চুনীদাসীর পান খাওয়া, দোক্তা খাওয়া, ওঠা-বসা সমস্ত দেখতে দেখতে ভূতনাথের কেমন যেন একটা অদ্ভুত কথা মনে হলো। এই মেয়েকে নাচলে কেমন দেখাবে, কে জানে। ছোটকর্তা তো অল্পে সন্তুষ্ট নয়! ছোটবাবুকে তৃপ্তি যে-সে দিতে পারে না। শুধু রূপ, আর রূপের বাহার থাকলেই চলবে না। সে-রূপের প্রকাশ চাই। অঙ্গভঙ্গি চাই। রূপকে বিকৃত করে, বিশ্লেষণ করে তবে ছোটকর্তার শান্তি। এই ঘর। এই ঘরের মধ্যেই এতদিন ছোট কর্তা তার পরিতৃপ্তি খুঁজেছে এবং পেয়েছে। কিন্তু চুনীদাসীকে বাইরে থেকে দেখে তো কিছু বোঝা যায় না। কোথায় এর বৈশিষ্ট্য। কোথায় এর বৈচিত্র্য। এই মেয়েই হাসিতে, গানে, কথায়, নাচে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে ছোটকর্তাকে। এখন দেখলে কেমন অবাক লাগে! অথচ বড়বাড়িতে যারা পেশাদার নাচিয়ে গাইয়ে আসে, তাদের দেখেই বোঝা যায়। কজ্জনবাঈ, নাগ্নে বাঈ-তাদের চোখের চাউনি আলাদা। তাদের চোখও নাচে অনবরত। নান্নে বাঈ যখন গজল গাইছিল—নয়ন না মেরে—’, তখন তা বোঝা যায়। হাসিনীকেও ধরা সহজ নয়। বড়মাঠাকরুণ বয়েসকালে নাচতে পারতো। পা দেখলে ধরা যায় এখনও। একএকদিন গাড়িতে ওঠবার সময় পায়ের যেটুকু কাপড় সরে গিয়েছে তা দেখে বুঝেছে ভূতনাথ। বুড়ী হয়ে গেলেও আঁটোসাঁটো দেহ। কিন্তু এই চুনীদাসী যেন এক আশ্চর্য মেয়েমানুষ। ভূতনাথের এমন মেয়েমানুষের সঙ্গে এই প্রথম মুখোমুখি কথা বলা।
চুনীদাসী গল্প করে যায়। বলে—তুবড়ি ফাটছে দমাদম শব্দে। ও-বাড়িতে ছাদের আলসের ওপর সার-সার চল্লিশটা তুবড়ি বসিয়ে চল্লিশটা মেয়ে একসঙ্গে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে। চল্লিশটা তুবড়ি অন্ধকার আকাশের দিকে মুখ করে শো শো শব্দে ফুলের তোড়ার মত উড়ে চলেছে। একসঙ্গে চল্লিশটা মেয়ের হুল্লোড়। আর তাদের এক শ’ বাবুর। পাড়াটা মাত হয়ে উঠেছে। ছাদের ওপরেই মাদুর পেতে হারমোনিয়ম নিয়ে নাচ-গান চলেছে। এক শ’ বাবু একসঙ্গে চিৎকার করে ওঠে—কেয়াবাৎ-কেয়াবাৎ
হঠাৎ এদিক থেকে বিন্দাবনও ছুড়লো তুবড়ি। তুবড়ির ঝাঁক! ও-মা-গো-বলে ছিটকে পড়লো মেয়েদের দল! গানবাজনা মাথায় উঠলো তাদের। শাড়িতে, সেমিজে আগুনের ফুল্কি লেগেছে। উদ্দাম হয়ে উঠেছে আসর। তারপর আরো তুবড়ির ঝক গিয়ে পড়লো আবার।
ছোটকর্তা বললেন—দে বৃন্দাবন, সব মাগীদের পুড়িয়ে মার, পাঁচ আনার তুবড়ি নিয়ে বাজি পোড়াতে আসে।
নিচে ছিল মুসলমানদের হোটেল। সেখানে গিয়েও পড়লো কয়েকটা। রাস্তায় লোক জমে গেল। এক-একটা তুবড়ি শোঁ শোঁ করতে করতে যায় আর ছাদের ওপর পড়ে ছত্রখান হয়ে যায়, আগুনের ফোয়ারা ছোটে। কিলবিল করে ওঠে মাগীগুলো। মাগীরা বলে—এ কী কাণ্ড মা, পালিয়ে যাই নিচে।
কিন্তু বাবুরা.ছাড়বে কেন? তারা পয়সা খরচ করে ফুর্তি করতে এসেছে, এত সহজে মাটি হবে সব! দু’একটা মাগী মরলো কি গেল, তাতে তাদের কী। সারা বছরে যাদের বাবু জোটে না, কালীপূজোর দিন তাদের ঘরেও লোক আসে। দুটো ভালো-মন্দ জিনিষ পেট ভরে খেতে পায়। মাংস হয়, ভালো ভালো মদ আসে—ভালো জামা-কাপড় পায়, সেদিনটা এমন করে নষ্ট হবে নাকি! গঙ্গায় গিয়ে দেখেছি, পানসির ভাড়া চৌডবল হয়ে গিয়েছে। কালীপূজো, কার্তিক পূজো—এগুলোই তো ওদের মরশুম। গল্প করতে করতে চুনীদাসী আবার ডাকলে-সরবৎ হলো তোর বিন্দাবন?
