ওই ঘটনার পর থেকেই কেমন যেন সব চুপ-চাপ।
বিধু সরকারের মেজাজ আরো রুক্ষ হয়ে উঠেছে আগের চেয়ে। বলে—এ তোমার পোস্টাপিস নয় হে, এখানে আইনকানুন দেখিও না, যা পারো করো গে—এ মাসে কিছু মিলবে না, আসছে মাসে এসো।
—আজ্ঞে, পাঁচ মাস হয়ে গেল, বাইশটে মাত্তোর টাকা।
বিধু সরকার লাফিয়ে ওঠে—বাইশটে হোক আর বাষট্টিটেই হোক, পাবে না তো পাবে না, বলেছি যখন পাবে না ব্যস। কাছারি আছে, আদালত আছে, যা পারো করে গে, যাও।
শীতকালে পোষ-মাঘ মাসে একবার করে নান্নেবাঈ কলকাতায় আসে দলবল নিয়ে। কাশীতে বাড়ি। ওই সময়টা বোধ হয় সারা ভারতবর্ষের বড় বড় শহরে মুজরো করতে বেরোয়। খাসা বাঁধুনি চেহারাটার। নাকে হীরের নাকছাবি। গলায় চন্দ্রহার। ডান কাঁধে শাড়ির আঁচলটা ঝুলিয়ে দেয়। কলকাতায় এলে দু’ চারটে বাঁধা ঘরে গিয়ে সেলাম করে আসে। সেবারও এল। কোনোবার বাদ দেয়নি মেজবাবু। এসব ব্যাপারে বড়বাড়ির সুনাম আছে লক্ষ্ণৌ, কাশী, এলাহাবাদের বাঈজী মহলে।
সারেঙ্গীওয়ালা মুন্নালাল দলের সর্দার। তার কাজ মুজরো যোগাড় করা। রেশমী পাগড়ীর ওপর জরির চুমকির কাজ। পায়ে আগ্রার নাগরা।
বিধু সরকার চিনতে পেরেছে। খাতা থেকে মাথা তুলে (চশমাটার ওপর দিয়ে দেখলে একবার।
-সেলাম খাজাঞ্চীবাবু।–কী মুন্নালাল, আবার এসে গিয়েছে।
-আজ্ঞে, দু’রোজ হলো কলকাতাতে এসেছি, কাল মুজরো ছিল হাটখোলার দত্তবাড়ির কোঠিতে, আজ আছে ঠনঠনিয়ার নটে দত্তবাবুর বাড়ি—মেজবাবুকে একবার সেলাম জানাতে এসেছি।
-নান্নেবাঈ কেমন আছে?
—হুজুর আপনাদের মেহেরবানি আর খোদার মরজি, মেজবাবু ফরমায়েশ করেন তো, একদিন এখানে নাচা-গানা করে যাই।
বিধু সরকার ছাড়লে না। বললে—তা অন্যবার কলকাতায় এলে আগে মেজবাবুকে সেলাম করে তবে ঠনঠনের দত্তবাড়িতে যাও—এবার এত পরে এলে কেন মুন্নালাল? মেজবাবু কি ও-বাড়ি থেকে বেশি মুজরো দেয় না?
—ছিয়া—ছিয়া—কি যে বলেন বাবুজী, এবার ননীবাবু নিজে ডেকে এনেছিলেন আমাদের, মেমসাহেবদের খানাপিনা ছিল বাড়িতে, সেখান থেকে তিনদিন ছাড়া পেলাম না, এখানে আসবো আসবো করছি, নটেবাবু ধরলেন গিয়ে—আজকে একটু ফাঁক পেলাম, ভাবলাম সেলাম জানিয়ে আসি মেজবাবুকে—গোস্তাকি মাফ হয় হুজুর
–ননীবাবু! ননীবাবুটা আবার কে! বিধু সরকার ভুরু কেঁচকালো।
—আজ্ঞে, পটলডাঙার ননীবাবু।
তবু চিনতে পারলো না বিধু সরকার। চুলোয় যাক! আজকাল তো সবাই বাবু। দুটো কাঁচা পয়সা হলেই বাবু। ছেনি দত্ত মারা যাওয়ার পর নটে দত্তও টেক্কা দিতে শুরু করেছে। —তা বোসো তুমি, মেজবাবু তো এখন ঘুমুচ্ছেন—উঠলে খবর দেবো।
২৮. বংশী দেখতে পেয়েই দৌড়তে
বংশী দেখতে পেয়েই দৌড়তে দৌড়তে এল।-কোথায় ছিলেন শালাবাবু চৌপর দিন, আপনাকে অত পই পই করে বললাম—সন্ধ্যেবেলা কোথাও বেরোবেন না, জার্মা কাপড় পরে তৈরি হয়ে থাকবেন—আর ছোটমা’র কাছে আমার যাচ্ছে তাই হেনস্থা হলো।
–-কি হলো, কি?
