–আজ্ঞে, ট্রামের কথা বলছিলাম, হয়েছে ভালো হয়েছে, কিন্তু ইজ্জত নেই ওতে-দশজনের সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে বসা।
হাবুল দত্ত বললে—মোটরগাড়ি কিনলেন নাকি বেয়াই মশাই?
মতিবাবু পাশ থেকে বললে—মোটর না কেনাই ভালো মেজবাবু। হুস করে ছাড়লো আর দেখতে না দেখতে উড়ে গেল কোথায় কেউ দেখতে পেলে না, বাহবা দিলে না–ও যেন কেমন
ভৈরববাবু বললে—আর কলকজার ব্যাপার—বিগড়ে গেল তো গেল-পড়ে থাকো রাস্তায় হা-পিত্যেশ করে।
তারকবাবু বললে—তেমন-তেমন ঘোড়া হলে মোটরকে হার মানিয়ে দেয় মশাই। হীরে, মুক্তো দিয়ে সাজিয়ে দিন না ঘোড়াকে, কোচোয়ান-সহিসকে জরির সাজ-পোষাক পরিয়ে দিন—দু’দণ্ড হাঁ করে চেয়ে দেখতে হবে না!
কথা যেন জমে না। এমনি রোজই হয়।
হাবুল দত্ত বলে—বাবাজীর ঘুম ভেঙেছে নাকি?
মেজবাবু বেণীকে ডাকেন।—দেখে আয় তো বেণী, ছুটুক নিচে নামলো কিনা?
সেদিন ছুটুকবাবুর সঙ্গেও দেখা হয়ে গিয়েছিল। ভূতনাথই জিজ্ঞেস করলে প্রথমে-কেমন আছেন ছুটুকবাবু?
হালচাল এই কয়েকদিনের মধ্যেই বদলে গিয়েছে ছুটুকবাবুর। বৈঠকখানা ঘর থেকে গানের শব্দ আর কানে আসে না। ছুটুকবাবু যেন অদ্ভুত সৃষ্টি এ-বাড়ির। এর আগেও বিয়ে হয়েছে এ-বাড়ির পুরুষদের। কিন্তু বিয়ের আগেও যা বিয়ের পরেও তাই। ছোটকর্তা কৌস্তুভমণি চৌধুরী ফুলশয্যার রাত্রে বাড়ি ফিরেছিল রাত বারোটার সময়। একলা একলা অপেক্ষা করে করে যখন ঘুমিয়ে পড়েছে পটেশ্বরী বৌঠান, তখন সোরগোল তুলে বাড়িতে ঢুকতে লজ্জা হয়নি ছোটকর্তার। মুখে দুর্গন্ধ, টলছে। নতুন-বৌ-এর সঙ্গে একঘরে এক রাত্রি কাটিয়েছে বটে। ঘরে ঢুকে খিল বন্ধও করেছে। কিন্তু কানাঘুষো চলেনি সেজন্যে বড়বাড়িতে। অনুযোগ শুনতে হয়নি দশ বছরের কনে-বউ পটেশ্বরী বৌঠানের কাছে। বৈদূর্যমণি চৌধুরীও কাঁচা বয়েসে কমতি ছিলেন না কিছু। বড়মাকে দেখলে সেদিনকার কনে-বউকে আজ হয় তো চিনতে পারা যাবে না। দুধের মতো শাদা ধবধবে গা। বৌভাতের রাত্রে সবাই হাঁ করে বসে আছে। কখন আসবে বর। তখনও দেখা নেই বৈদূর্যমণির। তারপর খোঁজ পড়লো সারা কলকাতায়। শেষে পাওয়া গেল রামবাগানের এক বাড়িতে। সাহেব বীণার ঘরে। সাহেব বীণা ছিল রামবাগানের মেয়েমানুষ। সাহেবদের মতো গায়ের রং তার। সেখানে পাওয়া গেল বড়বাবুকে অজ্ঞান অচৈতন্য অবস্থায়। ভূমিপতি চৌধুরীর বংশের ওপর সেজন্যে বদনাম হয় নি সেদিন। মাথায় বরফ দিয়ে, জ্ঞান ফিরিয়ে তবে ফুলশয্যার আয়োজন হয়েছে তাঁর। বড়মা তখন ছোট। বোঝবার বয়েস না হলেও সেকথা ভেবে চোখের জল পড়ে নি তার কোনো দিন। তারপর যেদিন রাজবাহাদুর হয়েছেন, নাম যশ হয়েছে খুব, সাহেববো এসেছে, খোদ লাটসাহেব নিজে এসেছে খানা খেতে, চীনে-অর্কিড উপহার নিয়ে গিয়েছেন, সেদিন গর্বে বুকটা দশ হাত হয়েছে বড়মা’র। আর মেজবাবু! হিরণ্যমণি চৌধুরী। হিরণ্যমণি চৌধুরীর আর একটাতে কুলোয়নি। একরাশ মেয়েমানুষ নিয়ে রাসলীলা করেছেন, মোসাহেব পুষেছেন, গঙ্গায় পানসি ভাসিয়েছেন দলবল নিয়ে, খড়দ’র রামলীলার মেলায় গিয়ে মাতলামি করেছেন, পায়রা নিয়ে ছেনি দত্তর সঙ্গে মামলা করেছেন, কাশী-লক্ষ্মৌ থেকে বাঈজী আনিয়ে নাচ দেখেছেন, মুজরো দিয়েছেন, আবার খেয়াল হলো তো বরানগরের বাগানবাড়িতে একপাল মেয়েমানুষ নিয়ে গিয়ে কানামাছি ভোঁ ভোঁ খেলেছেন কখনও কখনও শ্রীকৃষ্ণের বস্ত্রহরণের আধুনিক অভিনয় করেছেন। এ-সব ব্যাপারে সুনাম বই দুর্নাম হয়নি। বাবু সমাজে তাতে তার খ্যাতি প্রতিপত্তিও বেড়েছে বৈ কমেনি!
