সেটা পরে বললেও তো চলতে–এখন তো তুমি খুব ব্যস্ত।
—যত ব্যস্ততাই থাক, আমি কাজের মধ্যে এতক্ষণ ভুলে ছিলাম—কিন্তু মনে পড়েছে এখন।
-কিছু অন্যায় করেছি আমি?
-আপনার নিজের সাহস নেই বলে বাবার কাছে ননীলালকে পাঠিয়েছিলেন কী বলে?
—কে, ননীলাল?
—শুধু তাই নয়, আপনার ছাড়পত্র না থাকলে এখানে ঢোকে সে কোন্ সাহসে? আপনি তাকে কেন বাবার কাছে পাঠিয়েছিলেন শুনি?
–বিশ্বাস করো…
–বাবার সমস্ত সম্পত্তি সে আত্মসাৎ করতে চায়—এই সহজ কথাটাই সে বলতে পারতো কিন্তু ব্যাঙ্কের নাম করে সে ঠকাতে চায় কেন? কেমন করে সে খবর পেলে যে আমরা আমাদের সমস্ত সম্পত্তি সমাজে দিয়ে দিচ্ছি।
ভূতনাথ অপরাধীর মতো বললে সেটা আমিই বলেছিলুম।
–শুধু বলেননি, তাকে আবার পাঠিয়েছিলেন আমাদের কাছে, সে তো আপনার নাম করেই কথাটা পাড়লেনইলে ননীলালের এত সাহস হবে না যে আমার সামনে সে মুখ দেখায়। সমাজের কোনো মেয়ের সম্ভম সে রাখতে পারেনি, কারো বিশ্বাস সে অর্জন করতে পারেনি, হতে পারে বড়লোক হয়েছে সে, বড় বড় জায়গায় তার খাতির হয়, কিন্তু আপনি তো জানেন আমরা সে-দলের নই। আমাদের শিক্ষাদীক্ষা সব আলাদা, আমরা টাকা দিয়ে ঐশ্বর্য দিয়ে মানুষের বিচার করি না। মনুষ্যত্ব যার নেই, তাকে বাবা প্রশ্রয় দেন না, আমরা যে-সমাজের লোক সে-সমাজে সকলের চেয়ে বড় মনুষ্যত্ব-বাবার কাছে এই শিক্ষাই আমি পেয়েছি এতদিন।
ভূতনাথ তালাচাবি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বললে— হয় তো আমি দোষীই জবা, কিন্তু বিশ্বাস করো আমি তাকে এখানে পাঠাঁইনি।
জবা বললে—তা হলে সে এল কোন্ সাহসে?
ভূতনাথ বললে—সে আমি জানি না, আর ননীলালকে যদি তুমি ভালো করে চিনেই থাকো তো বুঝতে পারে যে আমার পাঠানোর ধার সে ধারে না। —কিন্তু আপনি তার বন্ধু! ভাবতেই যে ঘেন্না হচ্ছে।
—বিশ্বাস করো জবা…
হঠাৎ দূর থেকে সুবিনয়বাবুর গলা শোনা গেল—জবা-মা
—আসি বাবা বলে জবা চলে গেল।
ভূতনাথের শরীরের সমস্ত শক্তি এক নিমেষে যেন অন্তর্ধান করেছে। তালা নিয়ে খোলা দরজাটার সামনে যেন পাথরের মতন দাঁড়িয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর অনেকক্ষণ পরে চাবির হিসেব করে যখন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো তখন বেশ অন্ধকার হয়েছে। সুবিনয়বাবুকে মুখ দেখাতেও লজ্জা হলো তার। ননীলাল কেন অমন করলো। সে তো সঙ্গে করেই নিয়ে যাবে বলেছিল!
