—পানের দোকান?
—আজ্ঞে, পানটা আমাদের জাতব্যবসা, দু’একজন খুলেছে। তেমন তেমন জায়গায় একটা ঘর পেলে ও-চাকরি ছেড়ে দেবো। কতদিন মাইনে না পেয়ে চলে বলুন তো—আর আমি না ছাড়লেও আমায় ওরাই ছাড়িয়ে দেবে! এমনিতেই বাবুদের দেনা হয়ে গিয়েছে শুনছি।
—কোথায় শুনেছো?
—আজ্ঞে, মধুসূদন তো বলে। তা ধরুন এবারে ছুটুকবাবুর শ্বশুরই তো সব বুদ্ধি দিচ্ছে—বাবুরা নাকি কয়লার খনি কিনবে জমিদারী বেচে দিয়ে, তা বাবুদের ধরুন অনেক টাকা আছে, এদিক থেকে লাখ টাকা গেল তো ওদিক থেকে লাখ টাকা এল—হরেদরে বাবুরা পুষিয়ে নেবে—তা বলে এত চাকর-বাকর তো রাখবে না-আমার চাকরি তো আগে যাবে শালাবাবু।
ভূতনাথ অবাক হয়ে গেল কথাটা শুনে। বললে—তুমি ভালো রকম শুনেছো?
-কীসের কথা?
—এই জমিদারী বেচে কয়লার খনি কেন?
-আজ্ঞে, দেখেন নি বালকবাবু রোজ আসছেন, হাবুলবুতে আর ছুটুকবাবুতে দিনরাত পরামর্শ চলছে। মেজবাবু পর্যন্ত পায়রা ওড়ায়নি ক’দিন সকালবেলা, সেদিন বড়ো মেজো আর হাসিনী বউঠাকুরুণরা এল বড়বাড়িতে। ভৈরববাবু, মতিবাবু, তারকবাবুরাও যেমন আসে তেমনি এসেছিল, মেজবাবুও বেরুচ্ছিলো, হঠাৎ বালকবাবু এসে পড়লো আর যাওয়া হলো না, তারপর নাচঘরে সেই যে বসলো সবাই, রাত তিনটে এস্তোক কথাবার্তা চললো— তামাক দিতে-দিতে আমার হাত-পা ব্যথা হয়ে গিয়েছে একেবারে।
-কী কী শুনলে?
-আমি মুখ্য মানুষ, কথাবাত্রা কী বুঝতে পারি। সরকার মশাই ছিল সারা রাত, জিজ্ঞেস করবেন সরকার মশাইকে, উনিসব জানেন।
–বিধু সরকার আমাকে বলতে যাবে কেন?
-কিন্তু এতে আর সন্দেহ নেই শালাবাবু, সেদিন দেখলুম লোকজন এসে পুকুরটা মাপজোক করে গেল—শুনলুম পুকুরটা নাকি বোজামো হবে, বুজিয়ে ও জমিটা বেচা হবে—খদ্দের ঠিক হচ্ছে—ভেতরে ভেতরে কী যে সব হচ্ছে, কে আর জানতে পারবে বলুন আমরা তো চাকর মানুষ।
–কিন্তু বংশী কিছু বলেনি তো আমাকে! সে জানে না?
–বংশী আজ্ঞে ছোটমা’র মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে বসে আছে, এবার তো…বলতে বলতে যেন থেমে গেল লোচন।
–থামলে কেন, বলো।
—আজ্ঞে, অন্দরবাড়ির খবর, ও-সব কথা না বলাই ভালো, মেয়েছেলের কথা আমরা বারবাড়ির লোক কি তেমন জানতে পারবে—তবে যা শুনতে পাই।
-কী শুনতে পাও লোচন, শুনি না?
