রামহরি বললেন—এই বিশটে টাকা নে।
বিশ টাকা! কালো তেল-চকচকে নধর চেহারাগুলো যেন কিলবিল করে উঠলো। বিশ টাকা পেলে যা কিছু করা যায়। মানুষও খুন করা যায়। বিনা কারণে কত মানুষ খুন করেছে তারা। মন্বন্তরের সময় সব কিছু করতে হয়েছে তাদের পূর্বপুরুষদের। নিরীহ মানুষকে মাত্র একখানা গামছার লোভে খুন করতে পেছ-পা হয়নি তারা!
রামহরি বললেন—খুনখারাপি নয়—চুরি করতে হবে।
—রাজী। কার কী চুরি, বলুন।
তারপর শেষ রাত্রের দিকে চুপি-চুপি এসে রামহরি আবার নিজের বিছানায় শুয়ে পড়েছেন।
কিন্তু ব্রাহ্মণী টের পেয়ে গিয়েছে। বললে—কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
কথা বললেন না রামহরি।
কিন্তু দু’দিন পরে ভোর রাত্রে দরজায় টোকা পড়লো। রামহরি উঠে দরজা খুলে দিতেই একটি দু’ মাসের মেয়ে তার কোলে দিলে তারা। তারপর নিঃশব্দে আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন রামহরি ভট্টাচার্য।
ব্রাহ্মণী সকালবেলা কান্নার শব্দে জেগে উঠেছেন। বললেন— এ কে?
রামহরি বললেন-গুপীর মেয়ে।
—একে এখানে কে আনলো!
রামহরি বললেন—চুপ! ছেলে আমার মরে গিয়েছে জানি, কিন্তু আমার নাতনির আমি জাত খোয়াতে দেবো না।
—তুমি ওই দু’ মাসের মেয়েকে বাঁচাবে কী করে?
–মা আমার সহায়, আমি একে এখানে রাখবো, আমি এর ভরণপোষণ করবে—বিয়ে দেবো-ওর নাম দেবো আমি জবা— আমার মায়ের ফুলের নাম।
ব্রাহ্মণী কেঁদে ফেললেন।-তুমি কী পাগল হয়েছে গো?
ব্রাহ্মণী গোপনে পত্র দিয়ে দিলেন কলকাতায় ছেলের কাছে। গুপীকে আসতে বারণ করে দিলেন। এলেই কর্তা আর আস্ত রাখবেন না। কর্তা বলেছেন–যে ছেলে বেহ্ম হয়েছে, আমার বংশের নাম ড়ুবিয়েছে, তার আমি সর্বনাশ করে ছাড়বো। আরও জানালেন—মেয়ে ভালো আছে।
গুপী আসে। গ্রামের এক প্রান্তে এসে দাঁড়ায়। খবর নিয়ে যায়। একবার দেখতে ইচ্ছে হয় সন্তানকে। জামাকাপড় পাঠিয়ে দেয় লোক মারফৎ। পয়সা কড়িও।
রামহরির সন্দেহ হয় মাঝে মাঝে।-এত দুধ আসছে কোত্থেকে শুনি? পয়সা তো ছিল না বাক্সতে?
তারপর সেই মেয়ে বড় হলো। সুন্দরী হলো। এমনি করে দিন। কাটলো, বছর কাটলো।
একদিন চিঠি লিখলে গুপীর স্ত্রী। গুপীর ভারী অসুখ। বাবা যদি দেখতে চান তো যেন শেষ দেখা দেখে যান। আর বেশি দিন বাকি নেই। ছেলে মৃত্যুশয্যায়।
ব্রাহ্মণী বললে—তুমি পাথর হতে পারে কিন্তু আমার মায়ের প্রাণ, আমি যাবোই।
—যাবে কী করে?
—যেমন করে পারি যাবে, পায়ে হেঁটে যাবো, ছেলে যার মরে। মরে, সে কি না গিয়ে থাকতে পারে?
রামহরি চাদরটা কাঁধে নিলেন। ব্রাহ্মণীর দু’গাছা তাগা ভোলা স্যাকরার কাছে বাঁধা রেখে নগদ পঞ্চাশটি টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। পেছনে পেছনে ঘোমটা দিয়ে চললে ব্রাহ্মণী।
সুবিনয়বাবু বলতেন—তখন আমার খুব অসুখ, বুঝলে ভূতনাথবাবু, জবার মা পাশে বসে আছে—হঠাৎ চোখ মেলে দেখি আমার মা—কতকাল পরে দেখা, কিন্তু মা’কে চিনতে কি ছেলের কষ্ট হয় বললাম—মা—
মা সেই যে আমার বিছানার পাশে বসলেন, সাতদিন আর উঠলেন না। বললাম—বাবা আসেন নি মা?
