বিধু সরকার বললে–বিদ্যেবুদ্ধি থাকলে তুমিও আর ঘড়ি দম দিয়ে জীবন কাটাতে না, খাজাঞ্চীখানায় পোদ্দারি করতে আমার মতন।
বদরিকাবাবু এবারও শান্ত কণ্ঠে বললে—ভাগ্যিস খাজাঞ্চীখানার পোদ্দার হইনি।
—তা কেন হবে ঘড়িবাবু, তাতে যে বিদ্যেবুদ্ধির দরকার লাগে।
–তা লাগুক কিন্তু ধর্ম থাকে না।
বিধু সরকার,এবার ক্ষেপে লাল হয়ে উঠলো। বললে—আমার ধর্ম নেই বলতে চাও! বাবুদের ধর্মের পয়সা—আমি অধর্ম করলে বাবুদের জমিদারী কি টিকতো এ্যাদ্দিন?
—এই যে জমিদারী আর টিকছে না, সে তত তোমার জন্যেই বিধু।
—তার মানে? বিধু সরকার মারমুখী হয়ে উঠলো।
–তার মানে ঘড়ি আর চলবে না, আমি হাজার দম দিলেও আর চলবে না, একদিন দেখবে আমার টাক ঘড়িটাও পট করে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অত বড় আলমগীর বাদশা তাই-ই রইল না, সীতারাম, আবুতোরাপ, রেজা খাঁ, ঈশা খাঁ কেউ রইল না—তোমার বাবুদের জমিদারী তো কোন ছার তার কাছে—আর তাছাড়া এবার এই তো এসে গিয়েছে–
—কী এসে গিয়েছে শুনি?
-এই যে—বলে মোটর গাড়িখানাকে দেখিয়ে দিলেন বদরিকাবাবু।
—মোটর গাড়ির দাম কত জানো ঘড়িবাবু, এ তোমার ঘড়ি নয়।
—দামী জিনিষ বলেই তো যাবে, দর্পনারায়ণ যখন জেলখানায় তখন একদিন রাত্রে এক সাধু জেলখানার ভেতরে এসে হাজির। চল্লিশদিন না-খাওয়া না-দাওয়া, মুর্শিদকুলী খাঁ তাকে খুন করে তবে শান্ত হবে প্রতিজ্ঞা করেছে। তা সেই সাধু এসে বললে—ধর্ম চাও না জীবন চাও-যা চাও তাই পাবে। দর্পনারায়ণ বললেন-ধর্ম! সাধু চলে গেল! আবার পনেরো দিন পরে সাধু এল। তখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন দর্পনারায়ণ। এক ফোটা জল। এক কণা ভাত। সেই অবস্থায় আবার সেই প্রশ্ন। সেবারও দর্পনারায়ণ আবার বললেন—ধর্ম। তারপর যেদিন জেলখানার মধ্যে মারা গেলেন সেই রাত্রে আবার সেই সাধু এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন–ধর্ম চাও, না জীবন। তখন দর্পনারায়ণ সেই একই উত্তর দিয়েছিলেন। আমি সেই দর্পনারায়ণের শেষ বংশধর—কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। তুমি বাবুদের ধর্মের পয়সায় ক’টা তৌজি আর কটা তালুক কিনেছে। এ পর্যন্ত বিধু?
এতক্ষণ যাকে নিয়ে এত গণ্ডগোল সে কিন্তু কখন ঘটনাস্থল থেকে সরে গিয়েছে। হঠাৎ ইব্রাহিম সামনে এসে দাঁড়ালো। বললে—যানে দিজিয়ে ঘড়িবাবু।
ইব্রাহিমকে হঠাৎ সামনে দেখে বদরিকাবাবু বললে—এই যে এসে গিয়েছে দেখছি—তুমি ক’মাস মাইনে পাওনি ইব্রাহিম সাহেব—বলল তো?
