এখন গাড়ি ট্রাম রাস্তা ধরে চলেছে মনে হয়।
ভূতনাথ যেন কেমন আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। পটেশ্বরী বৌঠান এত কাছাকাছি। বৌঠানের এত ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে এক গাড়িতে যাওয়া তার এই প্রথম। বৌঠানের দিকে একবার চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। যেন আপন মনে কী ভাবছে। যেন কোনো দিকে নজর নেই। বৌঠানের শাড়িটা খোঁপাটা দুলছে অল্প-অল্প। মাঝে মাঝে কাঁধ থেকে রেশমের শাড়ি খসে পড়ে যাবার মতন হয়। ডান হাত দিয়ে বোন আবার সেটা যথাস্থানে তুলে দেয়। সমস্ত গাড়ির ভেতরটা আতরের গন্ধে একেবারে ভুর ভুর করছে। কানের ফুলটা এই অন্ধকারেও চিক চিক করে ওঠে। বৌঠানের কপালে মস্ত বড় একটা টিপ। সিঁদুরের টিপ। বোধহয় ‘মোহিনী-সিঁদুরের। কিন্তু এখনও কেন বৌঠান ‘মোহিনী-সিঁদুর’ পরে। ও তো কোনো কাজেই লাগলো না।
ট্রাম রাস্তা পার হবার সময় গাড়িটা একটু ঢিমে হয়ে এল। তারপর আবার সেই দুলতে দুলতে চলা!!
কেমন যেন অস্বস্তি লাগছিল ভূতনাথের। কোনো কথাবার্তা নেই। চুপচাপ এতদূর যেতে হবে বৌঠানের সামনে বসে বসে। নিজের জামা-কাপড়ের দিকে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। অনেকদিন সাবান দেওয়া হয়নি এগুলোতে। বড় ময়লা দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বৌঠানের ওই সাজপোষাকের পাশে। ঠিক ভেতরে উঠে না। বসলেও হতো! গাড়ির উপরেই উঠতে যাচ্ছিলো তো সে। কিন্তু বৌঠানই তো তাকে ভেতরে বসতে বললে। কিন্তু যদি কোনো কথাই না বলবে তো ভেতরে কেন বসা। হঠাৎ ভূতনাথের নিজেকে যেন আজ বড় গরীব বলে মনে হলো। বড় গরীব সে। কেন সে বোঠানের সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠতা করতে গেল। জবার সঙ্গেই বা তার অত মেলামেশার দরকার কী! কেন সে বার-বার ওরা ডাকলেই যায়। ওকে তো তারা নিচু চোখেই দেখে! সেদিন জবা কি তাকে গাড়িতে তুলে নিতে পারতো না। সবাই গেল গাড়িতে চড়ে, অথচ সে-ই শুধু হেঁটে হেঁটে গিয়েছে বাগবাজার থেকে বার-শিমলে। গাড়ির ছাদে তার জন্যে একটু বসবায় জায়গা হতোই। আর আজই বা সে চলেছে কোন উদ্দেশ্য নিয়ে। সে কি বৌঠানের অনুরোধেই কেবল। এতটুকু যাবার ইচ্ছে কি ছিল না তার! কিম্বা যদি ইচ্ছেই ছিল তবে সে কী জন্যে! বৌঠানের একটু সান্নিধ্য! বৌঠানের সান্নিধ্যে কি তার এতই লোভ! এ লোভ তো তার হওয়া উচিত নয়। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়লো এজামা-কাপড় তো বৌঠানই দিয়েছে। এ না দিলে ভূতনাথ পরতে কী! কিন্তু জামা-কাপড় তো ওরা সকলকেই দিয়ে থাকে। পুতুলের বিয়েতে যারা হাজার বারো শ’ টাকা খরচ করে এ-টুকু তাদের কাছে কী! এত সামান্যতেই ভূতনাথ কেন কৃতার্থ মনে করছে নিজেকে। ব্ৰজরাখাল তো আগেই বলেছিলো—ওরা হলো সাহেব-বিবির জাত, আমরা হলাম গোলাম। সত্যিই তো গোলাম হিসেবেই দেখে তাকে পটেশ্বরী বৌঠান। হঠাৎ কেমন যেন ঘৃণা হতে লাগলো নিজের ওপর।
মনে হলো বৌঠানকে একবার জিজ্ঞেস করে-এ কোথায় চলেছো তুমি? কিন্তু বৌঠানের মুখের দিকে চেয়ে কেমন যেন মুখ দিয়ে বেরুলো না কথাটা।
বৌঠান যেন তার মনের কথাটা ধরতে পেরেছে। বললে— কী, ভাবছিস কী রে ভূতনাথ?
