ভূতনাথ বললে—চল লোচন বাড়ি যাই।
রাস্তায় একবার মনে হলো ভূতনাথের—এরা কারা! এদের মধ্যে চেনাশোনা কেউ তো নেই। সেই ‘যুবক-সঙ্ঘের কদমদা’র দলের লোকদের কেউ! নিবারণ নিশ্চয়ই চেনে এদের। কিন্তু বাড়ির কাছে আসতে এ-কথা আর মনে রইল না। একটু দেরি হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে ঢুকতেই দেখলে ছোটবাবুর ল্যাণ্ডো জোতা রয়েছে গাড়ি-বারান্দার তলায়। খানিক পরে ছোটকর্তা নামলো সিঁড়ি দিয়ে। বংশী ছিল সঙ্গে। আব্বাস মিয়া ল্যাণ্ডোর সহিস। সামনের দরজটা খুলে সেলাম করে দাঁড়ালো। পায়ের তলায় ঢং ঢং ঘণ্টা বেজে উঠলো। ঘোড়া দুটোর যেন আর তর সয় না। মুখের ভেতর লাগামের শেকল চিবোচ্ছিলো। লাগামে টান পড়তেই দৌড়ে যাবে। হঠাৎ ছোটকর্তার যেন কী মনে পড়লো, ডাকলে—বংশী–
বংশী হাজির ছিল। বললে—হুজুর।
—আমার চাবুক।
বিদ্যুতের মতো ছুটে গেল বংশী বাড়ির ভেতর। তারপর এক মুহূর্তে শঙ্কর মাছের ল্যাজের চাবুকটা এনে দিলে ছোটকর্তার হাতে। তারপর লাগামে হাত লাগাতে না লাগাতেই ঘোড়া দুটো জোরে একটা টান দিলে। আর সঙ্গে সঙ্গে গেট পেরিয়ে বনমালী সরকার লেন-এ গিয়ে পড়লে ছোটকর্তার ল্যাণ্ডোলেটখানা।
নাথু সিং তখনও চিৎকার করছে—হুঁশিয়ার–হুঁশিয়ার হো—
বংশী যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো এতক্ষণে।
ভূতনাথকে দেখে বললে—আপনি এসে গিয়েছেন-ওদিকে ছোটমাও তৈরি।
ভূতনাথ বললে—আমিও তো তৈরি।
—তা হলে আপনি চোরকুঠুরির দরজা দিয়ে আসুন, আমি মিয়াজানকে খবর দিই গে।
বংশী ঝড়ের মতন নিজের কাজে চলে গেল। ভূতনাথ আস্তে আস্তে গিয়ে চোরকুঠুরির বারান্দা দিয়ে ছোট দরজাটা খুললে। ওপাশে বড়মা’র গলা শোনা যাচ্ছে। সিন্ধুর সঙ্গে আজে-বাজে গল্প চলছে তার। মেজমা’র ঘরে গিরির গলাও শোনা যায়। বারান্দাটা জনশূন্য।
ভূতনাথ গিয়ে দাঁড়ালো বৌঠানের ঘরের সামনে। ভেতরে ছোটমা’র গলার শব্দ। চুড়ির টুংটাং।
ভূতনাথ ডাকলো-বৌঠান–
–ওই ভূতনাথ এসেছে, ডাক চিন্তা, ভেতরে ডাক তো।
ঘরে ঢুকতেই ভূতনাথ অবাক হয়ে গেল। বৌঠানকে সাজিয়ে দিচ্ছে চিন্তা। সাজানো এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু এত রূপ বৌঠানের!
খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে দেখতে লাগলো ভূতনাথ। খোঁপাটাকে বেড়ার মতন করে মাথার পেছন দিকে অনেকখানি জায়গা জুড়ে বেঁধেছে। আর তাতে কত রকম গয়না। হীরের বেলকুঁড়ি, মুক্তো বসানো একটা চিরুণী খোঁপার মধ্যেখানে—তাতে লেখা ‘পতি পরম গুরু’। মাথার ওপর টায়রা ঝুলিয়ে দিয়েছে। আর একটা কী গয়না নাম জানে না ভূতনাথ। বোধ হয় ঝাপটা। কানে হীরের কানফুল। সমস্ত কানদুটো সোনায় হীরেয় মুক্তোয় মোড়া। গলায় পরেছে। চিক। খোঁপার নিচে ফরসা ঘাড়ের ওপর টুকরো টুকরো চুল উড়ছে।
বৌঠান বললে—আর একটু দাঁড়া ভূতনাথ। তারপর চিন্তাকে বললে—আমার কঙ্কন দুটো দে, আর জড়োয়ার তাগা জোড়া-আর কয়েকটা আংটি বের কর।
চিন্তা সিন্দুক খুলে এক-একটা গয়না বার করে পরিয়ে দিতে লাগলো বৌঠানকে।
শেষে বেরুলো গোট। কোমরের তলা থেকে চারদিকে ঘিরে দু’ ইঞ্চি চওড়া গোটছড়া জড়িয়ে রইল ছোটবৌঠানকে।
আয়নাতে নিজের মুখখানা শেষবারের মতো দেখে নিয়ে বৌঠান বললে—এবার চল ভূতনাথ।
চিন্তাকে বললে—চিন্তা খবর নেতোছোটকর্তা বেরিয়ে গিয়েছে কিনা?
চিন্তা চলে যাবার পর ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে কোথায় যাবে বৌঠান?
—যেখানে খুশি।
—আমাকেও যেতে হবে?
–হ্যাঁ, তুই আমার সঙ্গে যাবি।
—কিন্তু কাজটা কি ভালো দেখাবে? বড়বাড়ির ছোটবউ-এর সঙ্গে বাইরে যাবো, সেটা কি আমার পক্ষে ভালো কাজ?
বৌঠান বললে–আমার গাড়ি, আমি যেখানে খুশি যাবে, কার বলবার কী আছে—আর তুই যাচ্ছিস আমার হুকুমে।
—কিন্তু ছোটকর্তা টের পাবে তো, তখন?
—ছোটকর্তাকে আমি ভয় করি নাকি। ছোটকর্তা জানবাজারে যেতে পারে, আমি পারি না? মেয়েমানুষ বলে আমি মানুষ নই?
ভূতনাথ বললে—কিন্তু তুমি তো বউ মানুষ, পুরুষ মানুষের সঙ্গে কি তোমার তুলনা?
ছোটবৌঠান রেগে গেল যেন। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে—আমি কী করি না-করি, তার জন্যে তোর কাছেও জবাবদিহি করতে হবে নাকি?
ভূতনাথ গলা নামিয়ে আনলো। বললে-রাগ করো না বৌঠান, কিন্তু নেশার ঝেকে একটা যা তা করে বসবে শেষকালে
–তার মানে? ছোটবৌঠান যেন ফণা তুলে উঠলো। আমি নেশা করেছি বলতে চাস? আজকে ষষ্ঠীর উপোস গিয়েছে জানিস
—সারা দিন জল পর্যন্ত খাইনি, আর নেশা যদি করেই থাকি, কার জন্যে করেছি শুনি? কার জন্যে নেশা করেছি, কে নেশা ধরিয়ে দিয়েছে, তা আর কেউ না জানুক আমার ঠাকুর তো জানে! আমার যশোদাদুলাল সাক্ষী আছে—কিন্তু তুই বলবার কে?
ভূতনাথ বললেন, আমি তোমার ভালোর জন্যেই বলছি বৌঠান।
—আমার ভালোর কথা কাউকে ভাবতে হবে না ভূতনাথ। তোর পায়ে পড়ি, তুই আর আমার ভালোর কথা ভাবিসনি, আমার ভালোর জন্যে সংসারে কাউকে ভাবতে হবে না, নিজের মানুষ যারা, তারাই কেউ ভাবলে না, আর তুই তো পর আমার।
—কিন্তু তবু একবার ভালো করে ভেবে দেখো বৌঠান।
—আমি খুব ভালো করে ভেবে দেখেছি রে, এর চেয়ে ভালো করে ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। বিয়ে হবার পর সেই যে ঢুকেছি এ-বাড়িতে, আর একটি দিনের জন্যে বেরোই নি কখনও। জানিস সংসারে যাবার জায়গা কোথাও নেই আমার, বাপের বাড়ি থাকে লোকের, আমার তা-ও নেই। এই ঘর আর এই বারান্দার বাইরে কোনোদিন চেয়ে দেখিনি চোখ মেলে। এর আষ্টেপৃষ্ঠে ঢাকা। কোথায় বরানগর, কোথায় জানবাজার তা-ও জানি না।
