বড়বাড়ির নিয়মই নাকি এই। বড়মা’র বাপও নাকি এখানে এনে মেয়ে দেখিয়েছে। মেজমা’র বিয়ের আগে তাকে এ-বাড়িতে দেখাতে নিয়ে এসেছিল মেজবাবুর শ্বশুর।
বংশী বলে—চৌধুরীরা তো আজ্ঞে কনের বাড়িতে মেয়ে পছন্দ করতে যায় না কখনও—তা দত্ত মশাই যেদিন নতুন বউকে দেখাতে আনলে—সে এক কাণ্ড শালাবাবু-হাসতে হাসতে মরি আমরা।
বড়মা একবার জিজ্ঞেস করলে—তোমার নাম কি মা।
নতুন কনে এক জায়গায় চুপ করে বসে থাকতে জানে না, ছটফট করে ঘুরে ঘুরে তখন দেখছে সব। একবার দৌড়ে যায় মেজমা’র ঘরে, বাঘবন্দির ঘুটিতে হাত দেয়, আবার কখনও ছোটমা’র ঘরে গিয়ে পুতুলের আলমারিতে হাত দেয়। ট-উ-উ-উ–করে দম টেনে দৌড়ে যায় বারান্দায় এ-কোণ থেকে ও-কোণ।
মেজমা দেখে শুনে তো হেসে খুন। বলে-এ বউ তোমার স্বগ্যে বাতি দেবে বড়দিদেখে নিও।
বড়মা বলে—তুই নিজে কী ছিলি মেজো, আজ না হয় এত বড় ধিঙ্গি হয়েছিস। চিৎপাত হয়ে মাটিতে শুয়ে-দেয়ালে পা তুলে দিয়ে—’আয় বিষ্টি ঝেপে’ বলে ছড়া গাসনি?
সৈরভী ঘটকী বললে—সবে তো দশে পা দিয়েছে মাঠাকরুণ— মায়ের অষ্টম গত্যের সন্তান কিনা একটু ছটফটে তো হবেই।
বড়মা বললে—গড়ন-পেটন তো ভালোই হবে মনে হচ্ছে আমার।
নতুন রেশমী শাড়ি পড়ে এসেছিল নতুন কনে। দৌড়ঝাঁপের চোটে তখন শাড়ি অঙ্গ থেকে খসে পড়েছে। বারান্দায় লুটোচ্ছে শাড়িটা।
সৈরভী বললে—কেমন ভারী-ভারী ধাচ দেখছে না মাঠাকুরুণ–বয়েসকালে ডাগর হলে ঠিক তোমার মতন দেখতে হবে বউমাকে।
বড়মা ভারী খুশি।
সেইদিনই বিধু সরকারকে ডাকিয়ে আনানো হলো তেতলার সিঁড়ির গোড়ায়। আড়ালে দাঁড়িয়ে বড়মা বললেন—ও সিন্ধু, সরকার মশাইকে বলমেজকর্তা এখানেই কথা দিক—আমার মেয়ে পছন্দ হয়েছে।
মেজকর্তা সব শুনে বললে—দেখো তো কাণ্ড—লোহার কারবারি—দু’পুরুষ হলো সবে উঠেছে—এখনও বাড়িতে দুর্গোৎসব হয়
ওদের। রাস্তার ধারের ঘরে আবার ভাড়াটে বসিয়েছে—যা বনেদী ঘরে কেউ কখনও করেনি—তাদের কুটম করা…
ভৈরববাবু বললে—আমি সব খবর নিয়েছি মেজবাবু, হাবুল দত্ত মদের নাম শুনলে নাক সিটকোয়।
মেজবাবু জিজ্ঞেস করলেন—খবর নাও তো ভৈরববাবু—মেয়েমানুষ-টানুষ রেখেছে কিনা।
—তা-ও খবর নিয়েছি স্যার।
–কী শুনলে?
