—ছুটুকবাবু কী বললে?
—আসলে চুড়ো কী বলবে, হাবুল দত্তই তো ওকে চালাচ্ছে–দিনরাত জামাইকে পরামর্শ দিচ্ছে, এটা করে, সেটা করো। বিয়ের আগে হাবুল দত্ত আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল—ছেলে কেমন। আমি বলেছিলুম—গগাবর গণেশ ছেলে, ভালো-মন্দর বালাই নেই। মনটা ঝড়-ঝাপটা, আপনি চালিয়ে নিতে পারেন তো দিন মেয়ে। বনেদীঘর, তাতে তো আর কোনো সন্দেহ নেই, তবে আজকাল বনেদীর কোনো দাম নেই। এখন ও-সব সামন্তযুগ চলে গিয়েছে। এখন ক্যাপিটালিজম-এর যুগ। ক্যাপিটাল মানে মূলধন যার আছে তারই খাতির। দ্বারকানাথ ঠাকুর বিলেতে গিয়ে দু’হাতে টাকা ছড়ালেন, নুনের এজেন্ট প্লাউডেন সাহেবের দেওয়ানী করলেন, নীলের ব্যবসা করলেন ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক করলেন, চিনির কল করলেন, কয়লার খনি করলেন, তাই করেই প্রিন্স হলেনপ্রিন্স দ্বারকানাথের মতো লোক ভারতবর্ষে আর দুটো জন্মালে না, লোকে সব নাম করে রামমোহনের, কিন্তু লোক তো প্রিন্স।
বেশ রাত হয়ে এসেছিল। ননীলাল ইজি-চেয়ারটায় হেলান দিয়ে পা তুলে দিয়েছিল। পটলডাঙার এ-বাড়িটাও বেশ বড়। দু’ মহল। পূজোর দালান, দেউড়ি সবই বড়বাড়ির ছাদে। চারদিকে চেয়ে বোঝা যায়, এ-বাড়ির মালিকও একদিন কলকাতার পত্তনের সময়ে ঐশ্বর্য আহরণ শুরু করেছিলেন। মালিক আজ নেই। ননীলালের শ্বশুর নেই। নাবালক শ্যালকরা সব ননীলালের তাবে। একদিন এই বাড়ির মালিকও যা কল্পনা করতে পারেননি, ননীলাল তাই সফল করেছে। বার-বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠে এ-ঘরে আসতে হয়। খুব ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গরাই এখানে আসবার অনুমতি পায় বুঝি। খান কয়েক বিলিতি ছবি টাঙানো দেয়ালে। অর্ধ-অনাবৃত মেম-সাহেবদের চেহারা।
ননী বললে—ভাবছি একবার বিলেতে যাবো।
-সেকি, বউ কিছু বলবে না?
—কারোর বলার তোয়াক্কা করলে আর চলে না, অনেকদিন ধরে সবাই যেতে লিখছে, অনেকগুলো নতুন মেশিনের অর্ডার দিয়েছি, সেগুলো নিজে দেখে কেনবার ইচ্ছে আছে, তা ছাড়া ওই যে বললুম-প্রিন্স দ্বারকানাথ আমার আদর্শ।
হঠাৎ বাইরে দরজার কাছে যেন কার পায়ের শব্দ হলো।
ননীলাল চিৎকার করে উঠলো—কে রে, বদরি?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, হুজুর।
–ক’টা বাজলো রে?
—হুজুর অনেক রাত হয়েছে–কী খাবেন আজকে?
–কী খাওয়াবি বল তো?
—হুজুরের মরজি হলে যা চাইবেন সব খাওয়াতে পারি।
–যা তুই এখন, যা খুশি তোর রাঁধ।
বদরি চলে গেল। চাপ-দাড়ি। মাথায় পাগড়ি। কোমরে তকমা আঁটা। খানসামার মতো চেহারা।
ননী বললে—ওর নাম বদরুদ্দিন, আমি ওকে হিন্দু বদরিনারায়ণ বানিয়ে দিয়েছি।
—মোছলমান নাকি?
-হ্যাঁ, কিন্তু খুব চমৎকার বাঁধে, ওর ঠাকুরদা ছিল দ্বারকা নাথের বাবুর্চি।
-বাড়ির রান্না খাস না?
