দিয়ে এসে থমকে দাঁড়ালো একেবারে ঠিক উঠোনটান মাঝখানে। তারপরে আবার কোথায় বাতাসে মিলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই মনে হয় যেন ছাদের ওপর তার নিঃশব্দ পদসঞ্চার শুরু হলো। সারা বড়বাড়ির ছাদের ওপর যেন সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মনে হয়, ও যেন কিছু নয়। প্রেতাত্মা নয়, স্বপ্নও নয়, বুঝি বড়বাড়ির অভিশপ্ত আত্মা তার অশান্ত অতৃপ্ত কামনা নিয়ে অকারণ পদচারণা করে। বদরিকাবাবুর প্রলাপের মতন আপন চরিতার্থতা খোঁজে এই সব বিনিদ্র রাত্রে। আর তার পরেই শুরু হয় সেই সুর। বাতাসের শিষের মতন মৃদু। কান্নার মতন করুণ। আশ্চর্য, এতদিন ভূতনাথের মনে হতো ও বুঝি তার নিজেরই কল্পনা, নিছক ভয়-বিলাস, কিন্তু বৌঠানও শুনেছে নাকি! বৌঠানও শুনেছে সেই ইতিহাসের অমোঘ ইঙ্গিত।
বৌঠান বললে—একদিন কিন্তু দেখতে পেয়েছিলুম।
-কাকে?
বৌঠান বললে—তখন সবে বিয়ে হয়েছে আমার, সারা রাত ঘুম হয়নি, প্রথম রাত্রের দিকে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, দরজা খুলে বাইরে বারান্দায় এসেছি, মনে হলে মেজদি যেন বারান্দা দিয়ে বাইরে যাচ্ছে সিঁড়ির দিকে। এখন বাইরে যায় কেন? সন্দেহ হলো। বললুম-কে? ডাকলুম আবার–কে?
