ভূতনাথ চেয়ে দেখলে ভদ্রলোকটি তাকেই প্রশ্ন করছে। বললে আমার বাড়ি ফতেপুর-নদে জেলায়।
—মশাই-এর নাম?
–ভূতনার চক্রবর্তী।
ভদ্রলোক বললে বেশ ভালোই, আমরাও নদে জেলার লোক –ওগো পা চালিয়ে এসো, রেল পাবো না—তা কী করা হয়?
ভূতনাথ একে-একে নিজের সবিস্তার পরিচয় দিয়ে গেল। দলটি তখন কাছে এসে পড়েছে।
ভদ্রলোক বললে—হ্যাঁ গো, আমার বৌমার বাপের বাড়ি ফতেপুরে, না?
ভূতনাথ এক ফাঁকে চেয়ে দেখলে বিধবা মেয়েটি যেন লম্বা করে ঘোমটা টেনে দিলে। তবু সম্পূর্ণ ঢাক বার আগে যেন একটু দেখা গেল চোখটা। ভূতনাথের দিকেই চেয়ে আছে!
–অ বৌমা, একটু জোরে হাঁটো বাছা, রেল ছেড়ে দিলেই চিত্তির–
যেটুকু দেখবার ইচ্ছে হয়েছিল, তা-ও দমন করে নিলো ভূতনাথ। দলটা তখন জোরে জোরে পা চালিয়ে চলেছে। ভূতনাথ ইচ্ছে করেই পেছনে চলতে লাগলো। হয় তত আন্নাই হবে! আন্না যদি হয়, একবার পেছন ফিরে দেখবে নিশ্চয়ই। কিন্তু অনেকক্ষণ এক দৃষ্টে চেয়েছিল ভূতনাথ। বিধবা মেয়েটি একবারও আর পেছন ফিরলো না। ছোট মেয়েকে কোলে করে আস্তে আস্তে ক্রমে দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। আসলে হয় তো ও আন্না নয়! কিম্বা হয় তো আন্নাই। কে জানে!
আর হরিদাসী! হরিদাসীর সঙ্গে আর কখনও দেখা হয় নি জীবনে। তা জীবনে সকলের সঙ্গে দেখা কি হয়! এক একজন লোক জীবনে এক রাত্রের অতিথি হয়ে আসে, তারপর ভোর হবার সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে যায়। এই হয় তো নিয়ম এ-সংসারে।
মনে আছে চোরকুঠুরির ভেতর শুয়ে শুয়ে কেবল এইসব চিন্তাতেই অনেক রাত পর্যন্ত কেটেছিল। তারপর বুঝি শেষ রাত্রের দিকে ঘুম এসেছে। সকাল হতেই আবার সেই ছক-বাঁধা জীবন। দাসু জমাদারের উঠোন ঝাঁট দেওয়ার শব্দ। মেজবাবুর গাড়ি বোয়া-মোছা। ঘোড়ার ডলাই-মলাই আর আস্তাবল বাড়ির মাথায় হয় ব্রিজ সিং, নয় তো নাথু সিং-এর ডন-কুস্তির হুম-হাম শব্দ। ভূতনাথের কিন্তু কোনো কাজ নেই।
৩২. বড়বাজারে গলির ভেতর দাঁড়িয়ে
বড়বাজারে গলির ভেতর দাঁড়িয়ে ভূতনাথ ভাবছিল—এবার কোথায় যাওয়া যায়। চাকরির জন্যে এমনি ঘোরাঘুরি করতে করতে একদিন না একদিন লেগে যাবেই। এবার বড়বাড়ির দিকে ফিরলে হয়। আজ সকাল সকাল বংশী ফিরতে বলেছে! ছোটবাবু আজ আবার জানবাজারে চুনীদাসীর কাছে যাবে! ছোটবাবু চুনীদাসীর কাছে চলে গেলেই ছোটবৌঠান তাকে নিয়ে বেরোবে। কোথায় বেরোবে কে জানে! কথাটা ভাবতেই যেন কেমন ভয় হলো ভূতনাথের। বড়বাড়ির আইনবিরুদ্ধ কাজ করবে বৌঠান। তার সঙ্গে ভূতনাথকে জড়ানো কেন। কিন্তু এবার ফিরতে হয়। ফিরতে গিয়েই হঠাৎ লোচনের সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে গেল।
—লোচন এদিকে?
