আর বৃন্দাবন দাঁড়িয়ে আছে মুখ গম্ভীর করে, আর তার পাশে রয়েছে মধুসূদন। বড়বাড়ির তোষাখানার সর্দার মধুসূদন। লোচন, শ্যামসুন্দর আর বেণী!
ভূতনাথ কেমন অবাক হয়ে গেল। ওরা এখানে কেন?
মধুসূদন বললে—যদি পারে কেউ তো শালাবাবুই পারে, শালাবাবুর সঙ্গে ছোটমা’র খুব মেলামেশা। এই তো ছুটুকবাবুর বিয়ের সময় ছোটমা’ই শালাবাবুকে কাপড়-জামা-জুতো দিয়েছে, অথচ দেখো না, আমরা এতদিন কাজ করছি, আমাদের বেলায় শুধু একখানা করে ধুতি আর গামছা।
লোচন বললে—আমি বলার মধ্যে বলেছিলাম, দৈনিক একটা করে আধলা—আর মিনি পয়সায় তামাক খেয়ে যাবে—যেমন সবাই খায়—বড়লোকের পয়সা-কে হিসেব রাখে—তাই-ই রাজী হলেন না শালাবাবু, ছোটমা’র কাছে শুনেছি পচ শ’ টাকা জমা রেখেছে, বংশী নিজে বলেছে আমাকে।
বৃন্দাবন বললে—আচ্ছা, মধুসূদন কাকা, ছোটমা’কে মদ ধরালে কে?
মধুসূদন বললে—ওই বংশী, বংশী আর ওর বোন চিন্তা—সব্বনাশ তো ওরা দুজনেই করছে।
লোচন বললে—সব্বনাশের আর বাকি আছে কি।
বৃন্দাবন বললে—তা গাড়ি কেন বেচে দিলে মেজবাবু?
বেণী বললে—ও-গাড়ি মেজবাবুর পছন্দ হলেনি যে, বিলেত থেকে নতুন গাড়ি আসছে যে বাবুর জন্যে।
মধুসূদন ধমক দেয়–তুই থাম, জানিস তো সব, এবার সুখচরের প্রেজার বসিয়ে দিয়েছে একেবারে। ছুটুকবাবুর বিয়েতে কেউ নজর দিতে এল না, কত গিয়ে বললাম—ধন্না দিলাম দোরে দোরে, বললে-বিলের জল শুকিয়েছে আজ দশ সন, গেল বছরে বাঘ এসেছিল বাদায়, ধনে পেরাণে মরছি আমরা খেয়াল নেই তোমাদের, বলে গিয়ে নায়েববাবুকে পেয়াদার পো, আমরা বাঁচলি জমিদারের নাম। মেজবাবু সব শুনে বললে—এবার আমি নিজে যাবো, চাবুক নিয়ে যাবো।
বৃন্দাবন বললে—যাবে নাকি মেজবাবু?
—মেজবাবু আর যেয়েছে। সরকার মশাই বললেও মেজবাবু গেলেও যা হবে, না গেলেও তাই হবে।
বৃন্দাবন জিজ্ঞেস করে–কী হবে?
–কলা হবে-বলে বুড়ো আঙুল উঁচু করে দেখায়। বলে— আমার কি, আমি গিয়ে উঠবে নিজের ঘরে, সুখ-ভাত কপালে
থাকে দুখ-ভাতই খাবো। কলকাতার আর সে-সুখ নেই বিন্দাবন, আমার জ্যাঠা আসতো এখানে, রথের সময় ফিরে গিয়েছে চার কুড়ি পাঁচ কুড়ি টাকা নিয়ে। যেবার সেপাইরা ক্ষেপে উঠলো কলকাতায় বারাকপুরে, সেবার কত সস্তায় জমি-জমা কিনলে, পুকুর কাটালে, তুলসীমঞ্চ করে দিলে আমাদের গাঁয়ে, সাত দিন যজ্ঞি হলো বাড়িতে।
লোচন বললে—কেন, বড়বাড়িতেই কি কম সুখ ছিল নাকি–বড়বাবু তখন বেঁচে, সকালবেলা কুস্তিটুস্তি করে এসে সবে বসেছে নাচঘরে, আমি বেশ করে তামাক সেজে দিয়েছি গড়গড়ায়, মেজাজ ভালো ছিল—সন্ধ্যেবেলা বখশিশ হয়ে গেল এক টাকা—এখন শুধু শুখো মাইনে।
