কিন্তু ননীলাল বলে—এটা হলো কয়লাখনি লোহা আর স্টীমইঞ্জিনের যুগ।
সেদিন ননীলালের বাড়িতে রাত্রে এই কথাই হচ্ছিলো। ননীলালের বসবার ঘরখানায় কিন্তু ফরাশ পাতা নেই। গোটাকতক চেয়ার টেবিল বসিয়েছে।
ননী বললে—ওসব বড় বড় লোকদের কথা ছেড়ে দেওয়া ছিল ইংরেজদের পুষ্যিপুত্তর, এটা নতুন দেশ, বিদেশ বিভূই—এখানে বাস করতে গেলে এখানকার কয়েকজন লোকের সাহায্য নিতে হবেই—তাই ওদের সব বেনিয়ান মুৎছুদ্দি করে নিয়েছিল আর কিছু কিছু সুবিধেও ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু কত জমিদারকে ভিটে-মাটি ছাড়া করেছে জানিস? সেকালে বাকি খাজনার দায়ে নাটোরের রাজাকে রাজবাড়িতে বন্দী করে রেখেছিল। দিনাজপুরের রাজবংশের সমস্ত সম্পত্তি ১৮০০ সালে নীলেম হয়ে যায়। নদীয়ারাজের তো সব গেল বাকি খাজানার দায়ে। রাজা শুধু লাখ টাকা করে ভাতা পেতে।
ভূতনাথ বললে—এবার রাত হলো বাড়ি যাই।
—যাবি, আর একটু বোস।
–তুই ভাত খাবি না—বউ কিছু বলে না?
ননী গ্লাশটা শেষ করে বললে-মেয়েমানুষে আর নেশা নেই ভাই—ও যে-বিন্দী, সে-ই মিসেস গ্রিয়ারসন, সে-ই বউ-ও সবাই এক—এখন কেবল টাকা। এটা টাকার যুগ। আর সেই টাকার গোড়া হলো কয়লাখনি আর কলকারখানা। দেখবি তোকে বলে রাখছি, একদিন রাণীগঞ্জ, আসানসোল, কুলটি আর হাওড়া, হুগলী, বর্ধমান, মানভূম, সিংভূম—এই সমস্ত জায়গাটা একেবারে সোনা হয়ে উঠবে—কলকাতার চেয়ে দশ গুণ বড় হয়ে উঠবে—আর সমস্ত কলকারখানা গড়ে উঠবে ওইখানেই।
—তুই স্বপ্ন দেখিস নাকি?
—স্বপ্ন দেখি বৈকি—কিন্তু জেগে জেগে-আমার আর কোনো স্বপ্ন নেই, কেবল ভাবি হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোক খাটছে আমার কারখানায়, মজুররা সার বেঁধে চলেছে কাজ করতে আর আমার গাড়িটার সামনে এলেই সেলাম করছে।
তারপর থেমে বললে—তাই তো সেদিন চূড়োকে বললামযদি টাকা করতে চাস তত কোলিয়ারি কিনে ফেল—কয়লা না হলে কিছু হবে না, আজকাল সব স্টীমের যুগ—স্টীমের জন্যে কয়লার দরকার—কিন্তু ওর কাকাদের তাতে মত নেই।
ভূতনাথ বললে-ছুটুকবাবু আজ-কাল খুব লেখা-পড়ায় মন দিয়েছে। বললে—গান-বাজনা ছেড়ে দিয়েছে।
—আরে কিছুই হবে না ওর, আমাকে বলছিল, জমিদারী থেকে তেমন আয় হচ্ছে না আগেকার মতন, সবাই চুরি-চামারি করতে আরম্ভ করেছে, প্রজারাও সব শহরে আসছে কলকারখানায় কাজ করতে, তাতে আয় বেশি। এবার ওর বিয়েতে মহাল থেকে কেউ কিছু নাকি পাঠায়নি—কেবল খেয়ে গিয়েছে পেট পুরে—সেদিন দেখ না, ওর মেজকাকা গাড়িটা কিনলে, নগদ টাকা দিতে পারলে না বলে বেচে দিতে হলো—মাঝখান থেকে লোকসান হলো কিছু টাকা।
—কিন্তু নান্নেবাঈ তো সেদিন আবার এসেছিল নাচতে, শুনলাম—তিন শ’ টাকা নিয়ে গেল!
