-তারপর?
—তারপর আর কি, চাকরি গেল—ম্যানেজারবাবু চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছে হঠাৎ। আমি জানতেও পারিনি আগে—আগে জানলে বলতাম, দু’ টাকা মাইনে বরং কমিয়ে দিন হুজুর, তবু, চাকরিটা রাখুন দয়া করে।
মনে আছে প্রকাশ ময়রার কথা শুনে বেশ হাসি পেয়েছিল সেদিন। হাসিটা অবজ্ঞার নয়, ঠাট্টারও নয়। অনেকটা কান্নার মতো করুণ হাসি সেটা। জীবনে এমন হাসি অনেকবার হাসতে হয়েছে ভূতনাথকে। ননীলাল শেষ পর্যন্ত অবশ্য চাকরি দেয়নি তাকে। কিন্তু সে-দোষ ঠিক ননীলালেরও নয়। ননীলালরা অমন করেই থাকে সংসারের সব ভূতনাথদের সঙ্গে। তার জন্যে ভূতনাথ জীবনে কখনও অনুশোচনা করেনি। কিন্তু দুঃখ কি হয়নি? হয়েছে, কিন্তু নিজের জন্যে নয়! ছোটবৌঠানের জন্যে এখনও এই মুহূর্তেও কেমন ভারী হয়ে ওঠে গলা, ভিজে আসে চোখ দুটো।
জবা কিন্তু সেদিন সেই কথাই বললে। অবশ্য হাসতে হাঁসতেই বললে। বললে—আপনার নিজের অপমান করবার সাহস নেই বলে বুঝি ননীবাবুকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন?
–কী বলছো তুমি? কোন্ ননীবাবু?
—আপনার বন্ধু ননীবাবু?
–সে এসেছিল নাকি?
…কিন্তু গোড়া থেকেই সমস্তটা বলা ভালো। বহুদিন পরে সমস্ত সঙ্কোচ কাটিয়ে যেদিন আবার গিয়ে ভূতনাথ ‘মোহিনী সিঁদুর’ আপিসের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো, আজ ভাবলে মনে হয়, সে-দিন না-গেলেই যেন ভালো হতো। অন্তত ঠিক এই সময়ে! বাড়িময় অত ব্যস্ততা। কিন্তু ভূতনাথের তো তখন সেকথা জানবার নয়। সমস্ত বাড়িটার চেহারাই যেন বদলে গিয়েছে। সব ছবি নামিয়ে নিয়েছে। নানা জিনিষ পাকার হয়ে পড়ে আছে চারিদিকে। এখানে ওখানে নোংরা। এখুনি যেন এবাড়িতে এসে উঠলো কেউ, কিম্বা এ-বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে এরা।
ভূতনাথ বললে—এসব কী জবা?
জবা বললে—আমরা এ-বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
—সে কি? কবে?
–আজই, এখুনি।
–কেন?
জবা শাড়িটাকে কোমরে জড়িয়েছে। সমস্ত মুখময় ঘামের বিন্দুগুলো ফুটে উঠেছে। সকাল থেকে যেন অনেক কাজ করতে হচ্ছে তাকে। কথা বলতে বলতে এক ফাঁকে কোথায় চলে গেল একটা কাজের ছুতোয়। তারপর এসেই আবার বললে—আপনি তো বেশ লোক, পাঁচ শ’ টাকা নিয়ে সেই যে চলে গেলেন, আর দেখা নেই—বাবা প্রায়ই আপনার নাম করেন।
-কেমন আছেন বাবা?