—ছোটমা তৈরি হচ্ছে যে।
—কিন্তু আমি তো দেরি করিনি, তুমি ছোটবাবুর জন্যে কাপড় কোঁচাতে গেলে, আর আমিও ভাবলাম বসে বসে কি করবো, একটু ঘুরে আসিবেলা তো অনেক আছে।
—কোথায় গিয়েছিলেন শুনি?
—আর কোথায়, একটু চাকরির চেষ্টায় গিয়েছিলুম যেমন যাই আর কি।
কথাটা ঠিক সত্যি বলা হলো না। চাকরির চেষ্টাতেই যথারীতি বেরিয়েছিল ভূতনাথ, কিন্তু কোন্ ঘটনাচক্রে কোথা দিয়ে কমন করে জবাদের বাড়ি চলে যাবে কে জানতো। অথচ কি প্রয়োজন ছিল যাবার। তাকে কেউ যাবার জন্যে মাথার দিব্যি দেয়নি। আর তা ছাড়া না বেরোলে তো লোচনের সঙ্গে দেখা হতো না অমন জায়গায়!
বংশী বললে—আপনি বসুন গিয়ে আপনার ঘরে—আমি দেখি গিয়ে ছোটমা’র কদর।
নতুন একটা কোম্পানী হবার কথা আছে। কয়েকজন লোক নেবে খবর পাওয়া গিয়েছিল। দইয়েহাটা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে দর্মাহাটায়। টা টা করছে রোদ্দর। মিছিমিছি এতদূর আসা। কোথায় কোম্পানী, কোথায় কি! পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন হচ্ছে। এখনও কিছুই হয়নি।
একজন বললে—এখন কোথায় কি বাবু, আগে বাড়ি সারা হোক, তবে তো লোক নেওয়া।
—কতদিন লাগবে আরো?
—সে বাবু আরো ছ’ মাসের ধাক্কা।
লোকটা বোধ হয় নতুন কোম্পানীর দারোয়ান। টুলের ওপর বসে বসে খইনি টিপছিল। গলায় লম্বা পৈতে। কথা বলে আবার হাতের রামায়ণটা পড়তে লাগলো। ঘেষাঘেঁষি বাড়ি। পেঁচানো গলি। তবু ওই সরু গলিটার বাঁকের মুখেই একটা বিরাট বটগাছ। শেকড়টা প্রায় রাস্তা জুড়ে আছে। কাছাকাছি কোথাও বসলে বেশ আরাম হতো। লোহার চাকাওয়ালা ঠেলাগাড়ি ভর্তি মাল গড়গড় করে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে কুলীরা।
–এখানে কোনো চাকরি-বাকরি খালি আছে ভাইয়া—সামনে যাকে পাওয়া গেল তাকে জিজ্ঞাসা করে বসলো ভূতনাথ।—এই ধরো সাত-আট টাকা মাইনে, আর কাজ বলতে সবই পারবো।
এমনি করে কয়েকদিন ঘুরলে একটা-না-একটা চাকরি হবেই। চীনেবাজার, সুর্তিবাগান, রাধাবাজার, সোয়ালো লেন, লিয়ন্স রেঞ্জ—এই সব পাড়ায় আজকাল অনেক আপিস হয়েছে। পাথরের সাইন-বোর্ডের ওপর সব নাম লেখা।
সুবিনয়বাবু বলতেন–বাঙালীরা আজকালই যা ব্যবসায় পেছনে হটে এসেছে, কিন্তু সেকালে সবই তো ছিল বাঙালী। নকু ধর টাকা ধার না দিলে ইংরেজরা কোথায় থাকতো আজ ভূতনাথবাবু। মুর্শিদাবাদের নবাবদের কাছে জগৎশেঠ যা ছিলেন, ইংরেজদের কাছে নকু ধরও ছিলেন তাই। এই কলকাতার প্রথম যৌবনে যারা তার সেবা করেছিলেন তারা তো বাঙালীই। দ্বারকানাথ ঠাকুর করেছিলেন ‘ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক’। রাজা সুখময়, তিনি ছিলেন স্যার ইলাইজা ইম্পের দেওয়ান। ব্যাঙ্ক অব বেঙ্গলের একমাত্র বাঙালী ডিরেক্টর। তারপর বিলিতি কোম্পানীর সব বেনিয়ানরা প্রায় সবই তো বাঙালী। ধরো, আশুতোষ দে, গোরাদ দত্ত,প্রাণকৃষ্ণ লাহা, শম্ভু মল্লিক।
