–তোমার ভয় নেই বৃন্দাবন, আমি ঠিক যেতে পারবো। কথাটা বললে বটে কিন্তু যেন শক্তি নেই সত্যি-সত্যি তার শরীরে। আস্তে আস্তে সিঁড়িটা বেয়ে নিচে নেমে এসেও যেন ঠিক হদিস পাওয়া গেল না কোন্ দিকে রাস্তা। পেছনে যেন কারা হো হো করে হেসে উঠলো। বিজপের হাসি। ভূতনাথের সেদিন মনে হয়েছিল, তাকে লক্ষ্য করে তাদের হাসি যেন অকারণ। সে তো চুনীদাসীর কাছে নিজের ইচ্ছেয় আসেনি। তবে সে নেশা করেছে বলে কি হেসেছে। অথচ নেশা তো সে করতে চায়নি। কিন্তু তাকে নেশা করিয়েই বা তাদের লাভ কী! তাকে দিয়ে তাদের কী উপকার হবে। ছোটকর্তাকে এখানে পাঠাবার মালিক নাকি সে। সে বললেই বা ছোটকর্তা আসতে যাবে কেন! আর তা ছাড়া ছোটবৌঠানই বা এসব শুনলে কী বলবে।
রাস্তায় নেমে কোন্দিকে ভূতনাথ যাবে তা যেন হঠাৎ ঠিক করতে পারলে না। কলকাতার রাস্তায় তখন বেশ অন্ধকার। রাত হয়েছে বেশ। কয়েকটা দোকানে তখনও টিমটিম করে তেলের আলো জ্বলছে। বউবাজারের বড়বাড়ি লক্ষ্য করে চলতে চলতে ভূতনাথের একবার সন্দেহ হলো—ঠিক পথেই চলেছে তো সে! রাত্তির বেলা কলকাতার যেন অন্য এক রূপ। যেন আদিম কলকাতার এ এক অনাবৃত চেহারা। এই সূতানুটিতেই বুঝি ছিল পর্তুগীজদের লুকিয়ে থাকবার জায়গা। সপ্তগ্রামের বন্দরে জাহাজ লুঠ করে মেয়েদের এনে লুকিয়ে রাখতে এখানে। এই কলকাতার জঙ্গলে। ভূতনাথের মনে হলো এখন যেন আবার জঙ্গলের মতন বীভৎস মনে হচ্ছে এই কলকাতাকে। আর একটু এগোলেই যেন রতন সরকারের বাড়ি। ধোপ রতন সরকার। সাহেবদের সঙ্গে মেয়েমানুষের দালালি করে বড়লোক হয়ে গিয়েছিল।
হঠাৎ যেন বড় ভয় করতে লাগলো ভূতনাথের। বইতে পড়া সেই কলকাতার সঙ্গে যেন হুবহু মিলে যাচ্ছে। সেই ডিহি কলকাতার পশ্চিমে ভাগীরথী। উত্তরে সূতানুটি, পূর্বে যতদূর যাও কেবল নোনা জমি। আর দক্ষিণ বরাবর গোবিন্দপুর। কলকাতার চারদিকে কাঠের বেড়া। ফ্যান্সি লেন-এর মোড় থেকে কাঠের বেড়া আরম্ভ। সেখান থেকে লারকিন্স লেন-এর ভেতর দিয়ে মিশেছে গিয়ে। একেবারে ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান স্ট্রীটে। তারপর বারোটা লেন, ম্যাঙ্গো লেন, মিশন রে। সেখান থেকে বরাবর লালবাজার, রাধাবাজার, এজরা স্ট্রীট, আমড়াতলা স্ট্রীট, আর্মানিয়ান স্ট্রীট, হামাম গলি, মুরগীহাটা, দর্মা হাটা, খেংরাপটি, বনফিল্ডস লেন, রাজা উডমণ্ড স্ট্রীট দিয়ে এসে একেবারে গঙ্গার ধারে মিশেছিল। এই কয়লাঘাটা স্ট্রীট আর ফেয়ার্লি প্লেস-এর মধ্যে ছিল পুরোনো কেল্লা। আর তার পেছনে ছিল মাল গুদাম ঘর আর ছোট ডক। চার্চ লেন আর হেস্টিংস স্ট্রীট-এর মোড়ে মাটির বুরুজের ওপর কামান সাজানো থাকতো।
