সুবিনয়বাবু বললেন—যেবার কেশববাবু বিলেত গেলেন, বোধহয় ১৮৭০ সাল। যাবার আগে এখানে এসেছিলেন—ওই চেয়ারটায় বসেছিলেন তিনি। তিনি আমাদের কয়েকজনকে ডেকে কিছু বলেছিলেন, সব মনে নেই, কিছু কিছু মনে আছে, বলেছিলেনমহাপুরুষরা যেন চশমা, চশমা যেমন চোখকে আবরণ করে না, অথচ দৃষ্টির উজ্জ্বলতা বাড়ায়, মহাপুরুষরাও হলেন তেমনি মানুষ আর ঈশ্বরের মধ্যে তারা কোনো ব্যাঘাত সৃষ্টি করেন না, কিন্তু ঈশ্বর দর্শনে সাহায্য করেন আবার আর একটা উপমা দিয়েছিলেন মনে আছে। বলেছিলেন-মহাপুরুষরা যেন দারোয়ান-দারোয়ান যেমন আগন্তুককে প্রভুর কাছে নিয়ে যান, আর তারপর আর কোনো কাজ থাকে না তার, মহাপুরুষরাও তেমনি ঈশ্বর চরণে মানুষকে নিয়ে যান।
সুবিনয়বাবুর আজ যেন কথা আর শেষ হতে চায় না।
জবা বলে-বাবা সন্ধ্যে হয়ে আসছে এইবার চলুন।
সুবিনয়বাবু বললেন–আর একটু দাঁড়াও মা, এ-বাড়িতে তো আর আসা হবে না—আর একটু বলেনি মা। ভূতনাথবাবু তো সব কথা জানে না। সুপবিত্রবাবু, তোমার শুনতে খারাপ লাগছে না তো?
সুপবিত্র মাথা নিচু করলো।
–এই বাড়িতে কি কম ঘটনা ঘটে গিয়েছে। এখনও চোখ বুজলে সব যে দেখতে পাই। কেশববাবু তখন ফিরে এসেছেন বিলেত থেকে–কত কাজ আমাদের-Indian Reform Association নামে আমাদের সভা হলো একটা—তার প্রথম অধিবেশন হলো এইখানে। কত কী করবার ইচ্ছে ছিল তার Temperance, Education, Cheap literature, Technical education-কত বিভাগ হলো, শিবনাথ শাস্ত্রী বই লিখলেন ‘মদ না গরল’, তারপর ‘সুলভ-সমাচার’ নামে এক পয়সা দামের খবরে কাগজ বেরুলে—তাতেও আমি লিখতাম।
সুপবিত্র চুপ করে বসে বেনিয়ানের বোতামটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। জবা সব কাজ শেষ করে এসেছে। সমস্ত বাড়িটা কাল সকালেই একটা হাসপাতালে পরিণত হবে। এখানে ঘরে ঘরে রোগীর শুশ্রুষা চলবে। সুবিনয়বাবুর বহুদিনের স্বপ্ন সফল হতে চলেছে। কিন্তু আজ এই বিকেলবেলার সন্ধিক্ষণে বাড়ির ঘরগুলোর দিকে চেয়ে যেন মনে হলো—সমস্ত মৃত আত্মারা হঠাৎ আবার বুঝি পদচারণা শুরু করেছে। কান পেতে শুনলে যেন অতীতের আত্মাদের কথা শুনতে পাওয়া যাবে। মনে পড়লে জবার মা’র কথা। ওইখানে একটা আরামকেদারায় বসে বসে পশম বুনছেন আর যেন আপন মনে কী ভেবে চলেছেন। আর সেই গান।—“তুমি ব্ৰহ্মা তুমি বিষ্ণু। ব্রজরাখালের সঙ্গে ভূতনাথ যেদিন প্রথম এ-বাড়িতে এসেছিল সেদিনের সে-ছবিটা যেন চোখের সামনে ভাসে।
