-কী ঠিকানা?
—তুই বরানগর চিনিস?
—একবার গিয়েছিলাম শুধু ব্রজরাখালের সঙ্গে ওর গুরুভাইরা যখন বরানগরে ছিল, তখন দেখতে গিয়েছিলাম-ঠিকানাটা কী?
–তা তো জানি না, ও বলেছিল বরানগরে সবাই জানে তাঁকে, ওখানে গিয়ে খবর নিলে সবাই বলে দেবে।
—কিন্তু তার জন্যে তোমার নিজে আসার কী দরকার ছিল? আমি একাই তো গিয়ে নিয়ে আসতে পারতাম।
–কিন্তু ও বললে আমাকে নিজেই যেতে হবে, আমার হাতে তাগা বেঁধে দেবে কিনা—আর নিজে গিয়ে সাধুকে যে সেবা দিতে হয়।
–কীসের সেবা?
বৌঠান যেন হঠাৎ চারদিকে কী একটা খুজতে লাগলো। বললে—ওই যাঃ, সর্বনাশ হয়েছে।
—কী হলো?
বৌঠান বললে—আসল জিনিষই যে আনতে ভুলে গিয়েছি রে!
—কীসের আসল জিনিষ?
–পাঁচ পণ সুপুরি আর পাঁচ গোছ পান। সব যে বেঁধে রেখেছিলাম আমি! কী হবে এখন?
বৌঠান উতলা হয়ে উঠলো। বললে—আমি অত করে চিন্তাকে দিয়ে কিনিয়ে আনলাম—আর সেইটেই কিনা গোলমালে ফেলে এলাম? বোঁঠান আরো বার কয়েক গাড়ির এদিক ওদিক দেখতে লাগলোনা, আসল জিনিষটাই ফেলে এসেছি। কী ভুলো মন হয়েছে বল তো?
–ওটা না হলে চলবে না?
–ওইটে সেবা দিলে তবে যে ওষুধ দেবে, নাপিত-বৌ বার-বার করে বলে দিয়েছিল যে! বলেছিল–নির্ঘাৎ ওষুধ, কত লোকের কত কী উপকার হচ্ছে, আমি তো বলিনি যে আমি যাবো, তা হলে তো নাপিত-বৌকেই সঙ্গে করে আনতাম, নিজের কথা কি ওকে বলা যায়? সেই কথা আবার তা হলে বড়দি মেজদি’র কানে উক—হাসবে তো ওরা, এতেই হাসছে, ওদের কী, ওদের দুঃখ কীসের বল তো ভূতনাথ, বড়দি ছেলের বউ নিয়ে মেতে আছে, আর মেজদি’র ছেলেরা তো আদ্দেক দিন মামার বাড়িতেই থাকে, এ-বাড়িতে তাদের দেখতেই পাওয়া যায় না, আর দিনরাত কেবল গয়না গড়াচ্ছে আর বাঘবন্দি খেলছে। আমার দুঃখ ওদের বললে ওরা কী বুঝবে বল?
ভূতনাথ বললে—তা হলে আমি দৌড়ে গিয়ে নিয়ে আসবো বৌঠান?
—তুই পারবি?
–খুব পারবো। বংশীকে বলবো খুঁজে বার করতে—কিন্তু কোথায় কতদূর এলাম দেখি।
খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে ভূতনাথ বাইরে দেখবার চেষ্টা করলে ভালো করে। বেশ সন্ধ্যে হয়ে এসেছে চারিদিকে। একটা চৌরাস্তার মোড়ের কাছাকাছি। মনে হলো যেন শ্যামবাজারের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। দোকানে দোকানে আলো জ্বেলে দিয়েছে। রাস্তায় গ্যাসের আলোগুলোও জ্বলছে।
তা হোক এতদূর থেকে যেতে আসতে কতক্ষণ আর লাগবে! দৌড়ে যাবে আর দৌড়ে আসবে সে! ভূতনাথের মনে হলো পটেশ্বরী বৌঠানের জন্যে এটুকু করা যেন কিছু নয়। এ তো সামান্য! এর চেয়ে আরো ভীষণ কিছু করা যায় যেন। ভূতনাথ বললে—তা হলে আমি যাই বৌঠান।
বৌঠান বললে—আর আমি বুঝি একলা থাকবে এখানে?
