হঠাৎ ভূতনাথের মনে হলো—তাই তো—এতক্ষণ মনে ছিল —বংশী যে বার-বার করে বলে দিয়েছিল সকাল সকাল বাড়ি আসতে। ছোটবৌঠান হয় তো সেজে-গুজে তৈরি হয়ে বসে থাকবে। মিয়াজান গাড়ি নিয়ে হাজির। হয় তত বংশী সারা বাড়ি খোঁজাখুজি চালিয়েছে। এখন আর বড়বাড়ির সে-জাঁক নেই। দুটুকবাবুর গানের আসরই বসে না। সারা উঠোনটা এখন যেন খাঁ খাঁ করে। শুধু যেন শূন্য পুরীর সামনে ব্রিজ সিং বন্দুক নিয়ে ঝিমোয়। আগে পায়চারি করতে, এখন ঝিমোয়। হাবুল দত্ত এখন এসে সেই যে ঢোকে মেয়ে-জামাই-এর ঘরে আর বেরোয় সেই রাত্রে! কী ফুস-মন্তর দেয় কে জানে। মেজবাবু একাই চালিয়েছে তার নৈশ উৎসব। আজো হাসিনী আসে, মেজ মাঠাকরুণ আসে, পানের ডিবে নিয়ে বড়মাঠাকরুণও আসে সেদিন হঠাৎ নান্নে বাঈ-এর নাচ-গানও হয়ে গেল। কিন্তু তেমন যেন জমলো না। বাঈজী এলে তিন দিন ধরে গানবাজনা চলতে আগে। একদিনে কখনও শেষ হয়নি আসর। নান্নে বাঈ গজল গেয়েছে, ঠুংরি গেয়েছে, কিন্তু তেমন বাহবা পায়ান যেন এবার। মেজবাবুর যেন তেমন মেজাজ ছিল না। নাচতে নাচতে মোহর তুলে নিয়েছে ঠোট দিয়ে। কিন্তু ওই একবারই। আর মোহরু পড়েনি রূপোর থালায়। এবার যাবার সময় বেনারসীর চমকদার ওড়নাও পেয়েছে। যেমন পায় অন্যবার। কিন্তু তেমন খুশি হয়নি যেন বাঈজী। মুন্নালাল তেমন করে সারেঙ্গী বাজাতে বাজাতে লুটিয়ে পড়েনি আসরের ওপর। নান্নে বাঈ-এর ঘোমটা ততটা ফাঁক হয়নি নাচতে নাচতে। তাল কেটে গিয়েছে বার বার। আসরের পর অনেক রাত্রে মেজবাবুর খাস কামরায় ডাকও পড়েনি তার! এ যেন নেহাৎ নিয়ম রক্ষা। আহা, এসেছে আশা করেফিরে যাবে! এমনি ভাব।
আর ছোটবাবু! ছোটবাবু কেন আবার যাবে জানবাজারে? কিসের বিরোধ বাধলে বৌঠানের সঙ্গে! মদ কি খায়নি ভালো করে ছোটবৌঠান! কায়দা-কানুনে কিছু ত্রুটি ছিল কি? কিম্বা হয় তো ঠিক বিয়ে করা স্ত্রীকে নিয়ে তেমন ফুর্তি হয় না। যেমন করে চুনীদাসী আদর করে আপ্যায়ন করে ঠিক তেমনটি হয় তো হয় না পটেশ্বরী বৌঠানের। কিন্তু চুনীদাসীকেও তো সেদিন ভালো করে দেখেছে ভূতনাথ! চুনীদাসী তাকে সেদিন ‘ভালোমানুষবাবু’ বলে ডেকেছিল! সত্যিই বাহাদুরি আছে চুনীদাসীর! বার-শিমলেয় যেতে-যেতে সেদিনকার ঘটনাটা মনে পড়লে ভূতনাথের।
সেদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো ভূতনাথ, দেখতে পেয়েছে বৃন্দাবন? বললে—আমি চুনীদাসীকে বলেছিলাম আপনি আসবেন—তা চলুন এখন, এই তো দু পা গেলেই আমাদের বাড়ি।
-না, না, তা হতেই পারে না বৃন্দাবন, আমার অন্য কাজ আছে, বিশ্বাস করো।
টানাটানি। কিছুতেই ছাড়ে না।
ভূতনাথ বললে—আমার অনেক কাজ হাতে, জানো তো পরের বাড়িতে থাকি—সময়ে না খেলে…
—সে আমি শুনছি না শালাবাবু।
—আচ্ছা, যাবো একদিন কথা দিচ্ছি—কিন্তু আজ নয়।
–না শালাববু, সে হবে না।
শেষ পর্যন্ত যেতেই হলো। আগে একদিন মাত্র ভূতনাথ এসেছিল বংশীর সঙ্গে। সেই দরজা পেরিয়েই সরু একফালি বারান্দা। তারপরেই ওপরে ওঠবার সিঁড়ি।
বৃন্দাবন আগে আগে চলতে লাগলো। বললে—চলে আসুন। শালাবাবু। ওপরে গিয়ে বৃন্দাবন যেন কাকে লক্ষ্য করে বললেদেখো গো কাকে নিয়ে এসেছি!
