—কিন্তু এখন তো দেখছি টাকারই সম্মান দেয় লোকে—কত হাজার টাকা ও চাদা দিয়েছে জানো চারদিকে?
জবা হাসলো। বললে—আপনার রাত হচ্ছে, আপনি বাড়ি যান। একথা বলতে আরম্ভ করলে আর শেষ হবে না—মাঝে-মাঝে এসে দেখা করে যাবেন। নতুন বাড়িতে, নতুন পাড়ায় এসেছি সামনে সুপবিত্রর পরীক্ষা, ও হয় তো সব সময় আসতেও পারবে না।
ভূতনাথ তখনও দাঁড়িয়ে রইল। শুধু বললে—আমাকে আসতে বলা মানে কিন্তু কাঙালকে শাকের ক্ষেত দেখানো।
-আসবেন, যখন ইচ্ছে হবে, চলে আসবেন, বাবার স্বাস্থ্য খারাপ, আর তা ছাড়া বিয়ের সব কাজের ভার তো আপনাকেই নিতে হবে, সুপবিত্রও একলা সব পারবে না, আর আমিও না— হয় তো এমনি করে কষ্ট দেবো, খাটিয়ে নেবে রোজ।
—এমন খাটুনি খাটতে আমার কষ্ট নেই জবা।
জবা হাসলো। বললে—শেষে হয় তো একদিন আর দেখাই করবেন না ভয়ে। তারপর যখন একদিন আপনারও সংসার হবে, বিয়ে হবে তখন মনেও পড়বে না আর।
ভূতনাথ কী ভাবলো। তারপর বললে—আমার তো ওই দোষ, ভুলতে পারি না কাউকে ভুলতে পারলে তো বেঁচে যেতাম। যারা আমাকে ভুলে গিয়েছে তাদেরও মন থেকে দূর করতে পারি না।
–কিন্তু মনে রাখবেন, মনে রাখার দায়িত্বটা যেখানে একজনেরই, সেখানেই সম্পর্কটা চিরস্থায়ী হয়।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু সে দায়িত্বটা দুজনের হলে কত চমৎকার হতো!
—তেমন ভাগ্য সংসারে ক’জনের হয়? ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে কিন্তু আমিও বুঝি সেই হতভাগ্যদের মধ্যে একজন?
জবা খিলখিল করে হেসে উঠলো। বললে—আপনার প্রশ্নের জবাব আমি দেবো না—কিন্তু রাত হয়ে যাচ্ছে, আপনার বাড়ি যেতে অসুবিধে হবে না তো?
ভূতনাথ এবার উঠলো। বললে—এবার আমি খুশি মনে বাড়ি যাবো জবা, কারণ আমার প্রশ্নের জবাব আমি পেয়ে গিয়েছি।
–ছাই জবাব পেয়েছেন—বলে জবা হাসতে লাগলো।
ভূতনাথ পেছন ফিরে দাঁড়ালে আবার। বললে—তবে কি ভুল হলো আমার?
জবা বললে—না, দেখছি আপনার বাড়ি যাবার ইচ্ছে নেই মোটে।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু না শুনে যে যেতে পারছি না।
—আপনি অদ্ভুত মানুষ তো, সারাদিন এত খাটালুম, তবু আপনার ঘুম পায় না—দেখুন তো, এতক্ষণ বোধ হয় সুপবিত্র খেয়ে-দেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।
-কিন্তু আমি তো অত ভাগ্যবান নই।
—যান, আপনি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হা-হুতাশ করুন, আমি চললুম—আমার অনেক কাজ বাকি এখনও।
এর পর ভূতনাথ চলেই এসেছিল সেদিন। রাত্রে বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ পর্যন্ত ঘুম আসেনি তার। বাইরে কোনো সাড়াশব্দ নেই। নিঝুম নিস্তব্ধ ঘর। মাঝরাতে শুধু গেট খোলার ঘড়ঘড় শব্দে বোঝা গিয়েছিল মেজবাবু ফিরেছে। ঘোড়া দুটো বার দুই ডেকে উঠেছিল। লোকজনের কথাবার্তা। গেট বন্ধ করার আওয়াজ। তারপর আস্তাবল বাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। দক্ষিণের পুকুরের দিকে একটা কী পাখী খানিকক্ষণের জন্যে “একটানা ডেকে-ডেকে উড়ে গেল কোথায়। আর কোনো শব্দ নেই। তারপর থেকে অপরূপ এক স্তব্ধতা। সে স্তব্ধতারও বুঝি এক মানে আছে। এই স্তব্ধতার মধ্যে ভূতনাথের নিজেকে বড় নিঃসঙ্গ মনে হয়। প্রথমে মনে পড়ে রাধার কথা। রাধা একদিন বলেছিল—অমন করে নজর দিও না বলছি ভূতনাথদা।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করেছিল—কেন, নজর দিলে কী হয়?