—কী যে আপনি বলেন মেজবাবু, হাবুল দত্ত রাখবে মেয়েমানুষ! এ হলো আলাদা কেলাশের লোক স্যার, লোহার কারবার করে আর ঠিকেদারির কাজ আছে। মেয়েমানুষ-টানুষ পুষতে গেলে বনেদী দি থাকা চাই মেজবাবু—শেষকালে জামাইকে না হাত করে ফেলে।
কিন্তু যা ভবিতব্য তা হবেই।
হাবুল দত্ত দোকান বন্ধ করে আসে রোজ একবার করে। কর্তাদের সঙ্গে দেখা হয় ভালো। আর না-দেখা হয় ক্ষতি নেই। সোজা চলে যায় ছুটুকবাবুর ঘরে।
সেদিন দুপুরবেলায় ডাক পড়লো বিধু সরকারের। খাজনা আদায়-পত্তোরের জমা-খরচ, রসিদ বহি, প্রজা-বিলি, সেলামীআদায়ের নথি-পত্ৰ সমেত।
বিধু সরকার ঝড়ের মতো খাজাঞ্চীখানায় এসে ঢুকলো। বললে—সরে দিকিনি সব, হট্টগোল করো না এখন—পরে এসো, এখন বলে মরবার ফুরসত নেই আমার—বলে চার পাঁচ দফা খাতা বই নিয়ে আবার উধাও। কাছাকোঁচার ঠিক নেই। দৌড়তে দৌড়তে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
—সরকার মশাই আমার বরফের পাওনাগণ্ডাটা বুঝিয়ে দিলেন, ভোর থেকে যে বসে আছি।
বিধু সরকার রেগে লাল-বেয়াদব কোথাকার—বাবুদের পঞ্চায়েৎ বসেছে—এখন তাদের হুকুম তামিল করবে না তোর হুকুম শুনবো রে। বাঁচি যদি তো পাবি সব কাল।
বেণীকে জিজ্ঞেস করলে ভূতনাথ-কীসের পঞ্চায়েৎ বাবুদের?
–তা জানিনে শালাবাবু।
বেণী জানে না। লোচনও জানে না। মধুসূদন জানলেও কি বলবে! সমস্ত দিনটা কেমন উদাস লাগে, কোথাও যেন কোনো আকর্ষণ নেই। ছোটবৌঠান এতক্ষণ তার নিজের ঘরে হয় তো নেশার ঘোরে ঝিমোচ্ছে। তার কাছে আজ হয় তো ভূতনাথের প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে। সেদিনের সেই মদের বোতল ভেঙে যাওয়ার পর আর যায়নি ভূতনাথ।
বংশীও বললে—কী জানি বাবু কীসের পঞ্চায়েৎ।
-কে কে আছে নাচঘরে?
—দেখে এলাম, মেজবাবু, ছোটবাবু, ছুটুকবাবু, ছুটুকবাবুর শ্বশুর–এই চারজন, তা একে পঞ্চায়েৎ বলতে চান বলুন—আর আছে খাজাঞ্চীবাবু। খাজাঞ্চীবাবুকে নিয়ে পাঁচজন হলো— তিনি তো দাঁড়িয়েই কথার জবাব দিচ্ছেন।
এমন তো কখনও হয় না। যদিও বা হয়, তা-ও কচিৎ কদাচিৎ। বছরের পর বছর একই বাড়িতে অবশ্য বাস করছে মেজবাবু, ছোটবাবু, ছুটুকবাবু। অথচ পরস্পরের কথা হওয়া দূরে থাক, মুখ দেখাদেখিও নেই। যে-যার নিজের নিজের ঘরে বসে আছেন। অথচ ঝগড়াও নেই কারো সঙ্গে।
—এই একটু আগে মধুসূদন বালকবাবুকে খবর দিতে গেল।
–বালকবাবু কে?
–আজ্ঞে, বড়বাড়ির উকিল—বউবাজারের বালক উকিল, দেখেন নি?
বড়বাড়ির ইতিহাসে এ ঘটনা নতুন বৈ কি! তবু তারপরে কতদিন কেটে গিয়েছে, ফলাফল কিছু জানা যায়নি। ঝাড়া দু’ ঘণ্টা ধরে কথাবার্তা চলেছে। তারপর কখন সন্ধ্যেবেলা সবাই চলে গিয়েছে ভূতনাথ টের পায়নি। ভূতনাথ গিয়েছিল জবাদের বাড়ি। বাড়িতে ফিরে এসে বংশীকে জিজ্ঞেস করেছে—কিছু শুনলে নাকি, কী হলো?
-কীসের কী হলো শালাবাবু?
—এই কর্তাদের পঞ্চায়েত-এ।
–কে জানে শালাবাবু, ছোটবাবু এসে বললে—বরফ ভাঙ। আমি বরফ ভেঙে দিলাম গেলাশে—ছোটবাবুকে যেন খুব ক্লান্ত মনে হলো, গম্ভীর গম্ভীর মুখ—কিছু কথা বললেন না—চুপ-চাপ শুয়ে পড়লেন পালঙ-এর ওপর চিতপাত হয়ে—আমি পা টিপতে লাগলুম আজ্ঞে।
