ভূতনাথও দেখেছে পিলসুজের আলো। এখনও মনে আছে। বড়বাড়িতে যেবার প্রথম এল ভূতনাথ—তখন ছুটুকবাবুর ঘরে জ্বলতে গেলাশের আলো। শামাদানের ওপর একটা গেলাশ বসানো। তাতে তিন ভাগ জল আর এক ইঞ্চি পুরু রেড়ির তেল। কেবল ছেলেদের পড়ার ঘরের বাতিতে থাকতো নারকেল তেল। নারকেল তেলের আলোটা একটু বেশি পরিষ্কার। তারপর সেই একটা খড়কে কাঠির মুখে একটুখানি তুলে তেলে ভিজিয়ে চকমকি পাথরে আগুন জ্বেলে ধরিয়ে দেওয়া। কিন্তু মোমের বাতিই ছিল সব চেয়ে ভালো। নাচঘরে মেজবাবু যখন পড়তে বসতো-মাথার ওপরে জ্বলতে মোমবাতির ঝাড় আর সামনে দু’দিকে দুটো মোমবাতি। পাছে বাতাসে নিভে যায়, তাই শামাদানের ওপর থাকতত একটা কাচের ফানুস আর ওপরে টিনের পাতে ফুটো করা একটা ঢাকা! তারপর এল কেরাসিন। কেরাসিনের হ্যারিকেন লণ্ঠন। আর ‘ড়ুম’। ফানুসটা হয়ে গেল ড়ুম। কেরাসিনের রকমারি আলো বেরোতে না বেরোতে রাস্তায় গ্যাসের বাতি জ্বললো। বড়বাড়িতেও এল গ্যাসের বাতি। নাচঘরে, পূজোর দালানে গ্যাসের বাতি—কিন্তু ঘরে ঘরে হ্যারিকেন লণ্ঠন মোমবাতি আর রেড়ির তেলের পিলসুজ তখনও চলছে। তারপর এল এসিটিলিন। ছুটুকবাবুর বিয়েতে এসিটিলিন গ্যাসের, বাতির ঝাড় গিয়েছিল বরযাত্রীদের দু ধারে সার বেঁধে। শেষে এল ইলেকটি ক। তবু হঠাৎ যখন তার কেটে যায়, এক ঘণ্টা আধ ঘণ্টার জন্যে সব অন্ধকার। তখন আবার বেরোয় হ্যারিকেন লণ্ঠন, মোমবাতি।
দেখতে দেখতে কত কী বদলে গেল ভূতনাথের চোখের সামনে। অথচ মনে হয় যেন এই সেদিন।
লোচন বলে-জিনিষপত্তোরের দামই দেখুন না-আগে গয়ার মিঠেকড়া বালাখানা কিনেছি…সাত আনা সের মাংস দশ পয়সার দুধ, বারো আনার ঘি, ছ’ পয়সার ডাল, তিন আনার সরষের তেল আজ কোথায় এসে দাঁড়ালো। দিনকাল ক্রমেই খারাপ হতে চলেছে।
ভূতনাথ বললে—এবার ফিরি লোচন—দেরি হয়ে গেল।
লোচন বললে—আমিও ফিরবো আজ্ঞে।
কিন্তু ফিরতে গিয়েও ফেরা গেল না। ওদিকে তখন ক’জন চিৎকার করে কী যেন বলছে। দোকানের সামনে গিয়ে সব দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছে। এক-একটা লোক দোকানের সামনে দাঁড়ায় আর খানিকক্ষণ যেন কী সব বলে। তারপর খানিকটা বক্তৃতা দেবার পরই গান ধরলো সবাই মিলে–
বাঙালীর প্রাণ বাঙালীর মন
বাঙালীর ঘরে যত ভাই বোন
এক হউক এক হউক
এক হউক হে ভগবান—
গান গাইতে গাইতে ছেলেরা সামনে এসে পড়েছে। ছাপানো কাগজ বিলোচ্ছে সবাইকে। ভূতনাথও চেয়ে নিলে একটা ইস্তাহার।
লোচন জিজ্ঞেস করে-কীসের কথা লিখেছে শালাবাবু?