রাধা বলেছিল—নজর দেওয়া বুঝি ভালো, আর আমি যদি নজর দিই?
ভূতনাথ বলেছিল—দে না, নজর দে, কোথায় নজর দিবি দে।
খানিকক্ষণ কী ভেবে রাধা বলেছিল—এখন তো নজর দেবে, তোমার বউ আসুক, তখন নজর দেবে।
তা সে নজর দেবার আর সুযোগ পায় নি রাধা। পেটে ছেলে নিয়ে মারা গেল একদিন। তারপর আন্না। আন্নাও কত হাসি খুশি ছিল। যেখানে থাকতে সব সময়ে হেসেগল্প করে জমিয়ে রাখতো। ব্রজরাখালের বিয়ের দিন বাসরঘরে আন্না কী হাসিই না হেসেছিল। সেই আন্না! সেই আন্নার সঙ্গেই বোধ হয় দেখা হয়ে গিয়েছিল সেদিন। বড় অপ্রত্যাশিত সে দেখা! ভালো করে স্পষ্ট দেখা যায় নি, কথাও হয় নি কিছু। কিন্তু আন্নাকে দেখেও যেন কষ্ট হয়েছিল খুব ভূতনাথের।
কালীঘাটের দিকে যাচ্ছিলো ভূতনাথ। পোষ-কালী দেখতে বহুদিনের সাধ ছিল তার। ধর্মতলার ওদিকটা হাঁটতে হাঁটতে লম্বা রাস্তা ধরে যাওয়া।
বাঁ পাশে কিছুদূর সাহেব-মেমদের বাড়ি আর দোকান। আর ডানদিকটায় কেবল মাঠ। মাঝে-মাঝে গাছের ছায়ায় জিরিয়ে নেওয়া। ফিরিওয়ালা বসে বসে আক কেটে বিক্রি করছে। দাড়িগোঁফ, মাথার চুল কামিয়ে দিচ্ছে নাপিতরা। দলে দলে সব লোক হেঁটে চলেছে কালীঘাটে কিম্বা দর্শন করে ফিরে আসছে। কালীবাড়ির সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠেই একজনকে দেখে মনে হয়েছিল–আন্না না!
বার-বার চেয়ে দেখেছিল ভূতনাথ। ছোট ছোট করে চুল ছাঁটা। থান কাপড় পরনে। কোলে একটা এক বছরের মেয়ে, সঙ্গে আরো চার-পাঁচটা ছেলেমেয়ে। সবাই ছোট ছোট। বয়েসে দু’এক বছরের তফাৎ সব। সঙ্গে সধবা শাশুড়ী বোধ হয়। জ্বল জ্বল করছে সিঁদুর সিঁথিতে। পাকা চুলের ওপর সিঁদুর পরেছেন শাশুড়ী। আন্না বোধ হয় নাকে নথও পরতে সধবা অবস্থায়। নাকে এখনও ফুটোর দাগটা স্পষ্ট। বার-বার কেমন যেন মনে হয়েছিল-ও আন্নাই, আর কেউ নয়। তারপর এক সময় ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল আন্না। কিন্তু ফিরে আসবার পথে আবার সেই দলটার সঙ্গে দেখা।
চার-পাঁচটি ছেলেমেয়ে নিয়ে আন্নার হেঁটে চলেছে চৌরঙ্গীর পাশের মেটে রাস্তা ধরে। সঙ্গে একজন কে পুরুয় মানুষ আছে। আগে-আগে চলেছে। এক একবার পেছনে ফিরে ডাকে— একটু পা চালাও-পা চালিয়ে এসো না—মশাই-এর বাড়ি কোথায়?
