তারপর হঠাৎ মাথা তুলে জবা বললে—এক-একবার ভাবি ভূতনাথবাবু, যদি হিন্দু হয়ে জন্মাতাম ভালো হতো। বাবা-মা যার সঙ্গে বিয়ে দিতেন তাকেই স্বামী বলে গ্রহণ করতাম, এত সমস্যা থাকতো না তাতে—অন্তত নিজের ভাবনাটা ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হতে পারতাম।
ভূতনাথ এবারও কোনো উত্তর দিলে না। আর উত্তর দেবার ছিলই বা কী? সেদিন সেই ভাঁড়ার ঘরের ধুলো ময়লার মধ্যে জবা যে এমন সব কথা বলবে এ যেন কল্পনাও করা যায়নি। অথচ সে-কথা যে ভূতনাথকে লক্ষ্য করেই বলছিল এমন ভুল ধারণাও করেনি ভূতনাথ। ওগুলো জবার স্বগতোক্তি বলে ধরে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল তার। ভূতনাথ হঠাৎ বলেছিল-বেলা অনেক হলো—দেরি হচ্ছে না তো?
—দেখেছেন কাণ্ড-বলে জবা চমকে উঠেছিল। বলেছিল—ছি ছি—কোনো কাজই হলো না। শুধু গল্পই হলো—-বলে উঠে পড়লো জবা। তারপর বললে–আপনাকে খুব খাটালাম আজকে—কিছু মনে করবেন না তো…কিন্তু এ, আপনার জামা কাপড়ের কী
অবস্থা হয়েছে।
-–তা হোক—ভূতনাথ বললে—কিন্তু একটা অনুরোধ করবো, রাখবে?
–কী আবার আপনার অনুরোধ!
–রাখবে কিনা শুনি আগে, এমন কিছু অন্যায় অনুরোধ করবো না আমি।
—রাখবো, বলুন।
—তোমার জীবনে যখনি কোনো প্রয়োজন হবে, আমাকে ডেকো, তোমার কিছু উপকার আমি করতে পেলে নিজেকে ধন্য মনে করবো।
জবা হাসলো। বললে—আমার কাছ থেকে যদি কৃতজ্ঞতা পান, তবুও?
–হ্যাঁ, তবুও।
জবা বললে—কিন্তু কেন আপনার এ অদ্ভুত খেয়াল বলতে পারেন?
-খেয়াল নয়, এ আমার…
—এ আপনার কী? নেশা?
–নেশা হলে তো বাঁচতুম জবা, কারণ নেশা একদিন কাটলেও কাটতে পারে কিন্তু এ আর যাবার নয়, বলতে পারে এ-ও একরকম ব্রত।
–তাতে আপনার লাভ?
—লাভ লোকসান তো কষে দেখিনি আমি, দান-প্রতিদানের কথাও ভেবে দেখিনি, শুধু প্রাণ দিয়ে তোমার উপকার করবো প্রয়োজন হলে।
জবা যেন কী ভাবতে লাগলো। কিছুক্ষণ। তারপর বললে–কিন্তু আমি যদি কখনও ভুল করি, অন্যায় করি বা আঘাত করি আপনাকে?
—কিন্তু ভুল কি কখনও করোনি, না অন্যায়ও করোনি, না আঘাতও কখনও দাওনি আমাকে?
জবা এবার চোখ নামালো। বললে—দেখুন, এই আমার কপাল—কেউ আমাকে বুঝলো না, বুঝতে চাইলেও না কোনোদিন।
ভূতনাথ কী যেন বলতে যাচ্ছিলো। জবা হঠাৎ বললে— আপনিও শেষে আমায় ভুল বুঝলেন ভূতনাথবাবু, আট ন’ বছর পর্যন্ত যার কেটেছে পাড়াগাঁয়ে অন্য এক সমাজে, যার লেখা-পড়া শেখবার অবকাশ হলো না, বাপ-মা’র কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে গেল যাকে গুণ্ডার দল, তারপর হঠাৎ চলে এলাম আর এক সমাজে, যেখানে এসে দেখলাম মা আমাকে চিনতে পারে না, এতদিন যে-সমাজে মানুষ হয়েছি সেখানে যা ছিল গুণ এখানে এসে তা হয়ে গেল দোষ, ঘষে-মেজে যাকে আবার সভ্য মানুষ করা হলো, তার তখন আর কী বাকি আছে? আপনারা সবাই আমার মুখের কথাটা সত্যি বলে মেনে নিলেন—বাইরের খোলসটাকেই আসল রূপ বলে ধরে নিলেন—অন্যায় যদি করেই থাকি, আঘাত যদি দিয়েই থাকি কোনো দিন তো আজকে অন্তত আমায় ক্ষমা করবেন। সুপবিত্রর মতো আপনি বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গেল জবা।
ভূতনাথ চেয়ে দেখলে সুপবিত্র এসে দাঁড়িয়েছে সামনে।
জবা বললে—সব ঠিক করে এলে তো?
সুপবিত্র বললে—সব ঠিক হয়ে গিয়েছে।
—বাড়িটার ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়েছে?
