—যাই গো, বলে পাশের কোথা থেকে বৃন্দাবনের সাড়া এল।
—পাখীটাকে ছোলা দিয়েছিস? এই দেখোনা, এই এক জ্বালা হয়েছে, ক’দিন থেকে পাখীটা মুখে কিছু কাটছে না ভাই, সাত দিকে সাত ঝঞ্চাট হয়েছে আমার ছোটবেলা থেকে পুষেছি কি না, এখন মায়া পড়ে গিয়েছে।
বৃন্দাবন এল। চুনীদাসী বললে—থাকোকে ডেকে দে তো।
ভূতনাথ চারদিকে চেয়ে-চেয়ে দেখতে লাগলো। ছোটবৌঠানের ঘরের সঙ্গে এ-ঘরের অনেক তফাৎ। কয়েকটা ছবি দেয়ালের গায়ে ঝুলছে। বিলিতি ছবি বলে মনে হয়। শাড়ি খসে পড়েছে পরীদের গা থেকে। জলে স্নান করতে নেমেছে একজন পরী। পাহাড়ের ঝরণার ধারে একটি পরী নিজের শরীরটার ছায়া দেখছে আপন মনে। কোথাও তিনটে পরী অপরূপ ভঙ্গী করে দাঁড়িয়ে আছে। কাপড়-জামার বালাই নেই কারো।
ঘরের মধ্যে, যেন একটা কিসের তীব্র গন্ধ। অথচ ছোটবৌঠানের ঘরে গেলেই সব সময় ধূপ-ধুনোর গন্ধ নাকে আসে। কিন্তু এখানে অন্যরকম। অচেনা একটা উত্তেজনা আসে আপনা থেকেই। বিছানাটা খুব পুরু। বসতেই আধ হাত গর্ত হয়ে যায়। মোটা-মোটা খান পাঁচ-ছয় তাকিয়া। বিছানার ওপরেই পানের রেকাবি, মশলার কৌটো। আর ঘরের এক কোণে একটা গড়গড়া। তলাটা রূপোর মতো ঝক ঝক করছে।
চুনীদাসী বললে—অমন আড়ষ্ট হয়ে বসে কেন ভালোমানুষবাবু, ভালো করে হেলান দাও ভাই।
ভূতনাথ দেখলে চুনীদাসীর নাকেও একটা হীরের নাকছাবি। অনেকটা যেন বৌঠানের নকল। কিন্তু চুনীদাসী পান খায় বৌঠানের চেয়ে বেশি। সেদিন এই বিছানার ওপরেই ছোটকর্তা শুয়ে ছিল। কিন্তু সেদিন চুনীদাসীকে এত সুন্দর মনে হয়নি। আজ যেন বড় ভালো লাগতে লাগলো চুনীদাসীকে।
চুনীদাসী খানিক পরে বললে—তামাক দিতে বলবে? তারপর ভূতনাথের মুখের ভাব লক্ষ্য করে বললে-তোমার ভয় নেই ভালোমানুষবাবু, বামুনের হুঁকোও আছে।
তামাক খায় না শুনে চুনীদাসী কিন্তু অবাক হলো না। বললে —আমারও তামাক খেতে ভালো লাগে না—আর তেমন তামাক আনতেও পারে না বিন্দাবন, ছোটবাবু রাগ করে বিন্দাবনের ওপর, আগে ছোটবাবু তামাক খেতো, ঘর একেবারে গন্ধে ভরপুর হয়ে যেতো—সব জিনিষে আজকাল আগুন লেগেছে ভাই।
ভূতনাথ বললে-একটু জল বরং দাও—জল তেষ্টা পেয়েছে।
-জল কেন, সরবৎ দিক না।
–না, সরবৎ দরকার নেই, জলই যথেষ্ট।
—সরবৎ তো হচ্ছে—তৈরি হচ্ছে, হলেই দিয়ে যাবে। রোজই সরবৎ হয় আমার এখানে, ছোটকর্তা খেতে কিনা-ছোটকা কেমন আছে আজকাল ভালোমানুষবাবু?
ভূতনাথ বললে—সেই রকমই—একবার ওঠেন, আবার পড়েন।
-কেউ দেখে না বুঝি? চুনীদাসী বলতে লাগলো—আমি কত সাবধানে রাখতাম তাকে—কোনোদিন যদি বেশি মদ খেয়ে ফেলতো, বারণ করতাম, বলতাম। অথচ কারো সহ্য হলো না—তা ছোটকর্তা কি ওষুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে?