সুবিনয়বাবু বলে চলেছেন, কিন্তু ভূতনাথের যেন কিছুই কানে যায় না। বড়বাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে এ-বাড়ির ইতিহাসের যেন কোনো মিল নেই। অথচ এত কাছাকাছি। এত সমসাময়িক। ভূমিপতি চৌধুরী যখন ইটালিয়ান শিল্পীর মেমকে নিয়ে ঘরে এনে তুললেন, তখন কলকাতার প্রথম আমল। সমাজ তখন ছিল ক্ষয়িষ্ণু। কিন্তু ভূমিপতি চৌধুরীর বংশধর বৈদূর্যমণি, হিরণ্যমণি, কৌস্তুভমণি, চূড়ামণি ওরা তো নতুন যুগের মানুষ! তবু তারাও তখন পূর্বপুরুষের বনেদীয়ানার নেশায় বুদ হয়ে পড়ে আছে অচৈতন্য হয়ে। কিন্তু পাশাপাশি এই সুবিনয়বাবুর বাড়িতেই তখন অন্য ইতিহাস রচনা চলেছে। রাজনারায়ণ বসু বক্তৃতা করলেন—’হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব’ নিয়ে। বিলেতের টাইমস পত্রিকায় সে-রিপোর্ট ছাপা হলো। রাজনারায়ণ বসু বললেন—ব্রাহ্মধর্ম হিন্দুধর্মেরই উন্নতরূপ। ব্রহ্মানন্দ বিলেত থেকে এসে ‘ভারত-আশ্রম’ করলেন। এখন যেখানে সিটি কলেজ, ওইখানে ১৩ নম্বর মির্জাপুর স্ট্রীটের বাড়িতে আশ্রম প্রতিষ্ঠা হলো। সুবিনয়বাবু গিয়ে উঠলেন একদিন ‘ভারত-আশ্রমে।
জবা আবার বললে-এবার চলুন বাবা।
—হ্যাঁ মা, যাই, কিন্তু চলে গেলে তো আর বলা হবে না, তোমার ভালো লাগছে তো সুপবিত্র?
জবা বললে—সুপবিত্রবাবুকে আজ অনেক খাটিয়েছি বাবাওঁর মা হয় তো খুব বকুনি দেবেন আমাকে।
–তাই নাকি মা? তবে তো দেরি করা উচিত নয়—কিন্তু সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের গোড়াকার গল্পটা শুনবে না আজ-মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কেমন করে…
—না বাবা, সে-গল্পটা আজ থাক—অনেক দেরি হয়ে যাবে—
–তবে চলো। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। সেকেণ্ড ক্লাশ ঘোড়ার গাড়ি।
এবার শেষ যাত্রা। সন্ধ্যে হবো হবো। সমস্ত ঘরে তালা লাগিয়ে দিলো ভূতনাথ। পুব দিকের ঘরের কাছে আসতেই জবা পেছনে এসে দাঁড়ালো। বললে—একটু দাঁড়ান ভূতনাথবাবু।
চমকে উঠেছে ভূতনাথ। এদিকটা অল্প-অল্প অন্ধকার। জিনিষপত্র খালি হয়ে যাবার পর একটুখানি গলার শব্দ সমস্ত বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে। খাঁ খাঁ করা আবহাওয়ার মধ্যে যেন দম আটকে আসে। ভূতনাথ তখন সমস্ত দিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত। হঠাৎ বলে উঠলো—কে?
জবা বললে—একটা কথা ছিল আমার।
জবার মুখখানা যেন রাগে কালো হয়ে উঠেছে। অন্ধকারে ভালো করে দেখা না গেলেও অনুমান করে নিলে ভূতনাথ—যেন ভয়ঙ্কর কিছু ঘটেছে। বললে-বলো না?
জবা বললে—আর যদি কখনও দেখা না হয় আপনার সঙ্গে, তাই বলে রাখাই ভালো।
ভূতনাথ নিজেকে সামলে নিয়ে বললে—খুব জরুরি কথা কি?
খুব জরুরি কথা না হলেও খুব দরকারী।
—সে কথা কি সকলের সামনে বলা যায় না?
-সকলের সামনে শুনতে চান তো তাও বলতে পারি–কিন্তু তাতে আপনার মর্যাদা বাড়বে না।
-তোমার কাছে আজ নতুন কথা শুনছি জবা, মর্যাদার কথা নিয়ে আর আলোচনা করতে চাই না—কিন্তু যে-কথাই হোক
