তারপর একটু থেমে বললে—আচ্ছা ভূতনাথ, বরানগর কোথায় জানিস?
ভূতনাথ বললে—জানি, ব্রজরাখালের বন্ধুবান্ধবরা তো আগে ওখানেই ছিল কিন্তু বরানগরে কোথায় যাবে? তোমাদের বাগানবাড়িতে?
–-না, কিন্তু যদি যাই-ই তোর আপত্তি আছে?
–আমি যাবো না।
–কেন?
ভূতনাথ বললে—এটা বোঝে না, তুমি বড়বাড়ির বউ, আর আমি?…আমি কেউ না। তোমারও কেউ না, এ-বাড়িরও কেউ না, তোমার সঙ্গে আমার যাওয়া ভালো দেখায় না, তাতে তোমারই ক্ষতি হবে বৌঠান।
—আমার ক্ষতির কথা তুই ভাববার কে?
–কিন্তু একজন তো কেউ ভাবা চাই, তোমার যে কেউ নেই বৌঠান?
–আমার জন্যে তুই যদি এতই ভাবিস তো আমার সঙ্গে চল, আমার ভালোর জন্যেই চল।
–বরানগরে গিয়ে তোমার কী ভালোটা হবে শুনি?
–সব কথা তোকে বলবো কেন রে?
—তবে আমিও যাবো না–ভূতনাথ বেঁকে বসলো।
বৌঠান গম্ভীর গলায় এবার বললে–তুই যাবিনে তো?
–তুমি আমাকে যেতে বলল না।
বৌঠান বললে—কিন্তু তুই যদি না যাস, কে আমার সঙ্গে যাবে বল?
-–কেন, বংশী কি চিন্তা।
–ওদের গেলে চলবে না, আমার এ-ঘর কে দেখবে? আর ছোটকর্তার কাজগুলো করবে কে?
কথাটা শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল ভূতনাথ। তারপর বললে—যেতে পারি, কিন্তু তুমি কথা দাও, আজ মদ খাবে না।
–কথা দিলাম, খাবো না। তাছাড়া এবার থেকে আর বোধ হয় খাবার দরকারও হবে না, যার জন্যে খেতাম সেই ছোটকর্তাই তো আর রাত্তিরে বাড়ি থাকছে না।
এমন সময় চিন্তা এল। বললে–ছোটবাবু বেরিয়ে গিয়েছে মা।
বংশীও ঘরে ঢুকলো।
বৌঠান জিজ্ঞেস করলো-হ্যাঁ রে, গাড়ি তৈরি?
বংশী বললো, খিড়কিতে গাড়ি নিয়ে মিয়াজান দাঁড়িয়ে আছে।
বৌঠান বললে—তা হলে চল ভূতনাথ, আমরা যাই।
তারপর চিন্তাকে বললে—চিন্তা, তুই আমার ঘর-দোর দেখিস, সিন্দুকের চাবিটা তোর কাছেই রইল, এসে যেন দেখি সব ঠিক আছে, সন্ধ্যেবেলা ধূপ-ধুনো দিয়ে সন্ধ্যে দিবি। আর যশোদাদুলালকে ভোগ দিবি যেমন দিস রোজ—তারপর চলতে গিয়ে আবার থামলো। বললে—আর, যদি কেউ জিজ্ঞেস করে বলবি–আমি বরানগরে গিয়েছি।
বংশী হঠাৎ বললে—কখন ফিরবে তুমি ছোটমা?
—তা ফিরতে রাত্তির হবে আমার।
চিন্তা বললে—আজ রাত্তিরে খাবার কী বন্দোবস্ত করব? তোমার পূজোর পেসাদ রয়েছে, রেখে দেবো?
বৌঠান কী যেন ভাবলে খানিকক্ষণ, একবার মাথার একটা বেলকুঁড়ি ভালো করে খোঁপায় গেঁথে দিলে। তারপর বললে— ওই পেসাদই খাবো আজ, আর কিছু খাবো না—কিন্তু তোরা খেয়ে নিস, আমার জন্যে যেন বসে থাকিস নে–তারপর চলতে গিয়েও থেমে গেল বৌঠান। বললে—আর যদি না ফিরি তো…
—সে কি, ফিরবে না নাকি ছোটমা?
-বলা তো যায় না, রাস্তায় কত রকম বিপদ আপদ হতে পারে—যদি না ফিরি তো তোরা…
–ও কথা বলো না ছোটমা, তুমি না ফিরলে আমাদের কী হবে?
