ভূতনাথের মনে পড়ে আরও একজনের কথা। সেদিন ১৯০০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। খুব কনকনে শীত পড়েছে। ব্ৰজরাখাল এল সেই রাত্রে। গায়ে কিছু নেই। শুধু একটা চাদর।
ভূতনাথ তখন শোবার আয়োজন করছে। ব্রজরাখালকে দেখে বললে—এ কি ব্রজরাখাল-খালি গা যে?
ব্ৰজরাখাল তখন গুন গুন করে গান গাইছে–
আর তো ব্ৰজে যাবো না ভাই,
যেতে প্রাণ আর নাহি চায়,
ব্রজের খেলা ফুরিয়ে গেছে,
তাই এসেছি মথুরায়—
থেমে ব্ৰজরাখাল বললে—গান গাইলে আর শীত করে না। খুব যখন শীত করবে বড়কুটুম—গান গেয়ে দেখোশীত পালিয়ে যাবে।
—তা জামা কোথায় ফেলে রেখে এলে ব্ৰজরাখাল?
ব্ৰজরাখাল ঢাকা ভাত খুলে তখন খেতে বসেছে। খেতে খেতে বললে—ফুলদাসী মারা গেল আজ।
ভূতনাথও চমকে উঠলো। মুখ দিয়ে কথা বেরোলো না।
ব্রজরাখাল বললেওই ফুলদাসীকে কত কষ্টে বাঁচানো হয়েছে পাদ্রিদের হাত থেকে, পাদ্রিরা নিয়ে গিয়ে প্রায় খ্রীস্টান করে ফেলেছিল। শিবনাথ শাস্ত্রী খবর পেয়ে উদ্ধার করে আনেন-আর আজ কিনা..বলতে বলতে চুপ করলো ব্রজরাখাল। খুব তাড়াতাড়ি ভাত খেতে লাগলো। খাওয়া নয় গেলা। খাওয়াটা কোনো দিন ধীরে সুস্থে হলো না ব্ৰজরাখালের।
—আর দুটি ভাত দেবো ব্রজরাখাল? রয়েছে অনেক।
—দেখো মজাটা, কলেরা থেকে বাঁচালাম, প্লেগের হাত থেকে বাঁচালাম, গুণ্ডার হাত থেকেও একবার বাঁচিয়েছি, কিন্তু যে যাবার তাকে বাঁচাবে কে? দাও বড়কুটুম, ভাতই দাও, আরও দুটো গিলে নিই।
ব্ৰজরাখাল এমন কখনও ভাত চেয়ে খায় না। আজ যেন ওর কী হয়েছে।
খেতে খেতে বললে—এমনভাবে মরবে জানতেই পারিনি বড়কুটুম!
ভূতনাথ বললে—শ্মশানে গিয়েছিলে বুঝি?
—হ্যাঁ, তাই তো জামা-কাপড় সব ডোমদের দিয়ে এলুম, কাপড়টা শুধু ভিজিয়েছিলুম গঙ্গার জলে—তাও এখন গায়ে লেগে লেগে শুকিয়ে গেল।
—কী অসুখ হয়েছিল?
—অসুখ বিসুখ কিছু নয়, ভালোই তো ছিল, বাড়ি ভাড়াটা চাঁদা করে দেওয়া হচ্ছিলো, আর খাওয়া খরচটা দিতাম আমি, কিন্তু সইলো না ওর, খ্রীস্টান হবার পর তো আত্মীয়-স্বজন কেউ নিতে। না। শিবনাথ শাস্ত্রী মশাইও অনেকদিন পর্যন্ত যোগাতেন সব।
—না খেতে পেয়েই মরলে বুঝি শেষে?
—না, তাও নয়, খেয়েই মরলো।
–কী খেয়ে?
—বিষ! খানিকক্ষণ চুপ করে রইল ব্রজরাখাল। তারপর বললে—পুলিশ থেকে লাশ ছাড়তে চায় না, পেটের মধ্যে ছেলে পাওয়া গিয়েছিল কিনা! কিন্তু আমি বলি বড়কুটুম ও মরতে গেল কেন? মরে কি ও বাঁচতে পেরেছে? খাওয়া থামিয়ে ব্রজরাখাল উঠলো।
—এ কি, আর খেলে না?