চলতে চলতে ভূতনাথ যেন আর এক যুগে এসে পৌঁছে গিয়েছে। নেশার ঘোরে যেন মনে হচ্ছে যা কিছু দেখছে ভূতনাথ সবই অচেনা। এ-সব নতুন জায়গা। কোথায় জানবাজার, কোথায় কসাইটোলা, কোথায় নাপতেহাটা, কলুটোলা, কোথায় কঁকি পটি, হোগল কুড়িয়া, পার্শিবাগান, উল্টোডিঙি, নারকেলডাঙাভূতনাথ যেন সারা কলকাতা ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর্মানি পর্তুগীজ আর ওলন্দাজেরা যেন আবার এসে পড়েছে কলকাতা শহরে। মেটকাফ হল-এর কাছে যেন তাঁতিরা এসে আস্তানা করেছে আবার। ওলন্দাজেরা এসে উঠেছে ব্যাঙ্কশাল স্ট্রীট-এর কাছে। ক্যানিং স্ট্রীট-এর ধারে এসে উঠেছে পর্তুগীজ আর আর্মানিরা। আর ওলন্দাজরা খিদিরপুর থেকে শুরু করে সাঁকরেলের খাল পর্যন্ত বাণিজ্য জুড়ে দিয়েছে কাটিগঙ্গার ধারে ধারে। আলুগুদামের ওপরেই যেন পর্তুগীজদের তুলোর গুদাম উঠেছে আবার।
চুনীদাসীর জানবাজারের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পর্যন্ত ভূতনাথের যেন দিক ভুল হয়ে গিয়েছে। এ কোথায় সে এল! এ তো তার চেনা কলকাতা নয়! কোথায় সেই মাধববাবুর বাজার। সেই বনমালী সরকার লেন! ভূতনাথের মনে হলো—সারা রাত যেন সে এমনি করেই সমস্ত কলকাতা ঘুরে বেড়াচ্ছে। জানবাজারের ফিরিঙ্গী পাড়ায় তখনও কিছু কিছু লোক জেগে আছে। কিন্তু ওদিকে চৌরঙ্গীর রাস্তায় সব যেন নিঃঝুম। রাস্তার ফুটপাথের ওপর সকালের কুলীকাবারিরা বেপরোয়া শুয়ে আছে। পথ বদলে আবার ভূতনাথ ফিরলে উত্তর দিকে। মোড়ের মসজিদটার সামনে তখন একটা ষাড় বসে বসে জাবর কাটছে। কয়েকজন কাফ্রি যেন জাহাজ থেকে নেমে তখনও কলকাতা দেখা শেষ করে উঠতে পারেনি। টলতে টলতে পাশাপাশি ছড়ি দোলাতে দোলাতে চলেছে। হল্লা করতে শুরু করে দিয়েছে। তারপর একেবারে সোজা রাস্তা ধরে বৌবাজার। কিন্তু মেছুয়াবাজারের কাছে এসে যেন খেয়াল হলো। বনমালী সরকার লেন তো সে ছেড়ে এসেছে অনেক দুরে। এধারে কর্নওয়ালিশ স্ত্রীট আর ওধারে বুঝি চিৎপুর রোড। মাঝখানের গলিতে কয়েকটা খোলার বাড়ি। এক একটা দলে দু’তিন জন কাফ্রি যেন বসে বসে গল্প করছে চায়ের দোকানের। সামনে। এ-পাড়ায় মদের দোকান যেন একটু বেশি। এখানে যেন এখনও বেশি রাত হয়নি। সন্ধ্যের মতো আবহাওয়া। ভূতনাথকে দেখেই যেন একদল কাফ্রি তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইল। বড় ভয় হলো ভূতনাথের। এ-পাড়ায় এমন সময় তার আসা উচিত হয়নি। দিনের বেলা এদের এখানে দেখেছে ভূতনাথ। জাহাজ থেকে নেমে এরা দু’তিন জন মিলে এক-একটা খোলার বাড়ি ভাড়া করে থাকে। তারপর গুণ্ডামি করে। অনেকবার লোক খুন হয়েছে এ-পাড়াতে। আগে ‘সোমপ্রকাশে প্রায়ই খুনোখুনির খবর থাকতো এখানকার। গলি গুলো সপিল। এক একটা গলি কোথায় গিয়ে মিশবে কিছু বলা যায় না। এই রকম জায়গাতেই বুঝি ব্রজরাখাল একদিন গুণ্ডার হাতে পড়েছিল। ব্রজরাখালের ভয় ছিল না। গুণ্ডার দল সামনে আসতেই রুখে দাঁড়িয়েছিল ব্রজরাখাল। তারপর সে কী অলৌকিক সাহসের সঙ্গে সেদিন ব্ৰজরাখাল এখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল—তা ভূতনাথ শুনেছে।