-রাত্তিরের খাবারটা বদরিই রাঁধে, ঠিক নেই তো কখন খাবো–খাবো, তা ছাড়া আমাদের সরকারী রান্নাঘরের অনেক বাছবিচার, অন্দরমহলের বাসন বাইরে যদি আসে তো আর ভেতরে ঢুকতে পারে না। আমার বাইরের জন্য থালা বাসন সব আলাদা–আমি ভেতরে ঢুকলে কিছু আপত্তি নেই কিন্তু বাইরের বাস ঢুকলেই সব গোশ্লায় যাবে।
ভূতনাথ এতক্ষণে বলি-বলি করে এবার হঠাৎ বলে ফেললে আমার সেই চাকরির কথাটা আর কিছু ভেবেছিলি?
ননীলাল বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। চোখ খুলে বললে নিশ্চয়ই, আমি তো বলেইছি তোকে তোর চাকরি হবে—আমার ফার্মেই হবে-সে তো বলেই রেখেছি।
ভূতনাথ বললে—অনেক জায়গায় ঘুরছি কিনা—সবাই কেবল
ননীলালের হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে গেল। বললো ভালো কথা, তোর সেই পার্টির কী হলো রে—অনেক টাকা আছে বলছিলি?
ভূতনাথ অপরাধীর মতো কুষ্ঠিত হয়ে পড়লো। বললে–সুবিনয়বাবুর কথা? তা চাকরির ধান্দায় আর ওদিকে যেতে পারিনি ভাই। বড় ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে এ ক’দিন–কালই যাবে।
কিন্তু পরদিনই ঠিক যাওয়া হয়নি জবাদের বাড়ি। অনেক রকম সঙ্কোচ এসে বাধা দেয়। কী অজুহাত নিয়ে যাবে, গিয়ে কী বলবে —এই সব কথা ভাবতে ভাবতেই আর যাওয়া হয়ে ওঠে নি। অথচ এত সঙ্কোচ থাকবার কী যে কারণ থাকতে পারে কে জানে।
ননীলালের বাড়ি থেকে বেরোতেই হঠাৎ দেখা হয়ে গেল প্রকাশের সঙ্গে।
রাত্রের অন্ধকারেও প্রকাশকে চিনতে বিশেষ অসুবিধে হবার কথা নয়।
প্রকাশ অন্যমনস্ক ছিল। ভূতনাথকে দেখতেও পায়নি।
–প্রকাশ না!
চমকে উঠেছে প্রকাশ ময়রা।–ঠাকুর মশাই, আপনি এখেনে?
—এই এসেছিলাম এদিকে! এত রাত্রে তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কেন?
-এই তো সাহেবের বাড়ি আমাদের, সাহেবের সঙ্গে একবার দেখা করবো ভাবছি, রাত্তির করেই তো ফেরেন সাহেব-বাড়ি ঢোকবার সময় ধরবে পা জড়িয়ে—যা থাকে কপালে—হয় এপার নয় ওস্পার—কী বলেন আপনি।
—কী হয়েছে তোমার?
—আজ্ঞে, চাকরিটা চলে গেল।
—গেল কেন?
-আজ্ঞে, কপালের ফের—আর কী বলবো, আমি ভাবছিলাম আপনার কথাটা সাহেবকে বলবো একবার, তা আমার চাকরিটাই চলে গেল—দেখি একবার সাহেবকে ধরে-ক’দিন ধরে চেষ্টা করছি, কিছুতেই ধরতে পারছিনে। আজ ধরবো পা জড়িয়ে–কী বলেন।
প্রকাশের জন্যে কেমন যেন মায়া হয়েছিল ভূতনাথের সেদিন। লোকটা কোনো কিছুতে টিকে থাকতে পারলে না। হয় তো পারবেও না। কপালের ফেরই বটে! জিলিপীর ব্যবসা, ঘটকালি, চাকরি, সবগুলোই ক্ষণস্থায়ী হয় ওর জীবনে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—তুমি দোষটা করেছিলে কী?
—আজ্ঞে, ঠাকুর মশাই, কোনো দোষ তো করিনি জ্ঞানত।
—আর কারো চাকরি গিয়েছে তোমার সঙ্গে?
–না আজ্ঞে।
তারপর একটু থেমে বললে–তবে হ্যাঁ, একদিন সাহেবের ঘরে গিয়ে মাইনে বাড়াবার কথা বলেছিলাম বটে, বলেছিলাম—আট টাকা পাচ্ছি হুজুর, এতে কুলোতে পারছি না। মেয়ের বিয়ে দিতে হবে, কিছু দেনা হয়ে গিয়েছে বাজারে—এই সব কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম—দু’ এক টাকা মাইনে বাড়িয়ে দিন হুজুর।