–কে রে? মেয়ে গলায় কে যেন সাড়া দেয়। মনে হলো যেন চুনীদাসীর গলার আওয়াজের মতন।
—এই দেখো, চিনতে পারো!
ভূতনাথ একেবারে ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। এক গা গয়না পরা চুনীদাসী বসে আছে তখন ফরাশের ওপর। সামনে পানের ডাবর। চুন, সুপুরি, লবঙ্গ, এলাচের কৌটো। মোটা হয়েছে যেন আরো। ফরসা টক টক করছে গায়ের রং। পাতাকাটা চুল। ভূতনাথকে দেখে বাঁ হাত দিয়ে একটু ঘোমটা উঠিয়ে দিলে মাথায়।
–ওমা, তাই বলি, এসো, এসো।
রীতিমতো আদর অভ্যর্থনা। বৃন্দাবন ফরাশের সামনেটা একটু ঝেড়ে-ঝুড়ে সাফ করে দিলে। বললে-বসুন এখানে শালাবাবু আয়েশ করে—তারপর তাকিয়াটাও একটু সরিয়ে দিলে ভূতনাথের দিকে।
বৃন্দাবন বললে—ভারী ভালোমানুষ এই আমাদের শালাবাবু, ছোটমা’র জন্যে কী কষ্টটাই না করে, জানলে চুনী।
সামনে দুটো পানের খিলি একটা রেকাবিতে করে এগিয়ে দিয়ে চুনীদাসী বললে—আহা, তা করবে না গা, যে ভালোমানুষ হয় তার সবই ভালো-খাও ভালোমানুষবাবু, পান খাও—ভাই।
ভূতনাথ যেন অবাক হয়ে গিয়েছে। দেয়ালের গায়ের তাকে থরেথরে সাজানো বোতলের সারি। ওপাশে ঝালর দিয়ে ঢাকা একটা কী জিনিষ। বোধহয় হারমোনিয়ম। তার পাশেই উপুড় করা একজোড়া বাঁয়া তবলা। তারই পাশে একজোড়া ঘুঙুর। আর ঠিক মাথার ওপর দেয়ালের গায়ে ঝুলছে একখানা তেল রং-এর ছবি। ছোটকর্তার।
বৃন্দাবন বললে বেশ আয়েশ করে তাকিয়া হেলান দিয়ে বসুন শালাবাবু-অমন আড়ষ্ট হয়ে আছেন কেন?
ভূতনাথ হেলান দিয়ে বসে বললে—কই, আড়ষ্ট হয়ে নেই তো?
-হ্যাঁ, দিব্যি গা এলিয়ে দিন, দিয়ে চুনীর সঙ্গে গল্প করুন। ক’দিন থেকে ভাবছি অত করে বলে এলুম শালাবাবুকে, একবার এলেন না। তা চুনী বলছিল আসবে নিশ্চয়ই, বলেছে যখন ভালোমানুষবাবু, তখন আসবে নিশ্চয়ই।
চুনী পান চিবোতে চিবোতে বললে—সত্যি ভাই, ভালোমানুষবাবু, বলছিলুম ক’দিন ধরে, বলি সেই গেল, এত করে আসতে বলে দিলাম, একদিন এল না। একবার ভাবলাম নিজেই আবার যাই…তা গাড়িটা বেচে দিয়েছি শুনেছো বোধ হয়—তা এত রোগা হয়ে গিয়েছে কেন ভালোমানুষবাবু।
তারপর কী যেন ভেবে নিয়ে ডাকলে—ওরে বিন্দাবন—
ভূতনাথেরও হঠাৎ নজরে পড়লো বৃন্দাবন কোথাও নেই। অথচ এতক্ষণ এখানেই ছিল!
