—তখন কলকাতায় পাঠিয়ে দেবার নাম করলেই ভারী ভয় হতো আমার।
ভূতনাথ বলেছিল–কেন, ভয় হতো কেন?
—কী জানি, বয়েস তত বেশি ছিল না। শুনতুম সবাই বলতে বাবা-মা নাকি স্নেচ্ছে হয়ে গিয়েছে, বাবার কাছে গেলে জাত যাবে, তখন জাত মানে কি তা বুঝতুম না কিন্তু মনে হতো জাত যাওয়াটা একটা খুব ভীষণ ব্যাপার—বলে জবা হেসে উঠলো। তারপর আবার বললে—এখনও বলরামপুরের কথা মনে পড়লে কিন্তু খুব ভালো লাগে।
ভূতনাথ বললে-কতদিন পর্যন্ত কেটেছে তোমার সেখানে?
-এই আট ন’ বছর বয়েস পর্যন্ত তো ঠাকুর্দার কাছেই কাটিয়েছি। বাবা-মাকে চোখেও কখনও দেখিনি—বাবা চিঠি লিখতেন ঠাকুমাকে। ঠাকুমা আবার সেই চিঠি নিয়ে পড়িয়ে আসতে পাড়ার লোকের কাছে। ঠাকুর্দা জানতে পারলে তো একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠবেন।
ঠাকুমা বলতেন—এই দ্যাখ তোর বাবা তোর কথা লিখেছে। যাবি তো তোর বাপের কাছে?
বলতাম—না, যাবে না, আমার যদি জাত যায়? তা আমি জন্মেছিলাম কিন্তু কলকাতায়—আশ্চর্য।
—এই বাড়িতে?
—না, তখন আমাদের বাড়ি ছিল বার-শিমলেয়। বাবা এ-বাড়ি নতুন করেছেন, আমার ভাই হবার পর কিন্তু আমি শুনেছি জন্মের দু’ মাস পরেই ঠাকুর্দা আমায় চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন বলরামপুরে।
–চুরি করে?
জবা একদিন বলেছিল সে গল্প। জবা বলে—আমি কি তা দেখেছি নাকি? আমি যা শুনেছি বাবার কাছে আর ঠাকুমার কাছে, তা-ই জানি।
সে অনেককাল আগেকার কথা। সুবিনয়বাবুর বাবা রামহরি ভট্টাচার্য একবার গুণ্ডা লাগিয়েছিলেন। বিশ টাকা খরচও করেছিলেন। বলেছিলেন–গুপীকে গাঁয়ে দেখতে পেলে খুন করবি তোরা, যে ছেলে জাত খুইয়েছে সে আমার ছেলেই নয় জানবি। ওর মুখদর্শন করবো না আমি প্রতিজ্ঞা করছি।
বলরামপুর থেকে কলকাতা হাঁটাপথে দেড়দিনের পথ। রামহরি ভট্টাচার্য বারোয়ারিতলার বটগাছের তলায় মাচার ওপর বসে থাকতেন সন্ধ্যেবেলা। গ্রীষ্মকালের দুপুরে ভিজে গামছা মাথায় দিয়ে বাড়ি থেকে বেরুতেন খেয়ে দেয়ে। তারপর একবার রথতলায় গিয়ে বসতেন দাবার আডড়ায়। সেখানে খানিকক্ষণ খেলা দেখে উঠতেন। তারপর যেতেন বিলের ধারে কলমি শাকের চেষ্টায়। মল্লিকদের বাগানে কাঁঠাল পাকার খবর পেয়ে যেতেন সেখানে। বলতেন—গাছে তোমাদের কাঁঠাল পাকলো আর বামুনকে দিলে না যে। তারপর সন্ধ্যেবেলা এসে বসতেন নারাণ ময়রার দোকানের সামনে মাচায়। বলতেন—দাও তত নারাণ বামুনের ঘটিতে একটু জল।
নারাণ ময়রা চিনির বাতাস করতো। পালা-পার্বণে ছানার সন্দেশ করতো। আর করতে গজা। এমন গজা যে বুট জুতো দিয়ে মাড়ালেও ভাঙবে না। সেই গজা চৈত্র সংক্রান্তির সময় দোকানে উঠতো। তারপর যে-ক’টা বিক্রি না হতো তা আবার রসে ফেলে নিয়ে টাটকা করে বেচতে আষাঢ় মাসে রথের দিন। তাতেও যদি বিক্রি না হতো তো ভাদ্রমাসের তালনবমীতে আবার সাজিয়ে রাখতে থালায়। আর তারপরেও যে-গুলো পড়ে থাকতে সেগুলো বিক্রি হয়ে যেতে দুর্গাপূজোর বিজয়াদশমীর দিন। কিন্তু নারাণ ময়রার সব চেয়ে বেশি নাম ছিল চিনির বাসায়। এমন হাল্কা, জলে ফেলে দিলে ভাসতো।
তা রামহরি ভট্টাচার্য বললেন—শুধু জল দিলি নারাণ, কেমন বাতাসা করলি দেখি?