সুপবিত্রর দিকে চেয়ে দেখলে ভূতনাথ। আজকে আর আলপাকার কোট নয়। বেনিয়ান পরেছে একটা। চোখের মোটা চশমার নিচে চোখ দুটো কাঁপছে। দেখেই মনে হয় যেন সারা জীবন লেখা-পড়া নিয়ে কেটেছে তার। অন্তত জবার দিকে যে-দৃষ্টি নিয়ে দেখছে, বই-এর পাতার দিকে সেই দৃষ্টি নিয়েই বুঝি দেখে সে। মনে হয় সুপবিত্রর কাছে সমস্ত মানুষ, সমস্ত পৃথিবী, সমস্ত সংসার যেন একটা বিরাট গ্রন্থ। বই-এর বাইরে যে একটা পৃথিবী আছে তা যেন সে ভাবতে পারে না। ভাবলেও তা জোর করে ভুলে থাকতে চায়। অন্তত তাতে সুখ না থাক শান্তি আছে। তাতে ঝুকি কম। তাই জবাকেও সেই দৃষ্টি নিয়েই দেখছে। জবাও যেন তার কাছে একটা বই ছাড়া আর কিছু নয়। পড়বার আগে বা পরে হাত দিয়ে যেন স্পর্শ করতেও তৃপ্তি।
জবা আবার বললে—আর গাড়ি, গাড়ির কী বন্দোবস্ত করলে?
সুপবিত্র যেন আকাশ থেকে পড়লো। বললে—যাঃ, গাড়ির কথাটা তো একেবারে ভুলে গিয়েছি। আমি এখনি যাচ্ছিবলে পেছন ফিরতে যাচ্ছিলো।
জবা বললে—যাক, আর গিয়ে কাজ নেই, রোদ্দ রে ঘুরে ঘুরে যে চেহারা হয়েছে তোমার!
সুপবিত্র তবু বললেন, আমি যেতে পারবো, আমার কিছু কষ্ট হবে না বলে সত্যিই চলে যেতে চাইছিল।
কিন্তু জবা সুপবিত্রর হাতটা ধরে ফেললে। বললে-সকাল থেকে ঘুরছে—আর যেতে হবে না। শেষে মা’র কাছে বকুনি খেতে হবে তো আমাকেই। ওপরে গিয়ে আয়নাতে মুখখানা একবার দেখো তো নিজের, কী দশা হয়েছে চেহারার। এমনি ঘুরলেই স্বাস্থ্য খুব ভালো থাকবে বটে! ভূতনাথবাবু আছেন, তোমায় আর কিছু করতে হবে না।
সত্যি এবার নিরস্ত হলে সুপবিত্র।
জবা বললে—ভূতনাথবাবু, একটা গাড়ি আনতে পারবেন?
ভূতনাথ বললে—কখন যাবে?
এই বিকেল বেলা, সেকেণ্ড ক্লাশ গাড়ি একটা, বার-শিমলে যাবে, বারো আনার বেশি যেন ভাড়া বলবেন না।
ভূতনাথ বললেবার-শিমলে যাবে তা বারো আনা কেন? আট আনা দিলেই তো যথেষ্ট।
শেষ পর্যন্ত আট আনাতেই গাড়ি ঠিক করে এনেছিল ভূতনাথ। আস্তে আস্তে সমস্ত মালপত্র পাঠানো হলো গরুর গাড়িতে। বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। একদিন এই বাড়িতেই এসে উঠেছিলেন সুবিনয়বাবু স্ত্রীর হাত ধরে। সে অনেকদিন আগের কথা। এখানে এসেই তার নতুন সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়েছে একদিন। সেই শিশুর কান্নার শব্দে এ-বাড়ি একদিন মুখরিত হয়ে উঠেছে। আবার এখানেই সে-শিশু অন্তিম নিঃশ্বাস ফেলেছে। সে-ও একদিন গিয়েছে। এখানেই জবার মা’র সুস্থ মস্তিষ্ক অপ্রকৃতিস্থ হয়ে উঠেছে তিলে তিলে শোকে দুঃখে নিঃসঙ্গতায়। একদিন এ-বাড়িতে সুবিনয়বাবু উঠিয়ে নিয়ে এসেছেন বাবার পরিত্যক্ত জিনিষপত্র। সঙ্গে করে এনেছেন জবাকে। এই বাড়িতেই জবার নতুন করে পুনর্জন্ম হয়েছে। হাতে খড়ি হয়েছে। এই বাড়িতেই কতদিন কত উৎসব, কত মাঘোৎসবের অনুষ্ঠান হয়েছে। এইখানে এসেছেন বিদ্যাসাগর মশাই, শিবনাথ শাস্ত্রী, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন। এই বাড়িতেই বঙ্কিমচন্দ্র এসেছিলেন। ১৮৬৪ সালে। যেবার কলকাতায় আশ্বিনে-ঝড় হয়েছিল খুব। দুর্গেশনন্দিনী’ সেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছে। নিজের হাতে এক খণ্ড বই উপহার দিয়ে গিয়েছেন সুবিনয়বাবুকে। এই বড় হল ঘরটায় বসেই একদিন সুবিনয়বাবু জবাকে দীক্ষা দিয়েছেন।
