ব্ৰজরাখাল বলে—গুণ্ডারা হলো ভীরুর জাত—প্রথমটা রুখে দাঁড়ালে আর কিছু ভয় নেই।
কিন্তু ভূতনাথের তেমন সাহস নেই। এক জায়গায় জন পঞ্চাশ কাফ্রি ভিড় করে বেঞ্চিতে বসে চা খাচ্ছে। কালো কালো ভূতের মতন চেহারা সব। কোকড়ানো চুল। একজনের হাতে লাঠি। ভূতনাথ নিঃশব্দে সরে আসছিল। হঠাৎ মনে হলো যেন তার সামনে আগে-আগে একটা ঘোড়ার গাড়ি চলেছে। লাল বাতি দুটো চেনা যায় অস্পষ্ট। এত রাত্রে এ-পাড়া দিয়ে ঘোড়ার গাড়ি যায় কেন! ব্রজরাখাল এ-সব রাস্তা দিয়ে চলতেই বারণ করেছিল ভূতনাথকে। মিছিমিছি বিপদ ডেকে আনা। ঘোডার গাড়িটা দলের সামনে আসতেই কেমন যেন একটু মৃদু আলোড়ন শুরু হলো কাফ্রিদলের মধ্যে। হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই একজন উঠে গিয়ে গাড়ির সামনে দাঁড়ালো।
ভূতনাথও থেমে গিয়েছে। লুঠপাট করবে নাকি ওরা। চোখের সামনেই খুনখারাপি হবে নাকি! খানিকক্ষণ দাঁড়ালো ভূতনাথ চুপ করে। তাকে কি কেউ দেখতে পায়নি। সারা মেছোবাজারের সব জায়গায় যেন এখন ওরা ছাড়া আর কেউ নেই। ওদেরই আধিপত্য এখানে। এখানে এখন যদি তাকে কেউ খুন করেও ফেলে যায় তো কেউ ধরবার নেই! পুলিশের চিহ্নটুকু পর্যন্ত নেই কোথাও। শুধু নিবিড় অন্ধকার আর সেই পটভূমিকায় ওই ক’টা কাফ্রি গুলজার করছে সমস্ত পাড়াটা। সত্যি-সত্যি ভূতনাথের মনে হলো এ কলকাতা শহর নয়, এ যেন আদিম জঙ্গল। সুন্দরবনের শেষ প্রান্ত। সমুদ্র থেকে চর উঠেছে। হোগলা বন আর গরান কাঠের জঙ্গল চারিদিকে। পর্তুগীজরা বুঝি সাতগাঁ থেকে জাহাজ লুট করে একপাল মেয়েমানুষ ধরে এনেছে এই জঙ্গলে। চড়া দামে বেচবে ইংরেজদের কাছে। ইংরেজরা তো বউ আনে না এদেশে। মোগল নবাব বাদশারা ইংরেজ মেয়ে দেখলে বড় নজর দেয়। একটা সাদা চামড়ার মেয়ে দিলে সমস্ত হিন্দুস্থানটার পত্তনি লিখে দিতে পারে। এমনি দর ওদের তখন। কিন্তু তবু মেয়েমানুষের অভাব মিটিয়েছে ওলন্দাজরা। মেয়েরা ইংরেজী ভাষা জানে না। কথা বলতে, ভাব করতে অসুবিধে হয়। কিন্তু ধোপা রতন সরকার আছে। দোভাষী। এই দালালি করে করে ইংরেজীটা বলতে কইতে পারে। মেয়েমানুষ বেচে বেচে মোটা টাকা আয় তার।
রাত্রে যেন কলকাতার আদিম রূপ বেরিয়ে পড়ে শহরে। কত খুন হয় হ্যালিডে স্ট্রিট-এ, কত লুটপাট জখম হয় খিদিরপুরের পোলের ওপর আর খুনখারাপি হয় মেছোবাজারে, দিনের কলকাতা তা জানতে পারে না। ল্যাণ্ডো গাড়ি চলেছে হয় তো টগবগ করতে করতে, হঠাৎ গলির ভেতর কোথা থেকে দৌড়ে আসে গুণ্ডারা। গাড়িতে উঠে মলমলের পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ঘড়ি, ঘড়ির চেন ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল। সাইবাবার সাঞ্চিতে কত বাবু নিঃসন্দেহে ঢুকেছে চা খেতে, তারপর জুয়া খেলার প্রলোভনে পড়ে ধন প্রাণ হারিয়ে চিরকালের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে। পুলিশ টেরও পায়নি। বেচারাম চাটুজ্জে মশাই আদি ব্রাহ্ম সমাজের আচার্য ছিলেন। থাকতেন বেহালায়। সমাজের সভার শেষে ঘোড়ার গাড়িতে ফিরছিলেন। খিদিরপুরের পুলের ওপর বলা নেই কওয়া নেই তাড়া করলে কাফ্রিকা। কিন্তু বেচারাম চাটুজ্জে মশাই মোটা লাঠি নিয়ে যাওয়া আসা করতেন। সেদিন একাই আটকালেন কাফ্রি গুণ্ডাদের ওই এক লাঠির জোরে। তারপর ছুটুকবাবুর আসরে আর একদিন গান হচ্ছিলো। ভূতনাথ তবলা বাজাচ্ছিলো। হাঁফাতে হাঁফাতে বিশ্বম্ভর হাজির।
—এত দেরি কেন রে বিশে? প্রশ্ন করলে সবাই। বিশ্বম্ভরের গজল গানের জন্যে আসর জমছিল না এতক্ষণ!
