ভূতনাথ বললেন, ঠিক কথাই বলেছেন আপনি।
—আমিও তাই বলি, অর্থ টা অনেক সময়েই অনর্থের সৃষ্টি করে, আবার আমাদের সাংসারিক জীবনে অর্থের প্রয়োজনও অস্বীকার করবার নয়। আমার বাবা বলতেন-টাকা পয়সা হাতের ময়লাতাই বাবার মতো পুণ্যাত্মা মানুষ আজীবন শান্তিতে কাটিয়েছেন— কিন্তু আমি পারিনি ভূতনাথবাবু, প্রথম যৌবনে অর্থের নেশায় মেতেছিলাম, সঞ্চয়ের নেশায় ড়ুবেছিলাম, তাই আজ আমি রিক্ত, সমস্ত অর্থ থেকেও আমি রিক্ত—কিন্তু আজ সমস্ত ত্যাগ করে, সর্বস্ব দান করে আমি আবার আমার যথার্থ বিত্ত ফিরে পেলাম, এতদিন ধর্মচ্যুত ছিলাম এখন আবার স্বধর্মে আশ্রয় পেয়েছি—কী বলল ভূতনাথবাবু, ভুল করেছি আমি?
–না, ঠিকই করেছেন আপনি—ভূতনাথ বললে।
–এই দেখো না, আজ আমি এ-বাড়ি ত্যাগ করছি, হাসপাতাল হবে এখানে, জবা-মা’র বোধহয় মনে মনে একটু দ্বিধা ছিল, কিন্তু যখন বুঝিয়ে দিলুম মাকে, যে এ ত্যাগ নয় মা, এ ভোগ, বিশ্বের সকলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে একযোগে কাজ করা, উপনিষদের ঋষি বলেছেন, “তেন ত্যক্তেন ভূঞ্জিথা’—বললুম যে, এ-আমার শুধু অনুভূতি নয় উপলব্ধি, এ আমার শুধু প্রিয়ই নয়—শ্রেয়ও জবা-মা বুঝলো। বললে—বাবা তুমি কখনও অন্যায় করতে পারো না তারপর খানিক থেমে সুবিনয়বাবু আবার বলতে লাগলেন— তারপর আমি জিজ্ঞেস করলাম——সুপবিত্রকে তুমি সমস্ত কথা খুলে বলেছো মা? বলেছো তত যে, সে তোমাকে গ্রহণ করলে তোমাকেই শুধু পাবে–‘মোহিনী-সিঁদুরে’র অর্থের ওপর তার বা তোমার বা আমার কোনোই অধিকার নেই—বলেছে মা এ-কথা? জবা-মা বললে—বলেছি বাবা।
—শুনে বড় শান্তি পেলাম ভূতনাথবাবু, তবু বললাম—তুমি যদি অনুমতি দাও মা তবে আমিও তাকে সব বিশদ করে বলতে পারি।—জবা-মা বললে—অনুমতির কথা কেন বলছেন, আপনি বা ভালো বুঝবেন তাই করবেন বাবা। বললাম—তোমার তো মা নেই মা, আমিও বৃদ্ধ হয়েছি—তোমার মায়ের কর্তব্যটুকুও আমাকে করতে দিও মা। তোমার মা-ই মৃত্যুর শেষ দিনে আমাকে বলে গিয়েছিলেন, তোমাকে মুক্তি দিতে—তোমার মায়ের ইচ্ছে আর আমারও ইচ্ছে তুমি মুক্তি পাও—সবরকমের মুক্তি, মিথ্যা থেকে গ্লানি থেকে, সমস্ত বন্ধন থেকে মুক্তি। ঐশ্বর্যের প্রাচুর্যও তো একটা বন্ধন—কী বলো ভূতনাথবাবু, তোমার কি মত? সুবিনয়বাবু কথা বলতে পেলে আর কিছু চান না।
ভূতনাথ বললে—আজকেই কি এ-বাড়ি ছেড়ে দিচ্ছেন?