বৃন্দাবন হতাশ হয়ে যায়। বলে—চুনীদাসীকে তুই বুঝিয়ে বল তো-ও যে অত ছোটবাবু ছোটবাবু করে—ছোটবাবু ছাড়া কি আর বাবু নেই কলকেতা শহরে। এই তো ঠনঠনের ছেনি দত্তর ছেলে নটে দত্ত রয়েছে—আসবে বলেছে আমাকে—কিন্তু ও কেবল বলে—ছোটবাবু।
মধুসূদন বলে–ছোটবাবুতে আর শাস নেই রে, যেটুকু আছে বংশীই সব খেয়ে নেবে—দেখিস।
ভূতনাথ আবার চোখ বুজলো। যেন সব গোলমাল হয়ে যায় আবার। মনে হয় যেন সে স্বপ্ন দেখছে। যেন সে শুয়ে আছে ছোটবৌঠানের ঘরে। ছোটবৌঠানের তখন বেসামাল অবস্থা। টানছে কেবল ভূতনাথকে। বলে—ছোটকর্তা যদি জানবাজারে যায়—আমিও থাকবে না বাড়িতে। কোথায় যাবি বল তো ভূতনাথ, বরানগরের বাগানবাড়িতে যাবি! খড়দ’র রামলীলার মেলায়? গঙ্গায় বেড়াবি পানসিতে চড়ে? তারপর হঠাৎ যেন খানিকটা আতর ঢেলে দিলে ভূতনাথের গায়ে। তারপর চিরুণী দিয়ে চুলটা আঁচড়ে দিলে। তারপর বোতল থেকে খানিকটা ঢেলে গেলাশটা বাড়িয়ে দিলে ভূতনাথের দিকে। বললে—খা, একটু চেখে দেখ।
ভূতনাথ বললে—খাবো না আমি, বমি আসবে।
-কিচ্ছু হবে না, ওরকম আমারও হতো, একটু একটু অভ্যেস কর, সব ঠিক হয়ে যাবে।
–কিন্তু কার ওপরে রাগ করে নিজের এমন সব্বনাশ করছে। বৌঠান?
—দূর, রাগ হতে যাবো কেন, দেখবি এ-খেলে আর রাগ দুঃখ কিছু থাকে না, মনে হবে তোর সব আছে, মনে হবে তোর ছেলে
আছে, সংসার আছে, স্বামী আছে—
হঠাৎ বাইরে যেন কার জুতোর মশ মশ আওয়াজ হলো। সবাই সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে। বৃন্দাবন এক মুহূর্তে বাইরে গিয়েই আবার দৌড়ে ফিরে এসেছে ঘরে।
চুনীদাসী জিজ্ঞেস করলে—কে? কে আসছে?
-ছেনি দত্তর ছেলে নটে দত্ত, পালাও মধুসূদন খুড়ো, যা লোচন, তোর যা এ-ঘর থেকে—কালকে দত্তমশাইকে আসতে বলেছিলাম কি না?
কথাটা শুনেই চুনীদাসী ভূতনাথের মাথাটা কোল থেকে নামিয়ে দিলে। তারপর দু’হাত দিয়ে খোঁপাটা ঠিক করে নিতে নিতে বললে—ভালোমানুষবাবুকে ঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে যা তো বিন্দাবন!
৩০. নটে দত্তকে ভূতনাথের এই প্রথম দেখা
নটে দত্তকে ভূতনাথের এই প্রথম দেখা। বেশ লম্বা। চেহারা। ছোটবাবুর মতো অমন গায়ের রঙ নয়। কিন্তু স্বাস্থ্য ভালো। বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চাইলে একবার ভূতনাথের দিকে। তারপর যেন বৃন্দাবনের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলে—এ কে?
বৃন্দাবন কী বললে বোঝা গেল না।
চুনীদাসী যেন বিরক্ত হয়ে বললে—বিন্দাবন, একে সরিয়ে নিয়ে যা না তাড়াতাড়ি!
বৃন্দাবনকে আর সরাতে হলো না। ভূতনাথ নিজেই উঠলো। সমস্ত শরীর যেন টলছে। ওঠবার ক্ষমতাও যেন তখন আর নেই তার। তবু উঠতে হয়। মধুসূদন, লোচন ওরা সব কখন এক ফাঁকে সরে পড়েছে। ভূতনাথ দরজার কাছে এল। বৃন্দাবন ধরতে এসেছিল। বললে-একা বাড়ি যেতে পারবেন শালাবাবু?