কিন্তু ছুটুকবাবু যেন সৃষ্টিছাড়া।
দেখা হতেই ভূতনাথ বললে-আজকাল আপনাকে দেখতে পাই না মোটে—গানের আসরও আর বসে না আপনার।
ছুটুকবাবু গাড়ি থেকে নামছিল। হাতে বই। কলেজ থেকে ফিরছে হয় তো। বললে—সামনে এগজামিন কিনা—একটু পড়াশুনোয় মন দিয়েছি ভূতনাথবাবু। তা আসছে দোলের দিন ভাবছি একটু গান বাজনার ব্যবস্থা করবো।
ভূতনাথ বললে—এখন আবার কীসের পরীক্ষা?
—এ্যাটর্নীশিপটা দিচ্ছি কিনা—বড় শক্ত পরীক্ষা—বিয়েতে অনেকদিন সময় নষ্ট হয়ে গেল, কিছু পড়তে সময় পাইনি।
ওইটুকু মাত্র কথা হয়েছিল একদিন। কোথায় কোন্ ঘরে বসে পড়ে ছুটুকবাবু, কে জানে।
বংশী বলেছিল—আপনি তত আমার ভাইটার একটা কিছু হিল্লে করে দিতে পারলেন না ছুটুকবাবুকে বলে—কী যে করি।
ভূতনাথ বলেছিল-শশীর জায়গাটা এখনও খালি আছে নাকি বংশী, এ্যাদ্দিন বলেনি কেন আমাকে?
—আজ্ঞে, সে-চাকরি আর খালি নেই শালাবাবু, ভর্তি হয়ে গিয়েছে লোক।
—কে ভর্তি হলো শেষ পর্যন্ত?
—সে মধুসূদনের লোক নয় শালাবাবু, ছুটুকবাবুর শ্বশুরবাড়ি থেকে লোক এসেছে। এবার আর এ-বাড়ির লোক রাখবে না ছুটুকবাবু বলেছে।
-এ-বাড়ির লোকের ওপর অত রাগ কেন বলো তো ছুটুকবাবুর?
বংশী বললে—ছুটুকবাবু একটু আলাদা ধরনের লোক শালাবাবু, যা বলবো সত্যি কথা আজ্ঞে। দেখেন না দিন রাত কেবল শ্বশুরবাড়ি যান, আর ছুটুকবাবুর শ্বশুরমশাইও কম নাকি—কেবল এবাড়িতে এসে দিন রাত জামাই-এর সঙ্গে গুজুর গুজুর গল্প—কানে ফুস্ মন্তর দিচ্ছে খালি।
ভূতনাথ বললে—হাবুল দত্তর কথা বলছে!
-আজ্ঞে, দত্ত মশাইরা তো তেমন বনেদী ঘর নয় কলকাতার, মেজবাবুর তাই তেমন ইচ্ছে ছিল না ওখানে বিয়ে দিতে, কিন্তু বড়মা’র মেয়ে পছন্দ হয়ে গেল। বললে—ওখানেই বিয়ে দিতে হবে—সৈরভী ঘটকী একদিন মেয়ে নিয়ে এসেছিল বড়বাড়িতে পাকা ঘটকী কিনা। ওইটুকু মেয়ে এসেই বড়মাকে একেবারে মা বলতে শুরু করেছে। ঘুর ঘুর করে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাড়িময়—সব যেন আপন করে নিলে একদণ্ডে।
