ভূতনাথ কেমন যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল।-বলে কী বংশী?
—আজ্ঞে, ঠিকই বলছি শালাবাবু।
—পাওনি কেন মাইনে?
—সে-কথা আর জিজ্ঞেস করবেন না শালাবাবু—অনেকেই পায়নি—আমাদের মতো যারা ছোটমা’র দলে।
–ছোটমা জানে সে কথা?
—ছোটমাকে দেবতার মতন ভক্তি করি শাবাবু, আপনি জানেন কি না জানি না, সারাজীবন কষ্ট করতেই আমার ছোটমা’র জন্ম, স্বামী পেলে না, সংসার পেলে না, আর বলতে দুঃখও হয়, এত বড় বাড়ির বউ হয়েও মেয়েমানুষের যা সব চেয়ে বড় সাধ তাই-ই পূণ্য হলো না। এক-এক সময় তাই তো সন্দেহ হয়— মাইরি বলছি শালাবাবু—ভগমান কি আছে! মেজমা বড়মা তবু তো ভাগ্যি করে এসেছিল—ছোটমা’র মনেও তো সাধ আছে।
–কী সাধ বংশী?
–ছেলে! একটা ছেলের সাধ! তা তো হলো না-আর হবেও না। তা ওকে সেই জন্যে মাইনের কথা বলে আর কষ্ট দিতে চাইনে শালাবাবু। দেখলেন না, সেদিন হাওয়া-গাড়িটা নিয়ে কি কাণ্ড হলো?
হাওয়া-গাড়িটার কথা মনে আছে ভূতনাথের। কী চমৎকার গাড়ি। বেছে-বেছে সব চেয়ে বড় গাড়ি কিনেছিল মেজবাবু! সে গাড়ির কী বাহার! শেঠ, শীল, মল্লিকদের বাড়িতেও অমন গাড়ি ওঠেনি! ছেনি দত্ত তখন বেঁচে নেই। থাকলে আর একবার বুক কাটতো বড়বাড়ির ঐশ্বর্য দেখে! সাহেব মেজবাবুর সঙ্গে নাচ ঘরে গিয়ে বসলো। খানাপিনার বন্দোবস্ত হলো। গাড়ি যখন বাড়িতে ঢুকলে তখন সকাল। আর সাহেব যখন গেল তখন ভর সন্ধ্যে। ঠিক সোজা হয়ে আর চলতে পারছে না পা ফেলে। ওদিকে অনেক রাত পর্যন্ত গাড়ির আস্তাবলে ছেলে-পিলে আর লোকজনদের ভিড়! দেখে আর আশ মেটে না কারো।
কে একজন বললে—ঠিক যেন আর্শির মতো মুখ দেখা যায়—না রে?
সবাই মুখ দেখে। আবছা-আবছা চেহারা দেখা যায়।
কে একজন আর বুঝি কৌতূহল না চাপতে পেরে এবারের বেলুনটা টিপে দিয়েছে আর গাঁক করে শব্দ হয়েছে একটা। আর সঙ্গে সঙ্গে হৈ-চৈ পড়ে গিয়েছে চারিদিকে।
–কে হাত দিচ্ছে গাড়িতে—কে রে?
দৌড়ে এল মধুসূদন। লোচন। বিধু সরকার।
মেজবাবু পই পই করে বলে দিয়েছে—কেউ যেন হাত না দেয়। নতুন গাড়ি, একটু নখের আঁচড় লাগলেই ছাপ লেগে যাবে। এ তোমার ল্যাণ্ডো, ফিটন, হাম নয় যে দাগ লাগলো আর সারিয়ে নিলাম ব্রাইটন কোম্পানীর কারখানা থেকে। এ খাস বিলিতি জিনিষ। এখানে আর সারানো যাবে না। কল বিগড়ে গেলে পাঠাতে হবে খাস বিলেতে। সেখানে সাহেব মিস্ত্রি সারাবে তৰে আবার চলবে।
বিধু সরকার এক ধমক দিলে-বেরো সব এখেন থেকে, বেরো।
ঝি-চাকর আরো অন্য কর্মচারিদের ছেলেমেয়েরা তাড়া খেয়ে পালালো। দাসু মেথরের ছেলেটা দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিল। সে ছোঁয়ওনি গাড়ি। ছোঁবার সাহসও তার নেই। দাসু নিজেও ছেলেমেয়ে পরিবার নিয়ে গাড়ি দেখতে এসেছিল। এক সময়ে সবাই আবার ফিরে চলেও গিয়েছে। তার ছোট ছেলেটা কেবল শেষ পর্যন্ত রয়ে গিয়েছে। লোভ সংবরণ করতে পারেনি আর কি?