—না বড়কুটুম, জ্ঞানযোগের ওপর আমার বিশ্বাস চলে গেল আজ থেকে, দেখো গিরীশবাবু ঠিক বলতেন-নরেন কেবল বলে— জ্ঞানযোগ কর্মযোগ। গিরীশবাবু, গিরীশ ঘোষকে চেনো তে— ‘চৈতন্যলীলা’ লিখেছেন, তিনি একদিন বললেন নরেনকে—জ্ঞানযোগ জ্ঞানযোগ করো, সংসারের সব দুঃখ তুমি জ্ঞানযোগ দিয়ে দূর করতে পারবে? জ্ঞানযোগ কর্মযোগের একটা সীমা আছে, একটা জায়গায় গিয়ে আর তুমি এগোতে পারবে না—কিন্তু ভক্তি ‘বিশ্বাসে মিলয়ে ভক্তি তর্কে বহুদূর’—আজ কেবল সকাল থেকে কথাটা আমার মাথায় ঘুরছে। শ্মশানে গিয়ে দাঁড়িয়ে ফুলদাসীর মুখখানার দিকে চেয়ে তাই ভাবছিলাম। কই, এইসব হতভাগিনীদের তো আমরা বাঁচাতে পারিনি তর্কশাস্ত্র কি মীমাংসা শাস্ত্র দিয়ে তো এদের দুঃখ ঘুচবে না। কী জানি বড়কুটুম, প্লেগের সময় দিন রাত চোখের সামনে অনেক মৃত্যু দেখেছি, মা, বাপ, ছেলে, এক বছরের কোলের মেয়ে সকলকে এক বাড়িতে এক ঘরে এক শয্যায় মরতে দেখেছি তবু মন আমার এতটা টলেনি!
আর ঠিক এই ঘটনার ক’দিন পরেই ব্ৰজরাখাল কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। আজ এতদিন পরে সুবিনয়বাবুর ঘরে দাঁড়িয়ে ব্রজরাখালের কথাটা মনে পড়ার একটা কারণ আছে। সুবিনয়বাবুর দিকে চেয়ে বোঝা যায়—এ-মানুষটির অন্তরে কোথায় যেন একটা বজ্রকঠোর ব্যক্তিত্ব লুকিয়ে আছে। অথচ সামনে সব সময় সদা-হাসি মুখ। সদাপ্রসন্ন, সদাসুখী। একদিন এবাড়িতেই ঐশ্বর্যের আড়ম্বরের মধ্যেও যেমন দেখেছে তাঁকে, আজ রোগকাতর ঐশ্বর্যরিক্ত অসহায় অবস্থাতেও যেন তার কোনো বৈলক্ষণ্য নেই। তেমনি প্রশান্ত দৃষ্টি, অবিচলিত নিষ্ঠা।
সমস্ত বাড়িটা ব্যস্ত-চঞ্চল, কর্মমুখর। যেখানকার যে-জিনিষ, আজ সেখানে তা নেই। রাজা-রাণীর ছবি দুটো নামানো হয়েছে মেঝের ওপর।
সুবিনয়বাবু চিত হয়ে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে শুয়েছিলেন। পাশ ফিরে বললেন—অনেকদিন দেখিনি তোমাকে চাকরির কিছু
সুবিধে হলো তোমার?
ভূতনাথ বললে—কই, কিছুই তো হলো না।
–আমি কয়েকখানা চিঠি লিখেছি কয়েকজনকে তোমার জন্যে, জবাবও পেয়েছি অনেক জায়গা থেকে, আমি একটু সেরে উঠলে নিজে একবার চেষ্টা করবো। ব্ৰজরাখালবাবুর খবর কী ভূতনাথবাবু, কিছু খবর পেয়েছে? তারপর খানিকক্ষণ আবার চুপচাপ। বললেন—বড় খুশি হলাম তোমাকে দেখে। জবার বিয়েতে তোমার কিন্তু আসা চাই-ই ভূতনাথবাবু, আসছে অঘ্রান মাসেই ঠিক করেছি।
ভূতনাথ চারদিকে চেয়ে একবার দেখে নিলে তারপর বললে— কিন্তু বিয়েটার এত দেরি হচ্ছে কেন?
–খানিকটা ওদের ইচ্ছে আর তাছাড়া আমার এ অসুখটা না হলে ওটা তো আগেই হয়ে যেতো—কিন্তু এবার আমি বলেছি ভূতনাথবাবু, তোমাদের দুজনের যখন অনুরাগ হয়েছে আর মিলনে যখন কোনো বাধা নেই, উভয়ে উভয়কে ভালো করে চিনেছে, পরস্পরকে তোমরা গ্রহণ করছে মনে মনে, তখন বুঝতে হবে ঈশ্বরেরও তাই অভিপ্রায়। কী বলল ভূতনাথবাবু, অন্যায় কিছু বলেছি আমি?