সে-কথাও সত্যি। এতক্ষণ উত্তেজনার মধ্যে ভূতনাথ কেবল নিজের কথাটাই ভেবেছে। পটেশ্বরী বৌঠানের কথাটা তত ভাবা হয়নি। এই সন্ধ্যেবেলা কলকাতা শহরে বৌঠানকে একলা রেখে কি যাওয়া উচিত। দিনের বেলাতেই কত রাহাজানি হয়ে যায় তো সন্ধ্যের অন্ধকারে কিছুই অসম্ভব নয়। আর বোঠান আজ যেসাজগোজ করেছে। সারা গায়ে দামী দামী গয়না। হীরে মুক্তো সোনার ছড়াছড়ি। এই তো সেদিন ঘোড়ার গাড়ি থামিয়ে মেয়েদের গয়নাগাটি লুঠপাট করে নিয়ে গেল দিন-দুপুরে। পুলিশপাহারার টু-শব্দও পাওয়া গেল না। ভূতনাথ বললে—তা হলে ফিরেই যাবে?
=-তাই ফিরে চল।
গাড়ি আবার ফিরলো। ভূতনাথ খড়খড়ি খুলে গলা বাড়িয়ে বললে–মিয়াজান, বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে চল গাড়ি।
ঘোড়ার মুখ ঘুরলো। তারপর আবার সেই ট্রাম রাস্তার ধার ধার দিয়ে যাওয়া। এখান থেকে বৌবাজারে বড়বাড়িতে গিয়ে আবার সেই বরানগর। বরানগরেই বা কতক্ষণ দেরি হবে কে জানে।
ভূতনাথ বললে—যদি বরানগরেই যাবে তত একটু সকালসকাল বেরুলে না কেন?
বৌঠান বললে–ছোটকর্তা যে দেরি করে বেরুলো।
ভূতনাথ বললে—আচ্ছা, ছোটকর্তা যদি জানতে পারে তুমি বেরিয়েছে?
—ছোটকর্তা জানতে পারবে কেন? ভূতনাথ হঠাৎ বললে—আচ্ছা, বৌঠান শুনেছো বড়বাড়ির দক্ষিণের পুকুরের জমিটা নাকি বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।
বৌঠান বললে কে জানে, ওসব দপ্তরখানার লোক জানে, মেয়েমহলে ও-সব খবর কেউ দেয় না।
—আরো শুনেছি, জমিদারি বেচে নাকি কোলিয়ারি কেন? হয়েছে।
বৌঠান বললে—কে জানে ভাই, জমিদারিও কখন দেখিনি এদের কোলিয়ারি হলেও দেখতে পাবো না। আমাদের কেউ জিজ্ঞেস করতেও আসে না কোটা ভালো কোষ্টা মন্দ। আমরা ও-সবের কী বুঝি, কর্তারা যা ভালো বোঝে করবে। আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক তো শুধু নামে…অসুখ হলে ডাক্তার বদ্যি আসে, আঁতুড় হলে দাই আসে আর খিদে পেলে খেতে দিতে আসে সেজখুড়ী।
–কিন্তু কর্তাদের বেলায়?
–আমার যশোদাদুলালকে তত তাই বলি পরের জন্মে যেন পুরুষমানুষ হয়ে জন্মাই, কারো কাছে জবাবদিহি করতে হবে না, সে বেশ কিন্তু ভাই, যখন ইচ্ছে বাড়িতে এলুম, কিম্বা সারা রাত এলুমই না, ইচ্ছে হলো বৌ-এর ওপর জুলুম করলুমবকুনি দিলুম..পায়ে হাত দিয়ে মান ভাঙাতে হবে না।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু গরীব মানুষের পক্ষে পুরুষ হওয়াও যা মেয়ে হওয়াই তাই।
—কিন্তু তোর ওপরেও আমার হিংসে হয় ভূতনাথ।
ভূতনাথের হাসি পেলো। তার ওপরেও হিংসে। এতদিন পর্যন্ত একটা নিজের বলতে আশ্রয়স্থল হলো না। সংসার করা দূরের কথা। বড়বাড়ির গলগ্রহ সে! বিধু সরকারের দৃষ্টির সামনে পড়লেই এড়িয়ে চলতে হয়। ভাত খেতে গিয়েও যেন গলা দিয়ে নামে না। বড়বাড়িতে ঢুকতে বেরুতে পর্যন্ত লজ্জা করে। ব্ৰজরাখাল কবে চলে গিয়েছে। তার কাজটাও যদি তাকে দিতে। আজকাল মেজকর্তার ছেলেদেরও আর দেখা যায় না। তারা। বুঝি মামার বাড়িতে থেকেই লেখা-পড়া করছে।