সুবিনয়বাবু সিঁড়ি দিয়ে ধীরে ধীরে নামছিলেন। তাঁর হাত ধরে জবাও নামছিল। পেছনে পেছনে সুপবিত্র। সমাজের কয়েকজন ভদ্রলোকও এসে দাঁড়িয়েছিলেন। পাড়ার কয়েকজন বিশিষ্ট লোকও ছিলেন। কয়েকটা ছোট ছোট ছেলে মেয়ে। ভূতনাথ গিয়ে ধরলো সুবিনয়বাবুকে। ধরে আস্তে আস্তে নামিয়ে আনলে।
গাড়িতে প্রচুর জিনিষপত্র বোঝাই হয়েছে। ছাদের ওপর আর জায়গা নেই। কয়েকটা দামী জিনিষ গাড়ির ভেতরে। পেছনেও বাঁধা রয়েছে কিছু মাল।
ধীরে ধীরে সুবিনয়বাবুকে গাড়িতে তুলে দিলে ভূতনাথ। বললে—একটু সাবধানে উঠবেন, মাথাটা বাঁচিয়ে।
তারপর জবা উঠলো। উঠে সামনের বেঞ্চিতে বসলো।
সুবিনয়বাবু উপস্থিত ভদ্রলোকদের সঙ্গে দু একটা কথা বলে সুপবিত্রকে ডাকলেন—উঠে এসো, আর দেরি নয়, রাত হচ্ছে।
ভূতনাথও সুপবিত্রকে বললে—উঠুন আপনি।
নিঃশব্দে সুপবিত্রও গিয়ে উঠলো গাড়িতে।
আর জায়গা নেই কোথাও।
সুবিনয়বাবু বললেন—ভূতনাথবাবু তুমিও উঠে এসো—
ভূতনাথ বললে—আপনি ব্যস্ত হবেন না, আমি যা হোক করবে খন।
সুবিনয়বাবু যেন একটু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন—তাহলে মা, ভূতনাথবাবু কোথায় বসবেন?
ভূতনাথ তাড়তাড়ি বললে—আমি হেঁটেই যাবো খন।
–-ছাদে জায়গা নেই? নয় তো পেছনে?
–আমি হেঁটেই যাবো পেছন পেছন আপনি ভাববেন না। জবাও এতক্ষণে বললেহ্যাঁ, উনি হেঁটেই যেতে পারবেন। ওঁর হাঁটা অভ্যেস আছে খুব।
ভূতনাথ বলে উঠলো, আমার হাটা অভ্যেস আছে, গাভোয়ান গাড়ি ছেড়ে দাও।
আর কেউ কিছু উচ্চবাচ্য করলো না। গাড়োয়ান ছেড়ে দিলে গাড়ি। একটা ঢি ঢি শব্দ করলে মুখ দিয়ে। ঘোড় দুটো প্রথমে একটু নড়ে উঠলো। তারপর কলকাতার খোয়ার রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ির চাকার কর্কশ শব্দ কানে আসতে লাগলো শুধু। সুবিনয়বাবুর ইতিহাস চলতে লাগলো কর্কশ বন্ধুর পথ ধরে। সে ইতিহাস বড়বাড়ির মতো নিশ্চল স্থাণুর ইতিহাস নয়। অনেক পথ, অনেক ধাক্কা সামলাতে সামলাতে তাকে পৌঁছতে হবে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বিবেকানন্দর ধারা ধরে ধরে এসে পৌঁছুবে নতুন সভ্যতার সিংহদ্বারে।
ভূতনাথও হাঁফাতে হাঁফাতে চলতে লাগলো। গাড়ির পেছনে দুটো লাল আলোর বিন্দু দেখা যায়। সেই অন্ধকারে লাল দুটো বিন্দুকে নিশানা করে চলা। কোথায় বাগবাজার, কোথায় বারশিমলে! তা হোক, সে তো পাড়াগাঁয়ের ছেলে! সে ভাত খায় বেশি, তার হাঁটা অভ্যেস আছে। অভ্যেস নেই সুপবিত্রর। সে বড় ভুলো মানুষ। ‘ভাত খাবার কথা মনে থাকে না তার। এখনও তার মা তাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কেমন করে যে সে সংসার করবে কে জানে! বেশি পরিশ্রম করলে সে বুঝি ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মুখের চেহারা খারাপ হয়ে যায়। সে-ই বরং গাড়িতে যাক।
হাঁটতে হাঁটতে এক-একবার রাস্তার খেয়ায় হোঁচট লাগে ভূতনাথের। তা হোক। সুপবিত্র তো গাড়িতে চড়েছে। সুপবিত্র অত হাঁটতে পারবে কেন। সুপবিত্রকে অত হাঁটালে হয় তো তার মা রাগ করবে। রাগ করবে জবার ওপর।
সন্ধ্যে অনেকক্ষণ উৎরে গিয়েছে। কয়েকটা খোলার বাড়ি ট্রাম রাস্তার ধারে। রাস্তায় গ্যাসের আলো হয়েছে। বাড়ির ভেতরে সব টিম টিম করে তেলের আলো জ্বলছে। একটা মোড় ঘুরতেই গাড়িটা চোখের আড়ালে চলে গেল।
২৯. বার-শিমলের পথে একলা হাঁটতে
বার-শিমলের পথে একলা হাঁটতে হাঁটতে ক’দিন আগেকার একটা ঘটনা মনে পড়লে ভূতনাথের।