ভূতনাথ বললে–তারপর?
-তারপর একটা তুবড়ি এসে পড়লো একেবারে ছোটকর্তার গায়ের…
হঠাৎ বৃন্দাবন সরবৎ নিয়ে ঘরে ঢুকলো। বললে—ধরুন শালাবাবু।
বিছানার পাশে রাখলো দু’ গেলাশ সরবৎ। রূপোর গ্লাশ। বেশ ঝকঝক করছে। ওপরে বৃন্দাবনী কাজ করা। একটাতে লেখা চুনীদাসীর নাম। আর একটাতে কৌস্তুভমণি চৌধুরীর। ছোটকর্তার গেলাশটা ভূতনাথের সামনে রাখলো বৃন্দাবন। আবার বললে-চেঁ-চো করে মেরে দিন শালাবাবু, দেরি করবেন না।
বৃন্দাবন চলে গেল। ভূতনাথ বললে–কিসের সরবৎ এ?
—খেয়েই দেখোনা ভালমানুষবাবু, তেঁতুল দিয়ে বেশ করে গেলাশ মেজে দিয়েছে, বামুনমানুষকে কি আমরা যা-তা জিনিষে খেতে দিতে পারি—নাকি আমাদের আক্কেল বিবেচনা নেই?
ভূতনাথ তবু দ্বিধা করতে লাগলো। সিদ্ধি নয় তো? সেবার ছুটুকবাবুর আসরে সিদ্ধি খেয়ে কী কাণ্ড—প্রাণ যায় আর কি—মনে হয় বুঝি সমস্ত বাড়িটা উল্টে যাচ্ছে।
চুনীদাসী ততক্ষণে নিজের গেলাশটা নিয়ে চুমুক দিতে শুরু করেছে। সমস্তটা শেষ করে মুখ দিয়ে একটা শব্দ বার করলে-–আঃ, বেশ হয়েছে সরবৎটা।
কিন্তু এদিকে আর এক কাণ্ড ঘটে গেল। সরবৎ মুখে তুলে চুমুক দিতেই মাথাটা যেন হঠাৎ ঘুরে উঠলো ভূতনাথের। আর সঙ্গে সঙ্গে হাত পিছলে গেলাশটা কাত হয়ে পড়েছে।
—ঐ যাঃ, কী হলো—চুনীদাসী হঠাৎ সামনে এগিয়ে এসে ধরতে গেল। কিন্তু তার আগেই যা হবার তা হয়ে গিয়েছে। সরবং গড়িয়ে বিছানা ভিজিয়ে দিয়েছে। একাকার হয়ে গিয়েছে সমস্তটা জায়গা। চুনীদাসী বললে–পড়ে গেল? দেখি দেখি?
তখন বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছে ভূতনাথ। তার নিজের জামায় কাপড়েও পড়েছে। বিছানাটাও নষ্ট হয়ে গেল।
চুনীদাসী এগিয়ে এসে নিজের শাড়ি দিয়ে ভূতনাথের হাত মুখ মুছিয়ে দিলে। ভূতনাথের দিকে চেয়ে যেন বুঝতে পারলে ব্যাপারটা। ভূতনাথও অপ্রস্তুত হয়ে বললে—মাথাটা ঘুরে উঠলো কি না—
কিন্তু মনে হলো আর যেন বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারবে ভূতনাথ।
–এখনো ঘুরছে মাথাটা?
ভূতনাথ বললে—সরবতে কী ছিল?
—থাকবে আবার কী ভালোমানুষবাবু, সবাই খেয়েছে, এই তো আমিও খেলাম!
