বাসনের ঝোড়াটা সরাতে সরাতে ভূতনাথ শুধু বললে—আমি কি সে-কথা বলেছি?
জবা শাড়ির আঁচলটা আর একবার ভালো করে কোমরে জড়িয়ে নিয়ে বললে—মুখে হয় তো বলবেন না কিন্তু মনে মনে হয় তো রাগ করবেন—গালাগালি দেবেন।
ভূতনাথ আর সহ্য করতে পারলে না। বললে—তুমি আমার কী এমন ক্ষতি করেছে। যে—তোমাকে আমি গালাগালি দেবে। তোমার সঙ্গে কি আমার সেই সম্পর্ক?
জবা পেছন ফিরে কাজ করছিল। সেই অবস্থাতেই বললে
আপনি সব কথায় চিরকাল সম্পর্ক তুলে কথা বলেন কেন?
ভূতনাথ পিছন ফিরে যে-জবাবটা দিতে যাচ্ছিলো সেটা অনেক কষ্টে সম্বরণ করলে। তারপর আবার নিজের কাজে মন দিলে। বললে—এগুলো তো হলো—এবার আর কি কাজ আছে বলে?
জবা উঠে দাঁড়িয়ে বললে—ওই যে সিন্দুকটা দেখছেন, ওর ভেতর থেকে সব জিনিষপত্র বের করতে হবে—পারবেন একলা? যদি না পারেন তো সুপবিত্র আসুক।
সুপবিত্রর নাম শুনে ভূতনাথ কেমন যেন মরিয়া হয়ে উঠলো। বললে-দেখি, আমি একলাই পারবো।
জবা বললে-ঝি-চাকর কেউ-ই তো নেই, সব ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এখন থেকে সবই তো আমার একলা করতে হবে।
ভূতনাথ বললে—একলা যে কী করে তুমি সব করবে তাই ভাবছি।
জবা বললে-ভগবান দুটো হাত দিয়েছেন শুধু ভাত খাবার জন্যে নয়। কাজ না করলে পা-ই বলুন আর হাতই বলুন সব অকেজো হয়ে যায়।
এরপর ভূতনাথের আর কোনো উত্তর দেওয়া চলে না। ভারী লোহার সিন্দুকটা এক হাতেই খোলবার চেষ্টা করতে লাগলো। খুবই ভারী ডালাটা। তবু কে জানে কেন, যেন অসুরের মতো ক্ষমতা ফিরে এল গায়ে। তারপর দু’হাতে সমস্ত শক্তি দিয়ে চাড় দিতেই ডালাটা এক সময় খুলে গেল। কিন্তু ততক্ষণে দরদর করে ঘেমে নেয়ে উঠেছে ভূতনাথ।
জবাও কম বিস্মিত হয়নি।
জবার বিস্মিত দৃষ্টির দিকে চেয়ে ভূতনাথ হাসতে হাসতে বললে —অবাক হলে যে? আমি পাড়াগায়ের ছেলে—তা ভুলে গিয়েছে নাকি?
জবা কিছু কথা বলতে পারলে না। তখনও যেন তার বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি।
ভূতনাথ তেমনি হাসতে হাসতেই বললে-অঘ্রান মাসে তোমার বিয়েতে যদি নেমন্তন্ন হয়, তো আরো দেখবে আমরা শুধু বেশি ভাতই যে খেতে পারি তাই নয়—ইচ্ছে করলে লুচিও খেতে পারি অনেক।
জবা কিছুক্ষণের জন্য চুপ করে রইল। তারপর হাসলো। বললে নেমন্তন্ন করবার মালিক আমি নই, নেমন্তন্ন করবেন বাবা—কিন্তু শুধু পেট ভরে লুচি খেতে পাওয়াটাই বুঝি আপনার লক্ষ্য?
ভূতনাথ তখন আবার নিজের কাজে মন দিয়েছে। প্রকাণ্ড একটা ভারী জিনিষ নামাতে নামাতে বললে—এ ছাড়া আমার আর কি লক্ষ্য থাকতে পারে বলো। আমরা বরপক্ষও নই, কন্যাপক্ষও নই, আমরা শুধু ইতরপক্ষ–একটু মিষ্টান্ন পেলেই খুশি হবো।
জবা হাসলো আবার।—বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বর্ণ পরিচয় পড়েছেন তো?
—না পড়ে পার পাবার কি উপায় ছিল? শরৎ পণ্ডিতের বেত দেখোনি তো? সে যে কী কষ্ট করে লেখা-পড়া শেখা, বর্ণপরিচয় আর নামতা তো মাটিতে লিখেছি, খাতা কলম পাইনি পিঠের শিরদাঁড়া ব্যথা হয়ে যেতো—যাক, আজ মনে হচ্ছে লেখাপড়া শেখাটা একেবারে ব্যর্থ হয়নি।
–কেন?
