–এদিকে আয়, আয় এদিকে, ভয় নেই আমি বদরিকাবাবু।
–বদরিকাবাবু! এতক্ষণে চেনা গেল। সেই তুলোর জামা গায়ে। মোটা-সোটা দীর্ঘ চেহারা। মুখ দিয়ে লালা গড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু আবার হাসছেও সঙ্গে সঙ্গে।
বদরিকাবাবু বললে–আমি মরে গিয়েছি।
—কী করে মরলেন?
—ঘড়িতে দম দিতে গিয়ে পড়ে গেলাম উল্টে–ঘড়িও বন্ধ হয়ে গেল, আমার টাক-ঘড়িটাও ভেঙে গিয়েছে, আমারও দম আটকে গিয়েছে।
ভূতনাথ যেন জিজ্ঞেস করলে—মারা গিয়েছেন তো কথা কইছেন কী করে?
—মারা গিয়ে যে ইতিহাস হয়ে গিয়েছি, আমার আর কোনো দুঃখু নেই। ঘড়ি আর চলবে না। বড়বাড়ির ঘড়ি বন্ধ হয়ে গিয়েছে। মোটরগাড়ি এসেছিল সেটা চলে গিয়েছে। এখন বাবুর কয়লার খনি কিনছে। জমিদারী বেচে দিলে—এবার কলির পাঁচ পো, কলি জানিস তো কে? ক্রোধের ঔরসে হিংসের গর্ভে কলির জন্ম। বলে হো হো করে হাসতে লাগলো বদরিকাবাবু। দেখতে দেখতে বদরিকাবাবুর চোখ দুটো জ্বলতে লাগলো। আগুনের ফুলকির মতো। সাদা আর সবুজ আলে সে চোখে। আর তারপর হঠাৎ রং বদলে গেল সে চোখের। লাল হয়ে এল দৃষ্টি। টকটকে লাল। শেষে যেন দুটো স্থির বিন্দুর মতো। লাল বিন্দু দুটো আস্তে আস্তে যেন দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমশঃ।
অন্ধকার পরিবেশ। তার মধ্যে সেই লাল দুটি বিন্দু দেখে প্রথমে ভয় হলো ভূতনাথের মনে। তারপর সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই যেন মনে হলো কারা যেন কথা বলছে। জবার গলা। সুবিনয়বাবুর গলা। সুপবিত্রর গলা। একি, বার-শিমলে এসে গিয়েছে! এতক্ষণে খেয়াল হলো ভূতনাথের যে, সে জবাদের ঘোড়ার গাড়ির পেছন-পেছন বার-শিমলের দিকে চলতে চলতে কদিন আগের ঘটনাগুলোই ভেবেছে শুধু।
জবার গলা কানে এল—হাঁ করে দেখছেন কি ভূতনাথবাবুজিনিষ পত্তর নামাতে হবে না?
সুয়িনয়বাবুও যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে তুলতে হবে।
ভূতনাথ এবার এগিয়ে গিয়ে বললে—আমি ধরছি, চলুন।
সুবিনয়বাবু বিছানায় বসে বললেন—এ-বাড়ি করেছিলাম প্রথম ওকালতির আয় থেকে। অনেকদিন পরে আবার এখানে আসছি, অথচ মনে হয় যেন সব সেদিনের কথা। যেবার কেশববাবু সাধনকানন’ খুললেন, সেইবার এই বাড়ি ছাড়ি আমি। কেশববাবুর মতো আমরাও ক’জন মুষ্টিভিক্ষা নিয়ে সংসার পরিচালনা করতাম, কয়েকবছর ওঁর দেখাদেখি নিজের হাতে রান্না, বাসন মাজা করেছি, মাটির পাত্রে জল খেয়েছি। শেষকালে ‘ভারত-সভার প্রতিষ্ঠা হলো—সে-সভা হওয়ারও একটা ইতিহাস আছে ভূতনাথবাবু। আনন্দমোহন বসু বললেন—আমাদের দেশে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের কোনো সভা-সমিতি নেই, তা ঠিক করলাম তাই-ই হবেআমাদের আপিস হলো তিরেনব্বই নম্বর হ্যারিসন রোডে–এলবার্ট হল-এ এক মিটিংও হয়ে গেল—আর আমাদের দেখাদেখি শিশিরবাবু, ওই অমৃতবাজারের শিশিরবাবুও করলেন ‘ইণ্ডিয়া লিগ’।
হঠাৎ জবা ঘরে ঢুকলো-বাবা, আপনি আবার গল্প করছেন?–না মা, পুরোনো কথা সব মনে পড়ছিল কিনা, তাই–তা পবিত্র কোথায়?
