–তা হলে এমন করছে কেন শরীরটা। ভূতনাথের মনে হলো সে বুঝি এখনি টলে পড়বে। মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। সমস্ত শরীরে যেন একটা দোলানি। ছুটুকবাবুর আসরে সিদ্ধি খেয়ে যেমন হয়েছিল এ তেমন নয়। যেন বিষ খেয়েছে সে। বিষ কখনও খায়নি ভূতনাথ। বিষ খেলে কেমন হয় তাও জানবার কথা নয়। কিন্তু তবু যেন মনে হলো তাকে এরা বিষ খাইয়েছে সত্যি-সত্যি। সমস্ত ঘরখানাও যেন তার সঙ্গে দুলছে। দেয়াল, দেয়ালের ছবি, হারমোনিয়মের বাক্স। বয়া তবলা জোড়া
-মাথাটা টিপে দেবো? চুনীদাসী ভূতনাথের মাথাটা নিয়ে নিজের কোলের ওপর রাখলো। বললে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করো তো ভালোমানুষবাবু?
চুনীদাসীর কোলের ওপর শুয়ে কেমন যেন আরাম হলো। কেমন যেন এক অন্য ধরনের স্বস্তি। মাথার তলায় চুনীদাসীর নতুন শাড়িটা কেমন যেন খস খস করছে। চুনীদাসী কি আতর মেখেছে! আতরের গন্ধ বুক ভরে টানতে লাগলো ভূতনাথ। মনে হলো চুনীদাসী তার মাথার চুলের মধ্যে যেন আঙুল দিয়ে আস্তে আস্তে টিপে দিচ্ছে। কপালের কাছে হাতটা আসতেই কেমন আরাম লাগে। চুনীদাসীর আঙুলগুলো কী নরম!
চুনীদাসী বললে—একটু ঘুমোবার চেষ্টা করে দিকি ভালোমানুষবাবু।
ভূতনাথ বললে-তোমার কাপড়টা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
—তা যাক, এখন মাথা ধরাটা সারলো একটু? বলে নিজের কাপড় দিয়ে ভূতনাথের মুখের ঘাম মুছিয়ে দিলে চুনীদাসী।
সত্যি যেন আরাম হচ্ছে বেশ। ভূতনাথ বললে—তোমাদের খুব কষ্ট দিলাম।
-কষ্ট! কষ্ট কিসের ভালোমানুষবাবু, আজ এলে গল্প করতে, তোমাকে আমিই ডেকে পাঠিয়েছিলাম, আর কী কাণ্ড বলে দিকি?
তা তোমার কিছু ভাবনা নেই।
ভূতনাথ বললে-বংশী হয় তো খুঁজবে, আজ সকাল সকাল ফিরতে বলেছিল। কাজও ছিল একটা।
-একটু ঘুমোও, ঘুমিয়ে নাও, শরীরটা ভালো হলে তোমায় গাড়ি ডেকে পাঠিয়ে দেবো-কিচ্ছু ভেবো না।
আবার চোখ বুজতে চেষ্টা করলো ভূতনাথ। কিন্তু মাথার মধ্যে সব যেন গোলমাল হয়ে যায়। হঠাৎ একবার তন্দ্রা আসে আর মনে হয় ঘরে যেন অনেক লোকের ভিড় জমেছে। পুলিশ ঢুকেছে ঘরে। বলছে—একে খুন করেছে কে? আবার যেন মনে হলে বৃন্দাবন ঘরে ঢুকে দাত বার করে হি-হি করে হাসছে। চুনীজাসী বলছে—এইবার একে রাস্তায় ফেলে দিয়ে আয়, আর দরকার নেই। চুনীদাসীরও যেন অন্যরকম চেহারা। বোতল বার করে গেলাশে মদ ঢালছে। তারপর বললে—ডাক তো কাকে, তবলা বাজাবে। তার মধ্যে মনে হলো যেন চুনীদাসী শাড়ি খুলে ফেলেছে। চুলটা বেণী করে বেঁধে নিয়েছে। মাথায় দিয়েছে পাতলা জাফরানি ওড়না। আর মখমলের ঘাঘরা পরেছে। বুকে বেঁধেছে কঁচুলী। তারপর ওধারে কারা তবলা বাজাচ্ছে। গান গাইছে! আর ঘুরে ফিরে নাচছে চুনীদাসী। চুনীদাসীর যেন আর সে-চেহারা নেই। মাঝে মাঝে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অঙ্গভঙ্গী করছে। আসরে মদ উড়ছে, সিগারেটের ধোঁয়া জমেছে। আর ওধারে এক কোণে বসে আছে ছোটকর্তা! বসে বসে রূপোর গড়গড়া থেকে রঙিন রেশমী কাগজে মোড়া ফরসি মুখে দিয়ে ধীরে ধীরে তামাক টানছে। ঘুমের মধ্যেই মনে হলো–কখন সব এল এরা। তাকে কি কেউ দেখতে পাচ্ছে না। ভয়ে জড়সড় হয়ে চোখ মেলতেই সব দৃশ্য ছায়ার মতো যেন মিলিয়ে গেল।
চুনীদাসী ঠিক তেমনি করেই কোলে মাথাটা নিয়ে বসে আছে।
বৃন্দাবনও সামনে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিল। বললে—ওই চোখ চেয়েছেন শালাবাবু।
চুনীদাসীও নিচু হয়ে মুখের কাছে মুখ এনে বললে—এখন
একটু আরাম হচ্ছে ভালোমানুষবাবু?