—লেখাপড়া শিখি আর না-শিখি শরৎ পণ্ডিতের বেত শরীরটাকে মজবুত করে দিয়েছে।
জবা বললে আপনার তো ভারী অহঙ্কার।
—অহঙ্কারের কি দেখলে আমার?
—লোহার সিন্দুকটা খুলতে পেরেছেন বলে ভেবেছেন বুঝি খুব আশ্চর্য হয়ে গিয়েছি আমি?
—তোমাকে আশ্চর্য করার স্পর্ধা যদি কখনও হয়ে থাকে আমার তো ধিক আমাকে বলে ভূতনাথ আবার নিজের কাজে মন দেবার চেষ্টা করলে।
খানিক পরে জবা বললে-রাগ করলেন নাকি?
ভূতনাথ কাজ করতে করতে থামলো। বললে—আমাকে আগে কতদিন কতবার কত কী বলছো তুমি-তখনও যদি রাগ না করে থাকি—এখনও করিনি।
জবা বললে—কিন্তু আমার এমনি কপাল ভূতনাথবাবু আমাকে সবাই ভুল বোঝে!
ভূতনাথ সোজা মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলে এতক্ষণে। জবা নিজের মনেই কাজ করে চলেছে। পরিশ্রমে সারা শরীর ঘেমে উঠেছে। মাথার বেণীটা পিঠের ওপর দিয়ে মাটিতে লুটোচ্ছে। ভাড়ার ঘরের সেই স্বল্প-অন্ধকার পরিবেশে যেন আজ নতুন করে আবিষ্কার করলে জবাকে।
ভূতনাথ বললে—সবাই-ই কি ভুল বুঝেছে তোমাকে?
—সবাই।
ভূতনাথ একটু দ্বিধা কাটিয়ে বললে—একজনও কি বাদ পড়ে না?
–একজনও না।
ভূতনাথ বললে—সকলের খবর রাখি না, নিজের কথা বলতে পারি এই যে…না, নিজের কথা আজ থাক—কিন্তু সুপবিত্রবাবু?
জবা বললে—সুপবিত্র? সুপবিত্র নিজেকেই বুঝতে পারে না তা বুঝবে আমাকে! আপনি এমন মানুষ দেখেছেন ভূতনাথবাবু, দিনের মধ্যে দশবার ওর চশমার খাপ হারিয়ে যায়, ভাত খেতে ভুলে যায় এক-একদিন এমনি পাগল। ওর মা এখনও ঘুম পাড়িয়ে দেয় ওকে বিশ্বাস করতে পারেন—ও যে কেমন করে বিয়ে করে সংসার করবে কে জানে—আমার তো সত্যি এক-একসময়ে ভারী ভয় হয়।
ভূতনাথ কী উত্তর দেবে ভেবে পেলে না। শেষে বললেকাজের লোকরা হয় তো ভালো করে সংসার করতে পারে—কিন্তু ভালো স্বামী হওয়া তো অন্য জিনিষ।
জবা বললে—কিন্তু সুপবিত্র বড় ছেলেমানুষ, এখনও ওর নিজের ইচ্ছে বলে কিছুই নেই—ও যে কী করে এম-এ. পাশ করলো, কে জানে! আমি যখন বললাম ওকে—চাকরি খোঁজো একটা চাকরি না করলে কী করবে? তখন ও চাকরির চেষ্টা করতে লাগলো—অথচ বিয়ের আগে যে সে-দিকটা ভাবতে হয় সেজ্ঞানও নেই। জানেও না যে বিয়ে মানে দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া,—অথচ আর মাত্র এক মাস বাকি।
ভূতনাথ চুপ করে রইল।
জবা বললে—কিন্তু প্রশংসা করতে হয় ওর একনিষ্ঠতার। আমাদের সমাজের আরো অনেক ছেলের সঙ্গেই তো মিশেছি, কেউ চেয়েছে আমার টাকা, কেউ চেয়েছে রূপ, কেউ কেউ বেশ সংসারী, জন্মদিনে উপহার দিয়েছে দামী দামী, কিন্তু সুপবিত্র গরীব, তবু কত কী বলেছি কতদিন, কতদিন রাগ করেছি ওর ওপর, জানেন বাড়িতে ঢুকতে দিইনি কতবার, ও যতবার যা বলেছে, তার উল্টো করেছি আমি, সব বন্ধুবান্ধবের মধ্যে ওকে অপদস্থ করেছি আমি, কিন্তু তবু দেখেছি কিছু বলেনি। এক-একদিন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুধু চুপ করে চেয়ে থেকেছে আমাদের বাড়িটার দিকে। খানিক থেমে জবা আবার বললে—কী জানি এক-একবার মনে হয় ভুল করছি না তো-বাবাকে জিজ্ঞেস করেছি—বাবা মত দিয়েছেন। বাবারও সুপবিত্ৰকেই পছন্দ—কিন্তু তবু ভয় করে এক-একবার।