ভূতনাথের চোখ দিয়ে কান্না ফেটে বেরিয়ে আসতে লাগলো। নিজেকে অনেকটা সামলে নিয়ে বললে—এমন জানলে আমি কিছুতেই আসতাম না।
বৌঠান হাসলো এবার। বললে—কেন, হলে কী তোর?
—তুমি একটাও কথা বলবে না, আমার বুঝি তা ভালো লাগে?
বৌঠান বললে—তা কথা বল না তুই, আমি কি বারণ করেছি?
—আর তুমি বুঝি চুপচাপ শুনবে কেবল?
—আমার কথা আর আসছে না ভাই, সব কথা ফুরিয়ে গিয়েছে। তুই কথা বল আমি শুনবো ঠিক।
-তার চেয়ে আমি নেমে যাই না এখানে।
বৌঠান বললে—তোর বড্ড অভিমান, পুরুষমানুষের এত অভিমান ভালো নয় রে, দেখিসনি ছোটকর্তা কারো মানঅভিমানের দাম দেয় না।
ভূতনাথ বললে তুমি কি আমাকে ছোটকর্তার মতো হতে বলে?
হাসতে হাসতে বৌঠান বললে—সেই জন্যেই তো তোকে অত ভালো লাগে আমার, ছোটকর্তা যদি তোর মতন হতো…মানুষটা জানবাজারে গিয়ে কী করে জানি না, কত চেষ্টা করলাম আমি, মেয়েমানুষের যা সাধ্যিতে কুলোয় না, তা-ও করে দেখলুম, তবু কিছুতে কিছু হলো না, একবার ইচ্ছে হয় জানবাজারে সেই রাক্ষুসীর কাছে গিয়ে দেখে আসি লুকিয়ে লুকিয়ে সে কী মন্ত্র জানে, কীসে সে ছোটকর্তাকে ভুলিয়ে রেখেছে অমন। রাত্রে ঘুমোতে ঘুমোত হঠাৎ তার নাম করে ওঠে, আমাকে এক-একবার ভুলে ‘চুনী’ বলে ডেকে ওঠে। নেশার ঘোরে মানুষটা বেহুশ হয়ে আছে তখন, আমিও ভুল ভাঙাই না—কিন্তু বুকটা আমার ভেঙে যায় ভাই।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু তুমিই বা কী রকম মেয়ে বৌঠান— তোমার কাছে সে লাগে না, তোমার পায়ের যুগ্যি নয় সে, আমি তত দেখেছি।
বৌঠান বললে—আমিও তাই ভেবেছি, নিশ্চয়ই সে কিছু খাইয়েছে—তোকে যেমন খাইয়েছিল। কামিখ্যেয় শুনেছি সেখানকার মেয়েরা পুরুষদের ভেড়া করে রাখে—হয় তো কিছু খাইয়ে দেয়।
ভূতনাথ বললে–তুমি যদি বলে বৌঠান তো আমি আর একবার জানবাজারে যেতে পারি। এবার কিছু খাবো না, শুধু দেখে আসবো সব, বৃন্দাবনের সঙ্গে ভাব করে সব দেখে শুনে। আসবে।
—না, তোকে আর সেখানে যেতে দেবো না, শেষে তোকেও হয় তো কিছু তুক করবে! কিন্তু এবার একবার শেষ চেষ্টা করে দেখবো ভূতনাথ। এতেও যদি না হয় তো আর কিছুতেই হবে না।
—কীসের চেষ্টা?
—সেই জন্যেই তো বরানগরে যাচ্ছি আজ।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে–কীসের চেষ্টায় যাচ্ছো?
–বরানগরে এক সাধুর কাছে। আমাদের নাপিত-বউ বলছিল, বছর-বছর তো ওর ছেলে হয় আর মরে যায়, ওই সাধুর কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে এসেই এবার বাঁচলো তো ছেলেটা! দেখিই না কী বলে। সব রকম ওষুধ নাকি দেয় সাধু। ওর কাছ থেকেই তো ঠিকানাটা নিয়ে এসেছি।