—সে ব্যবস্থা তোদের জন্য করিনি ভেবেছিস? আমার যা কিছু আছে সব রইল, তোরা সবাই নিবি, ভূতনাথ নেবেকার জন্যে আমি রেখে যাবো বল।
বংশী আর চিন্তার চোখ ছল ছল করে উঠলো।
ছোটবৌঠান বললে—আর দেরি করা নয় ভূতনাথ, চল, যেতে আসতে অনেক দূরের পথ।
বৌঠান আগে আগে চললো। পেছনে ভূতনাথ। বংশী আর চিন্তাও এল সঙ্গে সঙ্গে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে মনে হলো যেন মেজগিন্নী আর বড়বউ শব্দ পেয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে।
-ছোটবউ গেল না?
—কোথায় যাচ্ছিস ছোট?
ছোটবৌঠান বোধ হয় শুনতে পেলে না। ভূতনাথ পেছন ফিরে দেখলে গিরি আর সিন্ধু দাঁড়িয়ে দেখছে অবাক হয়ে। কেমন যেন ভয় করতে লাগলো তার। সকলের চোখের ওপর দিয়ে যাওয়া। যদি কোনো কথা ওঠে! যদি কাল ছোটকর্তার কানে যায়। যদি বড়বাড়ির কর্তামহলে আলোচনা হয় এ নিয়ে। ছুটুকবাবু যদি শোনে! আজকাল ছুটুকবাবু তো আর একলা নয়। ছুটুকবাবুর শ্বশুর হাবুল দত্তও এ-বাড়ির একজন কর্তাব্যক্তি। সমস্ত পরিস্থিতিটা ভাবতে গিয়েই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল ভূতনাথ।
মিয়াজান গাড়ি নিয়ে তৈরিই ছিল। ইলিয়াস ঘোড়ার লাগাম ধরে ছিল। দৌড়ে এসে দরজার পাল্লা খুলে দাঁড়ালো। বৌঠান তখন বেশ লম্বা করে ঘোমটা দিয়েছে। বৌঠান সামনে আসতেই ইলিয়াস সরে দাঁড়ালে দূরে। প্রথমে উঠলো বৌঠান, তারপর ভূতনাথ।
গাড়িতে উঠতেই বংশী গাড়ির জানালা দরজা বন্ধ করে দিলে। বললে-এবার ছাড়ো মিয়াজান।
ব্রিজ সিং গেট-এর চাবি খুলে দাঁড়িয়েছিল, গাড়িটা বেরিয়ে যেতেই আবার বন্ধ করে দিলে।
» ৩৩. এক সঙ্গে এক গাড়ির মধ্যে
এক সঙ্গে এক গাড়ির মধ্যে মুখোমুখি বসে যাওয়া। ভূতনাথ চেয়ে দেখলে–পটেশ্বরী বৌঠান ততক্ষণে ঘোমটা খুলে ফেলেছে। বনমালী সরকার লেন দিয়েই গাড়ি চলেছে এখন, কিন্তু বোঝবার উপায় নেই। ভেতরটা অন্ধকার। শুধু সামনের দিকের নীল কাচ দিয়ে একটু আলো আসছে। গাড়ির ছাদের তলায় রেশমী জাল টাঙানো। চারপাশেও রেশমের ঝালর। দেয়ালের গায়ে কাঠের ওপর ভেলভেটের ঢাকনা। কী মোলায়েম স্পর্শ। কোথাও শব্দ নেই। গাড়ি চলছে পাল্কির মতন দুলে-দুলে। ঘোড়ার গাড়িতে আগে অনেকবার চড়েছে ভূতনাথ। কিন্তু তাতে যেন বড় বেশি ঝাকুনি। বড় কর্কশ শব্দ। সমস্ত গাড়িটা যেন ঝর-ঝর করে কাঁপে। কিন্তু এ অন্যরকম। এ-গাড়িতে চড়ে অনেক দূরে যাওয়া যায়। গায়ে ব্যথা হবে না। মাঝে মাঝে ঢং-ঢং করে ঘণ্টা বেজে উঠছে। পাশ দিয়ে সশব্দে ট্রাম চলে গেল। হয় তো গরুর গাড়ি চলছে নানারকম বিচিত্র শব্দ করতে করতে। প্রচুর মালপত্তর নিয়ে গরুর গাড়ি চললে যেমন শব্দ হয়।