–ওই যে, প্রেস্টিজ, আর কিছু নয়, আমি আনিয়েছিলুম নাবোঈকে লক্ষ্ণৌ থেকে পাঁচ শ’ টাকা খরচ করে, সাহেবমেমদের একটা পার্টি দিয়েছিলাম, বেটারা আমাদের দেশের গান শুনতে চেয়েছিল, তাই—কিন্তু তেমনি পাঁচ শ’ টাকা খরচ করে যে পাঁচ হাজার টাকা উসুল করে নিয়েছি।
-সে কি রকম?
-ওই তো তফাৎ-চৌধুরীরা জানে টাকা জমাতে নয়, জানে শুধু খরচ করতে—কিন্তু টাকার বাচ্চা পাড়াতে তত জানে
—চূড়োকে তাই তো বলছিলাম। বললাম-যদি ব্যবসা করতে চাস তো আমার ফার্মে আয়, কিছু টাকা ঢাল, যাতায়াত কর দু’-চার দিন ঘোরা-ফেরা কর-কেমন করে লোকের সঙ্গে মেলামেশা করি দ্যাখ শোন—তা তত করবে না। ওর কাকা সেদিন পুতুলের বিয়ে দিয়েছে শুনলুম তার ঝি-এর পুতুলের সঙ্গে। খুব নাকি খাওয়া-দাওয়া হয়েছে—চূড়োই বলছিল।
সে এক কাণ্ড। ছুটুকবাবুর বিয়ের দু’দিন আগে। কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ নেমন্তন্ন হয়ে গেল ভূতনাথেরও।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে হঠাৎ নেমন্তন্ন কিসের?
—আজ্ঞে, আজ মেজমা’র পুতুলের বিয়ে যে—গিরির মেয়ে আর মেজমা’র ছেলে।
গিরি বলে—আমার টাকা কোথায় মেজমা-মেয়েকে আমি গয়না-গাটি কিছু দিতে পারবো না।
মেজমা বলে—আমার ছেলের বউ, আমি গা সাজিয়ে দেবোতুই বিয়ের যোগাড় যন্তর কর।
তা যোগাড় যন্তর কম নয়। টাকা সব মেজমা’র। বলে— গরীবের মেয়ে বলে জাকজমক কম হলে চলবে না, যা টাকা লাগে আমি দেবো।
ন’বৎ বসলো দেউড়িতে। রীতিমতো ঘরে ঘরে নেমন্তন্ন হলো। গায়ে হলুদের তত্ত্ব পাঠালে মেজমা। দেখবার মতো জিনিষ সব। কাচের চুড়ি, সোনার বেঁকি চুড়ি, পাটি হার, ছানার পুতুল, দশ চাঙারি শাড়ি সেমিজ। দরজির দোকান থেকে তৈরি হয়ে এসেছে কনের জামা সেমিজ। যেমন হয় সাধারণ বিয়েতে। গিরিও পাঠালে ফুলশয্যা। সিঁদুরেপটি থেকে ফুল, ফুলের মালা এল। রূপলাল ঠাকুর সিধে পেলেন। রাত্রিবেলা সার বেঁধে বড়বাড়ির চাকর বাকর ঝি ঝিউড়ী কর্মচারি সব খেতে বসলো। শাখ বাজলো। উলু দিলে মেয়েরা। অনুষ্ঠানের কোনো ত্রুটি নেই।
গিরির মেয়ের বিয়েতে কিছু ধার দেনা করতে হলো। মাঝখান থেকে হাজার বারো শ’ টাকা খাজাঞ্চীখানা থেকে বেরিয়ে গেল মবলক।
ননী বললে-যুগ যে বদলে গিয়েছে সে খবর তো আর রাখে না ওরা। ওকে বললাম তো, আস্তে-আস্তে জমিদারীটা গুটিয়ে আন, কালেক্টরিতে দরখাস্ত কর কিম্বা ভূমিস্বত্ব উপস্বত্ব যা কিছু আছে সব বেচে দে। কেনবার ললাকের অভাব নেই, আমিই কিনে নিতে পারি, কিন্তু তার থেকে যে নগদ টাকাটা পাওয়া যাবে, সেইটে দিয়ে কিছু যদি না-ও করিস, সব চেয়ে নিরাপদ কয়লার খনি কেনা, একটা খনি শেষ হতেই একটা পুরুষ কেটে যায়। তারপর সেখানে চুপ করে থাকলেই চলবে না, কয়লার খনি কেনো তারপর কারখানা চালাও। আজকাল তো লোহার যুগ-অঙ্ক কষে লাভ-লোকসান খতিয়ে সব দেখিয়ে দিলাম সেদিন।