মা বললেন—তিনি বসে আছেন রাস্তার মোড়ে, ডাক্তারবাবুকে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি সেখানেই বসে আছেন, এলেন না এখানে।
কী অদ্ভুত ছিল বাবার রাগ! তাঁর ভালোবাসাও যেমন, রাগও তেমনি। তার রাগ ভালোবাসারই নামান্তর। তেমন করে যে রাগতে পারে, সে-ই যথার্থ ভালোবাসতে পারে, উপনিষদের ঋষি বলছেন…
সুবিনয়বাবু মাঝে মাঝে বলতেন—জবার যখন ন’ বছর বয়েস তখন ও আমার কাছে এল, বাবার মৃত্যুর পর। নতুন করে ওকে শিখিয়ে পড়িয়ে নিলুম। বলরামপুরে থেকে তখন ও তো লেখাপড়া কিছু শেখেনি, কিন্তু জবার ভাই তখন মারা গিয়েছে। জবা যখন এল এ-বাড়িতে, জবার মা’র তখন শোক পেয়ে পেয়ে প্রায় শেষ অবস্থা-মেয়েকে চিনতে পারলে না সে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করেছিল—তারপর আপনি আর দেশে যাননি?
–গিয়েছিলাম ভূতনাথবাবু, শেষকৃত্য আমি আর কোন্ অধিকারে করবো, আমার সে অধিকার নেই আর, কিন্তু তবু গিয়েছিলাম। আমার জন্মভূমি, ছোটবেলায় কত বছর কাটিয়েছি ওখানে, কতদিন প্রাণ কাদতো ওখানে যাবার জন্যে—কিন্তু বাবার শপথের কথা ভেবে যাইনি—কিন্তু গিয়ে নিজের বাড়িতে ঢুকে চোখের জল আটকাতে পারিনি—খানিক থামেন সুবিনয়বাবু। তারপর দাড়িতে হাত বুলোতে বুলাতে বলতেন-তখন আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছে। ফাঁকা বাড়ি—হা হা করছে সমস্ত ঘরগুলো—একা একা ঘরময় ঘুরে বেড়াতে লাগলাম সমস্ত দিন। মনে হলো যেন বাবার সেই স্তোত্রপাঠ শুনতে পাচ্ছি নির্জন ঘরের মধ্যে—ত্বমেকং বিশ্বরূপম্ জগৎকারণম্—ত্বমেকম্ সাক্ষীরূপ জগৎকারণম্—
তারপর ভোরবেলা একটা গরুর গাড়ি ডেকে সব জিনিষপত্র তুললুম। বাবার স্মৃতিমাখানো যত জিনিষ ছিল সব সঙ্গে নিলাম। একটা পুরোনো কাঠের বাক্সে–ওই দেখো না ভূতনাথবাবু, ওরই ভেতর বাবার যত কাগজপত্র, হিসেব, দলিল, চিঠির ভূপ, তার হাতের লেখা ছিল খুব সুন্দর—সব সঙ্গে করে এনেছি।
ভূতনাথ দেখেছে—সুবিনয়বাবুর শোবার ঘরে আজো সেই কাঠের বাক্সটা রাখা আছে।
—দুঃখ এই, বাবার একটা ছবি পর্যন্ত নেই যে, তাঁর দিকে চেয়ে থাকি দু’দণ্ড। মাঝে মাঝে বড় দেখতে ইচ্ছে হয় তাকে। একদিক থেকে আমার কাছে আদর্শ কে জানো ভূতনাথবাবু?
—কে?
—দুজন, এক ব্ৰহ্মানন্দ কেশব সেন আর আমার বাবা-অমন জ্বলন্ত নিষ্ঠা এ-যুগে আর কারো দেখতে পাই না এক ব্ৰহ্মানন্দ ছাড়া। আবার খানিক থেমে বলেন—ভাবে তো ভূতনাথবাবু, ব্ৰহ্মানন্দ যেদিন ছোটবেলায় পরীক্ষার হ-এ খাতা দেখে নকল করছিলেন বলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো—তারপর তার সেই নিষ্ঠা, লেখাপড়া, শাস্ত্রচর্চা সব বিষয়ে সে এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আর একদিন, যেদিন ব্ৰহ্মানন্দকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো ধর্মান্তর গ্রহণ করেছিলেন বলে—তিনি সস্ত্রীক গিয়ে আশ্রয় নিলেন মহর্ষি দেবেন ঠাকুরের কাছে। ভাবতে পারে! তোমাদের ইয়ংম্যানদের মধ্যে এতখানি নিষ্ঠা ক’জনের আছে—ক’জন নারীর আছে?