বাড়িতে এক-একদিন আনতেন। বাড়িতে ঢুকেই জবাকে ডাকতেন—কই রে?
একটিমাত্র বাতাস। কিম্বা এক টুকরো পূজোর প্রসাদ। কলা কি বাতাবী নেবুর টুকরো। হয় তো চারখানা লুচি একটু মোহনভোগ, সঙ্গে গোটাকয় বোঁদের টুকরো। দিয়ে বলতেনখা, ফেলিসনে যেন মাটিতে—পেসাদ।
জবা বলে—আমার খুব ভালো লাগতো ঠাকুর্দাকে। সেই পাড়া গাঁ, সেই মল্লিকদের আমবাগান, সেই বোসেদের রথতলা
—সে আনন্দ ছেড়ে কলকাতায় আসতে ভালো লাগতো না। তখন মোটে।
রামহরি ভট্টাচার্য শেষের দিকে চোখে ভালো দেখতে পেতেন না। কিন্তু তবু ভাবলেই সে-দৃশ্য ভেসে ওঠে চোখের সামনে। সংস্কৃত পুথি নিয়ে রাত্রিবেলা রেড়ির তেলের আলোয় বসে শব্দ করে শ্লোক পড়ে যাচ্ছেন। ইচ্ছে করলে তিনি কি আর বড়লোক হতে পারতেন না!!
শুক্রবার ছিল ‘মোহিমী-সিঁদুর’ দেবার দিন। কত দূর দূর থেকে যে লোক আসতো ওই সিঁদুর নিতে।
—তোমার কী হয়েছে মা?
একটি করে পয়সা দক্ষিণা! মাত্র একটি পয়সা। তা-ও আবার সময় সময় দুটো আধলা জড়িয়ে একটা পয়সা হতো। গ্রামের লোকগুলো ছিল আরো গরীব। শাক কলা মূলল আম কাঁঠাল খেতে পেতে বটে। কিন্তু পয়সা দিতে গেলে যেন মাথায় বজ্রাঘাত হতো তাদের।
—এই আমার মেয়ে ঠাকুর মশাই, জামাই একে নেয় না। একে আপনার সিঁদুর পরিয়ে দিন।
এমনি সব অসংখ্য আবেদন। অসংখ্য দুঃখ-দুর্দশার কাহিনী। শুনতে শুনতে অত যে শক্ত মানুষ, তারও চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে জল ঝরতো।
এক একদিন রাত্রে জবার ঘুম ভেঙে গিয়েছে। জেগে দেখে ঠাকুর্দা পাশে নেই। পাশেই ঠাকুর ঘর। অন্ধকার রাত। অমাবস্যার অন্ধকারে চারিদিক ঘুরঘুট্টি। মনে হলো ঠাকুরঘর থেকে যেন ঠাকুর্দার গলার আওয়াজ আসছে। স্তব পড়ছেন তিনি। কেমন ভয় ভয় করতে সে শব্দ শুনে। মনে হতে সমস্ত পৃথিবী যেন থরথর করে কেঁপে উঠছে। যেমন সেই বলরামপুরে ভূমিকম্প হয়েছিল সেবার, ঠিক সেইরকম।
রামহরি ভট্টাচার্য সেবার লোকমুখে শুনলেন—গুপীর মেয়ে হয়েছে—সেই রাত্রেই আস্তে আস্তে ঘরের দরজা খুলে বাইরে এলেন। ওস্তাদদের ডাকলেন গিয়ে মালোপাড়ায়। বললেনএক কাজ করতে হবে তোদের।
—কী কাজ দাদাঠাকুর?
অত রাত্রে দাদাঠাকুরকে দেখে ওরাও কম অবাক হয়নি। সবে মাছ ধরে এসে খেয়ে দেয়ে তরজার আসর থেকে বাড়িতে এসেছে। তখন ঘুমোতে যাবে।