—আজ্ঞে, আপনি যে এখানে?
—আমি তো চাকরির চেষ্টায় রোজই আসি—কিন্তু তুমি? বাবুর বাড়ি নেই আজ?
—তা আছে, চাকরি করি বলে কি আর বেরোতে নেই শালাবাবু? না, ওই মাইনেতে চলে! আর মাইনে পত্তোরই নিয়ম মতে দেয় না বিধু সরকার মশাই, উপরি আয় তো উঠেই গেল শালাবাবু।
-কেন?
—কই তামাক খাবার লোকই কমে যাচ্ছে, এখন বাডসাই চায় সবাই, মালও কমিয়ে দিয়েছে, নতুন করে আর ধরাতে পাচ্ছিনে কাউকে, নিজের পথ নিজে না দেখলে আর চলবে কদ্দিন, আপনাকে বললুম, একটা করে আধলা:..
ভূতনাথ বললে—আমারই তো চাকরি নেই দেখছে লোচন, গরীব মানুষ, নেশা করে শেষে–
—ঠিক কথা শালাবাবু, তাই তো এদিকে রোজ একবার ঘোরাঘুরি করি, কিন্তু আর চাকরি করবো না শালাবাবু।
—কেন?
—আজ্ঞে, চাকরিতে সে সুখ নেই আর, যা করে গেলাম বড়বাড়িতে এমন আর কোথাও পাবে না, ওই তো আমাদের দেশের এক লোক ঢুকেছে ননীবাবুর বাড়িতে, পটলডাঙার ননীবাবুর বাড়িতে, কিন্তু ভারী জ্বালা তার!
–কোন্ ননীবাবু?
–আজ্ঞে, ওই যে ছুটুকবাবুর বন্ধু! এখন তো তিনি মস্ত লোক। আপিস খুলেছেন কত। তা সে কাজ করে বাড়িতে আর ফাইফরমাশ খাটে, পেয়ারের লোক, খরচার টাকাকড়িও হতে পায়, কিন্তু হিসেব বড় কড়া ননীবাবুর! শুনি কিনা, রোজ সকাল সাতটার সময় হিসেব দিয়ে আসতে হয় সাহেবের কাছে, হিসেবে গোলমাল করলেই চাকরিটি যাবে। এতে আর বড়বাড়ির ব্যাপার নয়, কে খাচ্ছে, কে চুরি করছে, কে অপচো নষ্ট করছে। কোনোদিন এখানে হিসেব বলে কিছু ছিল না আজ্ঞে। বেণী কাপড় কুঁচোচ্ছে, তার মধ্যে ক’খানা কাপড় বাইরে চলে গেল তা আর কেউ মনে রাখেনি, ফুরিয়ে গেল তো আবার নাও। এই তামাক-টিকের ব্যাপারটাই দেখুন না, কতখানি বাজার থেকে এল, কতটা খরচা হলো কেউ কোনো দিন দেখেছে?…আমিই সব—আমার জিম্মায় মাল ছেড়ে দিয়েই সরকার মশাই খালাস কিন্তু ননীবাবুর বাড়িতে একটা আধলার এদিক-ওদিক হোক দিকি সাহেব তো মদ খেয়ে পড়ে থাকে, কিন্তু পয়সার ব্যাপারে ভারী টনটনে। এদিকে যত রাত্তিরেই শুক, ননীবাবুর ওদিকে ভোরবেলা ওঠা চাই। আমাদের বড়বাড়ির মতো নয়—এমন চাকরি আর কোথায় পাবো শালাবাবু! তাই তো বলছিলাম আজ্ঞে, চাকরিতে যা সুখ করেছি—করেছি। এখন আর সে সুখ নেই, এখন নিজেই নিজের পথ দেখতে হবে, এখন তো দেশে ফিরে আর হালচাষ করতে পারবো না, মাঠের কাদামাটিও মাখতে পারবো না গায়ে।
–তা চাকরি না করতে চাও তো ব্যবসা করবে নাকি?
—আজ্ঞে, ব্যবসা কী করব তাই তো ভাবছি, ক’টা ঠেলাগাড়ি নিয়েছিলাম আজ্ঞে—কিন্তু তাও টিকলো না। ঠিকমতো জমা পাই না—তারপরে মেরামতের খরচা আছে, তা এবার ভাবছি একটা যুৎসই ঘর পেলে পানের দোকান দেবে।