—আজ্ঞে, আপনি কাউকে বলবেন না বলুন-বললে আমার সব্বেনাশ হয়ে যাবে।
–আমি বলবো না, কথা দিচ্ছি।
গলা নামিয়ে লোচন বললে—বংশী ছোটমাকে মদ ধরিয়েছে আজ্ঞে, আমরা গরীবগুর্বো লোক, আমাদের মেয়েছেলেদেরও এমন কাণ্ড বাপের আমলে শুনিনি কখনও শালাবাবু, কিন্তু বংশী এ-পাপের ফল ভুগবেভুগবে-ভুগবে, এই বিষুবারের বারবেলায় বলে রাখলুমও ভেবেছে, মদ খাইয়ে বেহুশ করে ছোটমা’র গয়নাগাঁটি সব নেবে—কিন্তু ভগমান বলে একজন মানুষ মাথার ওপর আছেন শালাবাবু, তার চোখ এড়াতে পারবে না কেউ–হ্যাঁ।
ভূতনাথ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলে না।
লোচন বললে-বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি আপনার—যদি বিশ্বাস হয় তো মধুসূদন কাকাকে জিজ্ঞেস করবেন সত্যি কি না। তারপর থেমে আবার বলতে লাগলো—সেদিন পাল্কি-বেহারাদের জবাব হয়ে গেল শুনেছেন বোধ হয়—তা এদানি পাল্কি তো আর কেউ চড়ত না, বসে বসে খেত, কাজকম্ম কিছু ছিল না তাদের, কিন্তু যাবার সময় কী কান্না, হাউহাউ করে কান্না শালাবাবু। আজ তিন পুরুষ ধরে ওইখানে বাস করছে, আর তো কিছু কাজ জানে না, বিধু সরকার মশাই বকাঝকা শুরু করলে। বললে—মড়া-কান্না কাঁদিসনে দুপুরবেলা—যা, চলে যা।
বসন্ত বেয়ারা মাগ-ছেলে নিয়ে গলায় গামছা দিয়ে বললে–সরকার মশাই যাবো কোথায়?
সরকার মশাই বললে—কুলীগিরি করে খে গে যা—যেখানে ফা পারিস কর গে—বাবুদের কেন জ্বালাচ্ছিস। এমন মড়া-কান্না কাদলে বাবুদের ধম্মের সংসারে অমঙ্গল হবে যে।
তা একটা কাপড় নয়, গামছা নয়, বখশিশ নয়—তিন পুরুষের ভিটে ছেড়ে সেই দুপুর রদ্দরে বেরিয়ে গেল তো! বাবুরা কেউ তো দেখতেও এল না। আমাদেরও ওই দশা হবে শালাবাবু। বাড়িটার দেখেন না, যেন সে ছিরি নেই। আগে আসছে-লোক, যাচ্ছে-লোককত বোলবোলা ছিল–আপনিও তো দেখেছেন হুজুর–সেবার সেই রাক্ষস এসেছিল মনে আছে আজ্ঞে? একটা আস্তু পাঠা খেয়ে ফেললে, হাড় মাংস ছাল কিছু ফেললে না, তারপর একবার রসগোল্লা খাওয়ার পদ্ম হলো-ভৈরববাবুতে আর একজন লোকে! মেজবাবু বললে—যে দশ সের রসগোল্লা খেতে পারবে তাকে দশটা টাকা দেবে আর একটা গরদের জোড়—তারপর দোলের সময় দেখেছি, আবীরের ছাড়াছড়ি—বনমালী সরকারের গলি লাল হয়ে যেতে আজ্ঞে—নাচ গান করতে আসতে বাঈজীরা, তিনদিন চারদিন ধরে নাচই হচ্ছে গানই হচ্ছে-হাজার হাজার ককে তামাক-টিকে পুড়তে—এই লোচন সব একহাতে করেছে–পূজোর সময় যেবার সেই এক পাগল এসে বললে–পূজো হয়নি—আপনি তো শুনেছেন সব আজ্ঞে? তাই বলছিলাম শালাবাবু, বড়বাড়ি মতো চাকরির সুখ আর কোথায় পাবো, আজকাল বাবুরাও সেয়ানা হয়েছে—সেই বড়বাড়িতেই এখন মাইনে বাকি পড়ে থাকে—খেটে যদি খেতেই হয়, কলকাতায় ব্যবসা করে খেটে খাওয়াই ভালো।
-তাতে দু পয়সা হবে বলে মনে করো?
—কেন হবে না শালাবাবু, দেখতে দেখতে কী কলকাতা কী হলো দেখছেন না, এই বড়বাজারের কী ছিল কী হলো চোখের সামনেই তো দেখলুম—চোখের সামনে ঘোড়ার টেরাম থেকে কলের টেরাম হলো, হাওয়া-গাড়ি হলো, আগে পিলসুজে রেড়ির তেলের আলো জ্বলতে—এখন হলো দীপকের আলো।