জবা বললে—সুপবিত্র তো সারাদিনই খাটছে, তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম আমি কিন্তু ভূতনাথবাবুকে ছেড়ে দিতে হবে বাবা, ওর এখনও অনেক কাজ বাকি—নতুন বাড়িতে এসে
-তা যাও না, ওকে নিয়ে যাও। আমি পরে গল্প করবো–তোমার কাজটাই তো আগে মা।
অনেক দিনের পুরোনো বাড়ি। নতুন করে এখানে বাস করবেন বলে আবার সব গোছানো হয়েছে। কিন্তু মোহিনী-সিঁদুর’ আপিসের সে বাড়ির সঙ্গে যেন এর তুলনা হয় না। মাঝখানের একটা ঘর উপাসনার জন্যে রাখা হয়েছে। মাঝখানে শুধু একটা বেদী। কাঠের চৌকির ওপর আর তার চারপাশে শতরঞ্চি পাতা। দেয়ালে জবার মায়ের আর বাবার ছবি টাঙিয়ে দেওয়া হলো। আর তার ওপরে রাজা-রাণীর ছবি। জবার মায়ের কার্পেটের ওপর ফ্রেমে বাঁধানো লেখাটাও’গড সেভ দি কিং। ভাঁড়ার ঘরটাই জবার নিজস্ব। রামহরি ভট্টাচার্যের আমলের কিছু কিছু পেতলের বাসন—ঘড়া, কলসী, থালা। বাড়ির লাগোয়া রান্নাঘর। এক একটা জিনিষ নিজে বয়ে নিয়ে এসে সাজিয়ে দিলে ভূতনাথ। এই বাড়িতে বিয়ের পর জবার আর সুপবিত্রের সংসার পাততে হবে।
সুবিনয়বাবুর অবর্তমানে সুপবিত্র এইখানে এসে উঠবে। কাজ শেষ করতে করতে অনেক দেরি হয়ে গেল ভূতনাথের।
জবা বললে—অনেক রাত করে দিলাম আপনার-একলা যেতে পারবেন তো?
ভূতনাথ বললে—যাবার আগে একটা কথা তোমায় জিজ্ঞেস করবো জবা?
-বলুন।
-তুমি বিশ্বাস করো, ননীলালকে আমি পাঠাঁই নি, আমি শুধু বলেছিলাম ওকে সঙ্গে করে নিয়ে আসবো।
—আমি জানি, কিন্তু টাকার কথাটা ও জানলে কি করে?
-সেটা আমিই বলেছি, ওর ব্যাঙ্কে টাকা রাখলে অনেক সুদ পাওয়া যাবে, তাই বলেছিলাম—আর আমাকে ও চাকরিও করে দেবে বলেছে। সব জায়গায় দেখেছি ওর খুব খাতির, বড়বাড়ির বাবুরা পর্যন্ত, পাথুরেঘাটার হাবুল দত্ত, ছুটুকবাবুর শ্বশুর তিনিও তো ওর সঙ্গে ব্যবসা করেন, গাড়ি কিনেছে, এই বয়সেই জুট মিলের কত শেয়ার কিনেছে, কয়লার খনি করেছে, সায়েবরা পর্যন্ত ওকে টাকা দেয় বিশ্বাস করে, ওকে যদি তারা খারাপ লোকই জানতে তো এমন হয় কী করে! কলকাতায় ওর কী প্রভাব-প্রতিপত্তি জানো তুমি?
—সব জানি ভূতনাথবাবু, সব জানি, আপনাকে আর ননীলালকে আমায় চিনিয়ে দিতে হবে না।
-তা হলে আমার অপরাধটা পেলে কোথায়?
জবা বললে—ওকে যদি আর কখনও এ-বাড়িতে আনেন তো এ-বাড়িতে আপনারও প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। ওকে যে সেদিন অপমান করে তাড়িয়ে দিই নি, সে শুধু আপনার জন্যে। আমি যখম কলকাতায় প্রথন এলাম, আমাকে পড়াতে মেমসাহেব, ছিলাম বলরামপুরে গোঁড়া হিন্দু ব্রাহ্মণের ঘরে, হলাম একেবারে রাতারাতি মেমসাহেব, কিন্তু আমার সামাজিক শিক্ষাদিক্ষার সব গোড়া পত্তন যে সেখানেই হয়ে গিয়েছিল, তা ছাড়া বাবা আমাকে শিখিয়েছেন কাকে বলে মানুষ হওয়া, আমি ননীলালের কথায় ভুলিনি।