ভূতনাথ বললে—আমি ঠিক জানি না, বংশী,জানে।
—ওই একটা বদমাইস, বংশী। আমাকে বলে কিনা বেবুশ্যে। শুনিছি সব, বড়বাড়ির কি আমিই প্রথম নাকি? মেজদি’র বাবার মেয়েমানুষ নেই? কলকাতার কোনো বাড়ির খবর জানতে তো আর বাকি নেই। এখানে সবাইকে আসতে হয়েছে, কালীপূজোর দিন ছোটবাবুকে কে বাঁচালে শুনি? নইলে আগুনে পুড়ে তে একাকার হয়ে যাচ্ছিলো! তা তো বংশী জানে না।
ভূতনাথের চোখে বিস্ময় দেখে চুনীদাসী বললে—সে খবর জানো না?
ভূতনাথ বললে—শুনিনি তো!
-ওই যে পাশের বাড়িটা দেখছো, ওর দক্ষিণে যে বাড়িটা, ওইখানে থাকে কতকগুলো মাগী, বাজারের মেয়েমানুষ, তা সেবার কালীপুজোর সময় ও-বাড়ির বাবুরা তুবড়ি জ্বালাচ্ছে খুব, ছোটকর্তার সঙ্গে আমিও বাজি দেখতে উঠেছি ছাদের ওপর। একটা বাজি এসে পড়লো একেবারে আমার বাড়ির উঠোনে—আর সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠেছে সুখী।
–সুখী কে?
–আমার আগে একটা টিয়াপাখী ছিল, তার খাঁচার ওপর এসে পড়েছে একেবারে—আর চেঁচাচ্ছে খুব। মরতে মরতে নেমে এলুম নিচে, দেখি তখন সুখীর শেষ অবস্থা ভাই, কেঁদে তো আমি বাঁচিনে–তা ছোটকর্তাকে চেনো তো তুমি, রেগে গেলে ও-মানুষের জ্ঞান থাকে না, বললে—এখুনি তুবড়ি কিনে আনো-হাজার টাকার তুবড়ি।
–হাজার টাকার তুবড়ি?
–ছোটকর্তার তো হাজার ছাড়া কথা নেই—হাজার টাকা বলেই খালাস-তা বিন্দাবন গেল তুবড়ি কিনতে—কিন্তু হাজার টাকার তুবড়ি কি চাট্টিখানি কথা! তা যা পাওয়া গেল, কুড়িয়েবাড়িয়ে তখুনি নিয়ে এল কিনে।
ছোটকর্তা বলেছোঁড়ো সবাই ওদের দিকে।
তা সেদিন সবাই এসেছিল, মধুসূদন, লোচন, আমার দারোয়ান, চাকর, সবাই।
—মধুসূদন কি এখানে আসে নাকি? ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে।
-হ্যাঁ, রোজই তো আসে। ওরা তো আমার দেশের লোক। রোজ সরবৎ খেয়ে যায়—তা তুমি জানতে না ভালোমানুষবাবু? মধুসূদন আসে, লোচন আসে, মাঝে-মাঝে শ্যামসুন্দর, বেণী, আগে শশীও আসতো, বিন্দাবন যে সরবৎটা তৈরি করে ভালল, ওর যে নাম-ডাক আছে কলকাতায়।
তারপর চেঁচিয়ে ডাকলে চুনীদাসী হ্যাঁ রে, সরবৎ হলো তোদের? তা তারপর কী হলো বলি—শোনো ভাই।
চুনীদাসী আর একটা পান মুখে পুরে দিলে। তারপর বোঁটায় করে খানিকটা চুন। তারপর জর্দার কৌটো খুলে মুখে পুরে দিলে খানিকটা। একমুখ পান, রসে বোধ হয় সমস্ত মুখখানা ভরে উঠেছে। তারপর সরে গিয়ে ফরাশের বাইরে পিকদানিটায় খানিকটা পিক ফেলে মুখ মুছতে মুছতে বললে—পান মুখে দিয়ে গল্প করতে পারি নে ভাই আমি।
ভূতনাথ বললে—তারপর কী হলো?
আবার মুখে রস জমে উঠেছে। চুনীদাসী আবার সরে গিয়ে পিক ফেললে। বললে—দূর হোক গে ছাই, মুখটা ধুয়েই ফেলি। জদা খেয়ে তোমার সঙ্গে গল্প করতে জুত হচ্ছে না, ডাকলে— থাকো, এক ঘটি জল দে তো মেয়ে?