ভূতনাথ বললে-ছোটকর্তা এসেছিল না?
—কোথায়! না তো-স্বপ্ন দেখছো তুমি। তুমি ঘুমোও, ঘুমোবার চেষ্টা করো।
বৃন্দাবন হঠাৎ বললে—আচ্ছা শালাবাবু, ছোটকর্তাকে একবার নিয়ে আসতে পারেন না এখানে, একদিন শুধু আসবে—একবার।
ভূতনাথ অভিভূতের মতো হাঁ করে চেয়ে রইল বৃন্দাবনের দিকে।
বৃন্দাবন আবার বললে-একবার যদি নিয়ে আসতে পারেন শালাবাবু তো আপনার জীবনে খাওয়া-পরার ভাবনা থাকবে না আর।
চুনীদাসীও বললে—এই দেখছে তো ভালোমানুষবাবু, এই ঘরবাড়ি, আমার গয়নাগাঁটি—সব তোমার হবে।
বৃন্দাবন বললে—ছোটমা আপনাকে আর কী দিয়েছে শুনি? এত যে করেন তার জন্যে, ভালো করে তো খেতেও দেয় না শুনেছি। কেন ওখানে পড়ে আছেন—ওই যে ছোটমা’র সক সম্পত্তি, ও-সব নেবে বংশী, মদ তত ধরিয়েছে, এখন মদের মুখে বেহুশ করে সিন্দুক খুলে সব নেবে আজ্ঞে।
চুনীদাসী বললে—আর এক কাজ করতে পারে না, ছোটবৌঠানের সঙ্গে তো তোমার খুব ভাব—একদিন একটা কিছু খাইয়ে শেষ করে দেবে একেবারে জন্মের মতো সাধ মিটে যাবে।
বৃন্দাবন বললে তার দরকার নেই, আপনি একবার ছোটকর্তাকে, আনবেন এখানে, আমি শুধু এক গেলাশ সরবৎ খাওয়াবে তাকে। এবার নতুন একরকম সরবৎ—সে খেলে আর বাড়ি ফিরতে মন চাইবে না।
এত সব কথা। কথা আর প্রশ্ন। ভূতনাথের মাথাটা আবার ঘুরতে লাগলো। চোখ বুজতেই আবার সেই সব দৃশ্য। চুনীদাসী এবার গায়ের ওড়না, ঘাঘরা, কঁচুলী সব খুলে ফেলেছে। পায়ে শুধু ঘুঙুর। ঘুরে ঘুরে উদ্দাম হয়ে নাচছে। ঘোরবার সঙ্গে সঙ্গে মাথার বেণীটা উচু হয়ে হয়ে ঘুরতে শুরু করেছে। ছোটকর্তা গড়গড়া থেকে মুখ নামিয়ে আর একবার গেলাশে চুমুক দিলে। এমন সময় যেন হুড়মুড় করে পুলিশের দল ঘরে ঢুকে পড়লো। বললে—ভূতনাথবাবুকে খুন করেছে কে? তারপর আবার যেন মনে হলো ছোটকর্তার হাতে হাতকড়া বাঁধা, চুনীদাসীর হাতে হাতকড়া বাঁধ, বৃন্দাবনের হাতে হাতকড়া বাধা, সকলকে পুলিশে ধরেছে! হঠাৎ আবার চোখ খুললো ভূতনাথ। চুনীদাসী তখনও তার মাথাটা কোলে নিয়ে তেমনি বসে আছে।