—দো মাহিনা।
বিধু সরকার হঠাৎ চিৎকার করে উঠলো—মেজবাবুকে আমি আজই বলছি গিয়ে, ঘড়িবাবু সকলকে ক্ষেপাচ্ছে। আর চাবুক মেরে আজ সবাইকে তাড়াবার ব্যবস্থা করছি।
বদরিকাবাবু বিধু সরকারকে শুনিয়ে বলে উঠলো—তাতে কিন্তু তোমার জাত ফিরবে না—তুমি মুসলমানের থুতু খেয়েছে বিধু, মনে থাকে যেন।
রাগে গরগর করতে করতে চলে গেল বিধু সরকার।
কিন্তু বদরিকাবাবুর কথা ফললো দু’দিন বাদেই।
একদিন সেই সাহেবটা আবার এল। সাহেব আসার খবর শুনে কিন্তু সেদিনকার মতো মেজবাবু আর নেমে এল না। সাহেবকে ওপরের নাচঘরে নিয়ে গিয়ে খানাপিনাও হলো না। সাহেব বুট পায়ে দিয়ে গট গট করতে করতে এসে গাড়ি চালিয়ে নিয়ে ভোঁ-ভোঁ করতে করতে চলে গেল। আর ফিরে এল না।
যেদিন গাড়ি প্রথম এসেছিল বড়বাড়িতে, সেদিনও ইব্রাহিম কিছু বলে নি। আজও দোতলার বারান্দায় নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলো খালি!
আর সন্ধ্যেবেলা যথারীতি বড় গাড়িটা নিয়ে দাঁড়ালে গিয়ে গাড়ি বারান্দার নিচে। ইয়াসিন এসে হাতে চাবুকটা ধরিয়ে দিলে। মেজবাবু উঠলো। বড়মাঠাকরুণ পানের ডিবে হাতে নিয়ে উঠলো। তারপর মেজমাঠাকরুণ উঠলো। হাসিনী উঠলো।
পেছনের গাড়িতে ভৈরববাবু, মতিবাবু, তারকবাবু উঠলো। আর উঠলো গোটাকতক বোতল, খাবারের চাঙারি, বরফ, সোডার সরঞ্জাম, আরো কত কি, ড়ুগি-তবলা, হারমোনিয়ম, ঘুঙুর।
ব্রিজ সিং গেট খুলে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো—হুঁশিয়ার–হুঁশিয়ার হো–
ইব্রাহিম লাগাম ধরে গাড়িখানাকে বনমালী সরকার লেন পার করে একেবারে বৌবাজার স্ত্রীটে পৌঁছে দিলো।
গাড়িটা এলই যদি তবে গেলই বা কেন!
মধুসূদন বলে—গাড়িটা পছন্দ হয় নি মেজবাবুর।
লোচন বলে—মেজবাবু বললে আরো বড় গাড়ি কিনবে—
লোচনের ঘরে হুঁকোটা টানতে টানতে ভৈরববাবু বললে-না রে, তা নয়—মেজবাবু বলেছে—ও কালো রংটা পছন্দ নয়, বড় চোখে লাগে-ময়ুরপঙ্খী রং চাই, বিলেত থেকে ময়ুরপঙ্খী রং-এর নতুন গাড়ি জাহাজে করে আসছে–এই এল বলে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—গাড়ি সত্যিই আসবে নাকি বংশী?
–আজ্ঞে, আর এসেছে, দেখেন না রোজ ছুটুকবাবুর শ্বশুর আসে।
—কেন আসে?
ভূতনাথও দেখেছে। বিয়ে হবার পর প্রথম-প্রথম তেমন আসতো না। কিন্তু ইদানীং হাবুল দত্ত বড় আসা-যাওয়া শুরু করেছে। হাবুল দত্তর মোটরগাড়ি নেই। ঘোড়ার গাড়ি করেই আসতত প্রথম-প্রথম। যেবার কনে-বউ পাথুরেঘাটায় যায়, হাবুল দত্তর গাড়িতে যায়। আসে বড়বাড়ির গাড়িতে। আজকাল হাবুল দত্ত ট্রামে চড়েই আসে। লোহাপটি থেকে ঘেমে নেয়ে কাজ সেরে একেবারে এসে হাজির।
ভৈরববাবু বলে—ট্রামে এলেন নাকি বেয়াই মশাই?
-হ্যাঁ, ট্রামেই এলাম বৈ কৈ!
–খুব কষ্ট হলো-পয়সা নিলে?
—সাত পয়সা—তোফ আরামে এলাম।
—কিন্তু ট্রামে—যা-ই বলুন-ইজ্জত তেমন নেই।
মেজবাবু হঠাৎ আসরে ঢুকলেন—সঙ্গে সঙ্গে আতরের গন্ধে ভুর ভুর করে উঠলো ঘরটা। বিকেলবেলা ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে নেমেছেন একেবারে। গোঁফজোড়া সরু ছুঁচলো করেছেন মোম লাগিয়ে। লোচন এসে তামাক দিয়ে গেল পাশে। ফুঁ দিয়ে ধোঁয়াও বার করে দিয়ে গেল। নল টানতে টানতে বললেন–ইজ্জতের কথা কী যেন বলছিলে ভৈরববাবু?