বিধু সরকার তাকেই ধরতে গেল। কিন্তু ধরতে গিয়েই চিনতে পেরে যেন থমকে দাঁড়ালো। মেথরের অস্পৃশ্য ছেলেকে সন্ধ্যেবেলা ছুলে আবার স্নান করতে হবে। এক ধমক দিলে বিধু সরকার—বেরো ছোঁড়া-হারামজাদদূর হ! ইত্যিজাতের আবার শখ দেখো না!!
দাসু জমাদারের ছেলে সরকারবাবুকে দেখেই যে কেঁদে ফেলেনি তাই যথেষ্ট। তার ওপর আবার ধমকানি। কিন্তু পাশেই ছিল আর একটা ছেলে। সেও পালায়নি। শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। হাতের কাছে তাকে পেয়েই কান ধরে হিড়হিড় করে টানতে লাগলো বিধু সরকার।-কে রে তুই? কাদের ছেলে?
ছেলেটা জবাব দেয় না তবু।
লোচন পাশ থেকে বললে—ও ইব্রাহিমের ছেলে সরকারবাবু।
এক থাপ্পড় মেরে বিধু সরকার মুখ খিচিয়ে উঠলো—যেমন বাপের ছিরি, ছিলি যোধপুরের রাজার পিলখানার আস্তাবলে, মরতে আর জায়গা পেলিনে—এবার যা আবার মরতে সেখানে এখন তো বাবুদের মোটর এসেছে, এখন কী চাকরি করবি কর।
কিন্তু ছেলেটাও জাহাবাজ বলতে হবে বৈ কি! ওইটুকু এক রত্তি ছেলে। যেন কেউটের বাচ্ছা। কাঁদলে না, কিছু না। গালাগালিও দিলে না প্রাণ ভরে। করলে কি এক দলা থুতু মুখ থেকে থুঃ করে ফেললে বিধু সরকারের মুখে!
আর যায় কোথায়। আগুনে যেন ঘি পড়লো। বিধু সরকারকে তখন দেখবার মতো। ওই তো চিমড়ে শরীর। শুকনো কাঠটি। কী লম্ফ ঝম্ফ! হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা! সারা বাড়ি থরহরি কম্পমান। যারা গাড়ি দেখতে আসেনি সকালে, এবার তারাও এল। না হয় না-ই বা হলো বামুন, তবু মুসলমানের থুতু তো! ধর্মটাই তো গেল চিরকালের মতো। ডাকো ইব্রাহিমকে! ডাকো তার গুষ্টিবর্গকে! ইব্রাহিমের চাকরির তখন টলোমলো অবস্থা। এখন যায় তখন যায়।
শেষে গোলমাল শুনে বদরিকাবাবু পর্যন্ত এসে হাজির। কী হলো রে? মোটা সোটা মানুষ। এতটুকু আসতেই হাঁফিয়ে পড়েছে। খালি গা। টাক ঘড়িটা ট্যাকে নিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ালো। সবিস্তারে শুনলে সব। তারপর বললে—গোবর খাও বিধু, জাত ফিরে আসবে।
বিধু সরকার রেগে গেল–তুমি থামো দিকি ঘড়িবাবু, নাস্তিক কোথাকার! মুর্শিদকুলী খাঁ’র এটো খেয়ে মানুষ—জাতের মর্ম তুমি কি বুঝবে শুনি!
বদরিকাবাবু হাসতে লাগলো—আমি তো জাত মানিনে বিধু—সবাই জানে।
-তা আমি জানি, তুমি হি দুও নয়, বেহ্মও নও, মোছলমানও নও, তুমি অধার্মিক, জোচ্চোর।
বদরিকাবাবু শান্ত স্বরে বললেজাত মানিনে বলে ধর্ম মানিনে, তা তো নয় বিধু। তোমার বিদ্যেবুদ্ধি থাকলে বুঝতে পারতে ধর্ম আর জাত দুটো আলাদা জিনিষ।