ভূতনাথ পড়তে লাগলো—“আগামী ৩০শে আশ্বিন বাঙলা দেশ আইনের দ্বারা বিভক্ত হইবে। কিন্তু ঈশ্বর যে বাঙালীকে বিচ্ছিন্ন করেন নাই, তাহাই বিশেষরূপে স্মরণ ও প্রচার করিবার জন্য এই দিনকে আমরা বাঙালীর রাখীবন্ধনের দিন করিয়া পরস্পরের হাতে হরিদ্রা বর্ণের সুতা বাঁধিয়া দিব। রাখীবন্ধনের মন্ত্রটি এই : “ভাই ভাই এক ঠাঁই” স্বাক্ষর—শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”
লোচন আবার জিজ্ঞেস করলে—কীসের লেখা শালাবাবু, বেহ্মজ্ঞানীদের?
ভূতনাথ কিছু বলতে যাচ্ছিলো। কিন্তু ছেলেরা চিৎকার করে উঠেছে-বন্দে মাতরম্–
একজন বক্তৃতা দিতে লাগলো মনে রাখবেন ৩০শে আশ্বিন, ওই দিন লর্ড কার্জন বাঙলা দেশকে দু’ভাগে ভাগ করে দেবেন ঠিক করেছেন, আমরাও ঠিক করেছি তার প্রতিবাদ করবো। আমাদের জাতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ সেইদিন জাতির নবজাগরণের পুরোহিতরূপে নগ্ন পদে দেশবাসীর পুরোভাগে রাজপথ দিয়ে পুণ্যসলিলা গঙ্গার তীরে যাবেন। আপনাদের অনুরোধ করছি, আপনারাও সেদিন এই ভারত-ভাগ্যবাহিনী ভাগীরথীকে সাক্ষী রেখে শপথ গ্রহণ করবেন—বিদেশী বর্জনের শপথ।
সকলে চিৎকার করে উঠলো-বন্দে মাতরম্
—আর তারপর স্নান শেষে প্রত্যেকে প্রত্যেকের হাতে হলুদরঙা রাখী বেঁধে দেবেন। আর একটা অনুরোধ! ৩০শে আশ্বিন অরন্ধন, উপবাসের মধ্যে দিয়ে আমাদের এই জাতীয় বেদনাকে চিহ্নিত করে রাখতে চাই। নিরস্ত্র জাতির শস্ত্রহীন প্রতিবাদ। দোকানি ভাইরা দোকান বন্ধ করবেন, গাড়োয়ান গাড়ি চালানো বন্ধ করবেন, কুলি মেথর মুটে মজুর সকলকেই আমরা আহ্বান জানাচ্ছি—দেশবাসী সকলের সহযোগিতা চাই।
লোচন কিছু বুঝতে পারছিল না। বললে-দোকান কেন বন্ধ করতে বলছে শালাবাবু?
ভূতনাথ বললে-বাঙলা দেশকে জোড়া লাগাবার জন্যে।
তবু কিছু বুঝলো না লোচন। বললে–আমি যে পানের দোকান দেবো ঠিক করেছি শালাবাবু, করতে দেবে না নাকি?
ভূতনাথ বললে–দাঁড়াও, আগে শুনি কী বলছে ওরা।
তখনও বক্তৃতা চলছে—আর সেই ৩০শে আশ্বিন, বাঙলার। দেশ নায়করা ঠিক করেছেন বাঙলা দেশের রাজধানীতে গড়ে তুলবেন “ফেডারেশন হল, যেখানে ভারতবর্ষের সকল প্রদেশের লোকের এক মহামিলনকেন্দ্র হবে। সেদিন বেলা তিনটের সময় সেই মিলন-মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন হবে। ভিত্তি-স্থাপন করবেন অগ্রজ জননায়ক আনন্দমোন বসু।
আবার ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি উঠলো। বোধ হয় গুটি পাঁচ ছয় ছেলে। দোকানদাররা কেউ বোধ হয় বুঝতে পারলে না ব্যাপারটা। দু’ একজন ভূতনাথকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে-বাবুলোক কা বোল হৈ বাবুজী?
ভূতনাথ বাঙলায় বুঝিয়ে দেবার চেষ্টা করলে।
দু’ একজন ভদ্রলোক দোকানদার বললে—তা বলে দোকান বন্ধ করে উপোস করতে হবে, এ কেমন আবদার মশাই!
ছেলেরা তখন গান গাইতে গাইতে চলেছে–
বাঙালীর পণ বাঙালীর আশা
বাঙালীর কাজ বাঙালীর ভাষা
সত্য হউক, সত্য হউক,
সত্য হউক হে ভগবান—