—হ্যাঁ, ভূতনাথবাবু, আজই—যত শীঘ্র মুক্ত হওয়া যায় ততোই তো ভালো। বাবার মৃত্যুর পর আমি এই ‘মোহিনী-সিঁদুরের ব্যবসা শুরু করেছিলাম, তার আগে তুমি তো জানো আমি আইন ব্যবসা করতাম। সামান্য আয় হতো সে-কাজে, তবু সেই আয়টুকু রেখে আর সমস্ত আমি ত্যাগ করেছি। এ-বাড়ির ওপর আমার তো কোনো অধিকার নেই। সুবিনয়বাবু আবার বললেন–অন্যায় যা আমি করেছি, তার জন্যে অনেক অনুতাপও করেছি ভূতনাথবাবু, দুঃখ কষ্টও কম পাইনি। ভাবতে পারো, একদিন বাড়ি এসে শুনলাম, আমার একমাত্র সন্তানকে কার হরণ করে নিয়ে গিয়েছে, গেলাম পুলিশের কাছে, কত অনুসন্ধান করলাম—সেদিন স্বামীস্ত্রীতে আমরা সারা রাত ঘুমুতে পারিনি—তা সেই কথাই বললাম সেদিন সুপবিত্রকে। বললাম তুমি একাধারে জবার পিতা, মাতা, স্বামীর কর্তব্য করবে, জবা তার মায়ের স্নেহ পায়নি, আর আমার আয়ু তো ফুরিয়েই এসেছে।
—সুপবিত্র আমার পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে বললে—আমাকে আশীর্বাদ করুন যেন সে-কর্তব্যে কোনোদিন অবহেলা না করি। সুপবিত্রর বাবা ছিলেন আমার ঘনিষ্ট বন্ধু। সুপবিত্রকে আমি তার জন্ম থেকে জানি, সুপবিত্রর হাতে জবাকে তুলে দিয়ে আমিও নিশ্চিত হয়ে যেতে পারবে—তা তোমাকে সংবাদ দেবো ভূতনাথবাবু— আসছে অঘ্রানেই সমস্ত ব্যবস্থা হবে—তা ততদিনে আমি উঠে হেঁটে বেড়াতে পারবো।
হঠাৎ জবা ঘরে ঢুকলো। বললে—বাবা আপনি আবার কথা বলছেন! আসুন ভূতনাথবাবু—কেবল গল্প আপনার-আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে। এসেছেন যখন এ-বাড়িতে একটু খাটিয়ে নেবে। তারপর বাবার দিকে চেয়ে বললে—সেই পুরোনো কথা সব বলছিলেন বুঝি।
—বলছিলাম মা, তোমার কথাই ভূতনাথবাবুকে বলছিলাম, এখন থেকে তোমার নিজের হাতে সব কাজ করতে হবে। কাজ করা তো তোমার অভ্যেস নেই মা।
—কেন বাবা, ঠাকুর চলে যাবার পর সেবার রাঁধিনি আমি?
—আমি কি তাই বলেছি মা।
-থাক বাবা, এখন ও-সব কথা থাক—কত কাজ পড়ে রয়েছে জানেন। ভূতনাথবাবুকে আমি নিয়ে যাচ্ছি—আপনি একটু ঘুমোবার চেষ্টা করুন তো। আসুন—বলে জবা আগে আগে চলতে লাগলো। ভূতনাথ দেখলে জবার সারা গায়ে ধুলো ময়লা লেগেছে। একেবারে ভাঁড়ার ঘরে গিয়ে থামলে জবা। বললে কী দেখছেন অমন করে?
ভূতনাথ চোখ সরিয়ে নিলে।
জবা খিলখিল করে হাসতে লাগলো। বললে-অমন করে তাকাতে লজ্জা করে না।
ভাঁড়ার ঘরটা বেশ অন্ধকার। এক রাশ কাঁসা আর পিতলের বাসন নামানো রয়েছে একদিকে। অন্যান্য জিনিষও অগোছালো
পড়ে আছে এদিক-ওদিক।
প্রসঙ্গটি এড়াবার জন্যে ভূতনাথ সেইদিকে চেয়ে বললে— এগুলো কি যাবে তোমাদের সঙ্গে?
জবা বললে—এই ঝুড়িটার ভেতরে একে একে সব ভরে দিন দেখি।
ভূতনাথ কামিজের হাতাটা গুটিয়ে কাজে লাগতে যাচ্ছিলো।
জবা বললে—ভাববেন না, আপনাকেই শুধু খাটাচ্ছি, সুপবিত্রকেও কাজে পাঠিয়েছি আমি। এই রোদে বাজারে গিয়েছে সে-সকাল থেকে ঘুরছে—একটু বসতে দিইনি। আর আপনিই শুধু আরাম করে বসে থাকবেন তাই কি হয়!