–দেখলেই বুঝতে পারবেন।
—কিন্তু আসতে আমি পারিনি সত্যি, চারদিকে চাকরির জন্যে ঘোরাফেরা করছি। সমস্ত দিন ডালহৌসি স্কোয়ারে ঘুরি ফিরি, তারপর এমন ক্লান্ত হয়ে থাকি, আর এতদূর হাঁটতে ইচ্ছে করে না, কিন্তু মাঝখানে সুপবিত্রবাবুর সঙ্গে রাস্তায় একদিন দেখা হয়েছে। খবর পেয়েছিলাম—বাবা ভালো আছেন—তা ছাড়া পরের বাড়িতে থাকি খাই, আর ওদের ওখানে বেশিদিন হয় তো থাকা চলবেও না—আর কী সূত্রেই বা থাকবো বলো না—ওরা খেতে দিচ্ছে এই তো যথেষ্ট।
জবা বললে—ততক্ষণ চলুন বাবার কাছে বসবেন—আমি হাতের কাজগুলো সেরেনি।
সুবিনয়বাবু বিছানার ওপর চুপ করে শুয়েছিলেন। বললেন— কে ভূতনাথবাবু এসো।
ভূতনাথ পাশে গিয়ে বসলো। এ-ঘরেরও সব পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে অনেক। ঘরের দেয়ালে মনে আছে রাজারাণীর এক জোড়া মস্ত ছবি টাঙানো ছিল উত্তরের দেয়ালে। জমকালো ভেলভেটের পোষাক। আর তার ওপরে জবার মা’র ছুচের কাজ করা একটা ফ্রেমে বাঁধানো কার্পেটের ওপর লেখা “God Save the King”। তারপর ছিল জবার মায়ের একটা অয়েল পেন্টিং। পা গুটিয়ে বসে আছেন আসনের ওপর। মাথায় আধ-ঘোমটা। লম্বা হাতা জামা। আস্তিনের ওপর সোনার চুড়ি অনেক গাছা করে। চওড়া পাড় ঢাকাই শাড়ি।
একদিন প্রথম এই ঘরে এসে ভূতনাথ জিজ্ঞেস করেছিল— আচ্ছা, তোমার কোনো ছবি দেখছিনে জবা—ছোটবেলার কোনো ছবি?
-আমি কি ছোটবেলায় মা’র কাছে ছিলুম যে আমার ছবি থাকবে। আমি তো কলকাতায় এসেছি যখন আমার বয়স আট ন’ বছর। তার আগে তো বলরামপুরেই থাকতাম।
-কোথায় থাকতে তুমি? বলরামপুরে?
জবা বলে—জানেন, বলরামপুরে আমার ঠাকুর্দাকে আমি বাবা বলতাম। ঠাকুর্দা পূজো করতেন—আমি একদিন নৈবিদ্যির ফল-টল সব খেয়ে ফেলেছিলাম, চোখে তো তিনি ভালো দেখতে পেতেন, শেষে ঠাকমা বললে—ওমা, তোমার নৈবিদ্যির কলা কী হলো?
ঠাকুর্দাও হাত দিয়ে দিয়ে দেখলেন তখন। বললেন—সত্যিই তো কলা কে নিলে?
খোঁজ খোঁজকে কলা খেলে। আমি তখন পেছনের মকরতলার আমগাছে উঠে লুকিয়েছি। ঠাকুর্দা খাওয়া ছেড়ে উঠলেন। খাওয়া হলো না তার। কোথায় গেল জবা! একবার খাওয়া ছেড়ে উঠলে আর তত হিন্দুদের খেতে নেই। খুজতে লাগলেন সব জায়গায়। আমি গাছে উঠে তখন সব দেখছি চুপটি করে। ভয় হলো তার! কোথায় গেল! বললেন—বোধহয় গুপী এসে নিয়ে গিয়েছে—বাবাকে গুপী বলে ডাকতেন কিনা। ঠাকুর্দা তো বাবার মুখ দেখতেন না, মারা যাবার শেষ দিন পর্যন্ত সে-প্রতিজ্ঞা কখনও ভাঙেন নি।
–তারপর?
—তারপর, ঠাকুর্দা তত ছিলেন অন্ধ, শনিবার সারাদিন উপোস করে রোববার সকালে হয় তত খেতে বসেছেন, আমাকে ঠাকুমা পাতের কাছে বসিয়ে রেখেছে পাহারা দিতে, আমার তো খুব সুবিধে—পাত থেকে সব তুলে খাচ্ছি, কেউ দেখতে পাচ্ছে না। হঠাৎ ঠাকুর্দার খেয়াল হয়েছে—বললেন—মাছ হয়নি আজ?
ঠাকুমা বললে—সেকি? তবে বোধ হয় বেরালে নিয়ে গেল।
কিন্তু বেরাল আসবে কী করে! আমি তো পাহারা দিচ্ছি।
ঠাকুমা বললে—হয়েছে, বেরাল নয়—ও জবাই খেয়ে নিয়েছে পাত থেকে।
-ওমা তাই নাকি? ঠাকুর্দা হাসলেন। ঠাকুর্দার একটা তও ছিল না। ফোগলা দাতে হা হা করে হাসতে লাগলেন। বললেন—তুমি এতো দুষ্ট হচ্ছে দিন দিন তোমাকে এবার গুপীর কাছে ঠিক পাঠিয়ে দেবো-ও থাকুক গিয়ে কলকাতায়।