বিশ্বম্ভর তখনও হাঁফাচ্ছে। বললে—কম্বুলিটোলায় এক কাণ্ড হয়ে গেল। গুণ্ডারা তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে লোহার সিন্ধুক নিয়ে উধাও।
ব্ৰজরাখাল যখন রাত্তির করে ফিরতে, কতদিন কত বিপদের কথা এসে বলেছে। দিনের বেলায় ততটা নয় কিন্তু রাত্রে একলকাতা নরক হয়ে ওঠে। যে রামবাগানে সাহেববীণার ঘরে বৈদূর্যমণি যেতেন তাকেই কতবার থানায় যেতে হয়েছে খুনের দায়ে। ওই পাড়াটাতেই খুন জখম হতে বেশি।
ভূতনাথ তখনও হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। নিঝুম রাস্তার ওপর একটা ঘোড়ার গাড়ি। আর কাফ্রিরা তাকেই ঘেরাও করেছে। গাড়ির ভেতরে যদি কেউ থাকে! তা হলে চোখের সামনে হয় তো খুন খারাপি হয়ে যাবে! হঠাৎ যেন একটা গোলমাল শুরু হলো। গাড়োয়ান গাড়ি ছেড়ে দৌড়ে বুঝি পালালো। তারপর শুরু হলো আক্রমণ! গাড়ির জানালা-দরজা বন্ধ ছিল। কিন্তু সামান্য আঘাতেই খুলে গেল সেটা। তারপর যে-কাণ্ড হলো…।
ভূতনাথের মাথায় যেন তখন নেশা বেশ তীব্র হয়ে উঠেছে। চোখে অন্ধকার লাগলো সব। হঠাৎ যেন সব ঝাপসা হয়ে এল। আবার সব পরিষ্কার। মনে হলো কোথাও যেন কেউ নেই। সে যেন স্বপ্ন দেখছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। এতক্ষণ যা দেখছিল সে, সব তার কল্পনা। আবার মনে হলো—না! জাহাজ এসেছে কলকাতায়। ঝড় জল বিদ্যুৎ। মুন্সী নবকৃষ্ণ ছোট ছেলেটি তখন। দাঁড়িয়ে আছে গঙ্গার ধারে চাকরির চেষ্টায়। কোম্পানীর সাহেবরা নামলে একটা চাকরির তদ্বির করতে হবে। কখনও মনে হলো-কলকাতায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে সিরাজউদ্দৌলা। পুড়ে ছারখার হচ্ছে ইংরেজদের কেল্লা। চার্চ সেন-এর মোড়ের কামানটা থেমে গিয়েছে। শুধু ধোঁয়া উঠছে অল্প-অল্প সামনের নল দিয়ে। সিরাজউদ্দৌলা ভারী খুশি। শিবিরের সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে আর হাসছে। আলীবর্দী খাঁ সত্যিই বলেছিল ইংরেজদের না তাড়ালে তোমার রাজ্যে শান্তি আসবে না। সেই কলকাতার নাম বদলে রাখা হলো আলীনগর। চোখের সামনে আকাশের কালো মেঘের মত সব দৃশ্য যেন ভেসে যায়। তারপর খানিকক্ষণের জন্য মনে হয় সব ঠিক আছে। বড়বাড়ির চোরকুঠুরিতে যেন সে শুয়ে আছে। দেয়ালের গায়ের উড়ন্ত পরীরা যেন সজীব হয়ে উঠেছে। আস্তে আস্তে মাঝ রাত্রে যেন কে দরজায় টোকা মারলো। প্রথমে ধীরে ধীরে তার পর জোরে, আরো জোরে, কিন্তু দরজা খুলতেই একটা দমকা বাতাস এসে সমস্ত ঘরের জিনিষপত্র লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেল।
৩১. জবাদের ঘোড়ার গাড়ির পেছনে
জবাদের ঘোড়ার গাড়ির পেছনে চলতে চলতে সেদিনকার সব ঘটনা মনে পড়তে লাগলো ভূতনাথের। সত্যি সেদিন খুব নেশা হয়েছিল। একবার চিৎকার করতে ইচ্ছে হয়েছিল ভূতনাথের। কিন্তু সমস্ত শক্তি দিয়েও যেন গলা দিয়ে এতটুকু আওয়াজ বেরোবে না। কিন্তু ভালো করে চোখ মেলে চাইতেই যেন বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছে ভূতনাথ। সামনে চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে একটা দশা সই মানুষ! মানুষটার গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠতে হয়েছে। মরা মানুষ! এখানে এমন করে মরলে কি করে লোকটা। পালাতে যাবার চেষ্টা করতে গিয়ে থেমে গেল ভূতনাথ। মরা মানুষটা যেন হঠাৎ তাকে চোখ দিয়ে ডাকছে।
