—হ্যাঁ, শালাবাবু, আমিও শুনে কতকটা অবাক হয়ে গেলাম। একে তো ছোটমা কোথাও বেরোয় না, তার ওপর সঙ্গে ঝি-চাকর কেউ যাবে না, এ কেমন ধারা কথা! এ বাড়ির কর্তারা যা করে করুক, গিন্নীরা একটু বে-এক্তিয়ার কিছু করলে সমস্ত মহলে টি-টি পড়ে যায় আজ্ঞে। ছোটকর্তার কানে গেলে কি আর রক্ষে থাকবে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে—তা, তারপর?
-তারপর আজ্ঞে, আপনাকে খুজলুম সমস্ত বাড়িময়, মাস্টারবাবুর ঘরে দেখলাম, যেমন তালা দেওয়া, তেমনি তালা লাগানো রয়েছে। বারবাড়ি, ভেতরবাড়ি, আপনার চোরকুটুরি—ছুটুকবাবুর বৈঠকখানা দেখলুম—তা বৈঠকখানা ফাঁকা। ছুটুকবাবুর বিয়ের পর তো আর তেমন আগের মতো গানের আসর বসে না এখন। দেখলাম তোষাখানা, জিজ্ঞেস করলাম শোচনকে—শালাবাবুকে দেখেছিস? কত জায়গায় দেখলাম—কেউ বলতে পারলে না আজ্ঞে। ছুটে গিয়ে আবার বললাম ছোটমাকে–শালাবাবু কোথাও নেই।
ছোটমা বললে—সব জায়গায় দেখেছিস?
বললাম—কোনো জায়গা আর বাকি রাখিনি খুজতে—তা কালকে কোথায় সারাদিন ছিলেন আজ্ঞে আপনি?
ভূতনাথ বললে—চাকরির জন্যে সারাদিনই তো ঘুরি—আর বাড়িতে এসেই বা করবো কী!
—তা রাত তখন দশটা—তখন আবার ছোটমা ডাকলে। বললে—ভূতনাথ এসেছে?
বললাম–না, এখনও আসেনি তো।
ভূতনাথ বললে—তারপর?
—তারপর আর কি? সারারাত ছোটবাবু মদ খেয়েছে নিজের ঘরে। আমার এতটুকু ঘুম হয়নি—আর চিন্তারও সেই দশা, ছোটমাও ঘুমোয়নি সারা রাত—কেবল নাকি মদ গিলেছে। কী যে হলো কে জানে শালাবাবু! কেন যে অত কথা কাটাকাটি, তারও মানে বুঝলুম না। বেশ ছিলো ক’মাস, ছোটমা’র মুখে হাসি সারাদিন লেগেই আছে, বমি করে দু’একবার ঘর ভাসিয়েছে বটে, কিন্তু তবু মনে শান্তি ছিল, ছোটবাবুও যেন বেবাক বদলে গিয়েছিল—নিয়ম করে খাওয়া-দাওয়া হচ্ছিলো—এখন কী যে হবে?
ভূতনাথ বললে—কিন্তু কেন এমন হলো—বৃন্দাবন কি ছোটবাবুর সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করেছিল ইদানীং?
—কী জানি শালাবাবু, আমি তো বিন্দাবনকে দেখলে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছি-বলেছি এবার বড়বাড়ির কাছে এলে ঠ্যাং খোড়া করে দেবো তোর, কিন্তু তবু লুকিয়ে চুরিয়ে আসে এদিকে। ওই যে মধুসূদন কাকাকে দেখেন না, ওরা সবাই যে বিন্দাবনের দলেও দলে অনেকে আছে, সবাইকে আমি চিনি, সরকার মশাইও কম যান না, ওই বিধু সরকার—বিন্দাবন যে ওদের হাত করেছে। ভেতরে ভেতরে ওরা কী মতলব আঁটছে কে জানে, আজ সকালে উঠে ছোটবাবু বললে—গাড়ি তৈরি রাখতে বলিস বংশ সন্ধ্যেবেলা জানবাজারে যাবে। তা সেই সকাল থেকে তোড় জোড় করছি আজ্ঞে—গাড়ি ধোয়ামোছার ব্যবস্থা, কাপড় কুঁচোনো, আতর বার করাও সবের পাট তো এতদিন তেমন ছিল না,…অনেকক্ষণ কথা বললাম আপনার সঙ্গে-আজকে ছোটবাবু না বেরোনো পর্যন্ত আমার আর ফুরসত নেই শালাবাবু।
বংশী চলে যাচ্ছিলো। হঠাৎ আবার ফিরলো। বললে—আর একটা কথা
ভূতনাথ বললে—কী?
-আজ কিন্তু ছোটমা সকালবেলাই খবর নিয়েছে আপনার। বললে—ভূতনাথ এসেছে?
আমি বললাম—কাল অনেক রাত্তিরে এসেছিল শালাবাবু দেখা হয়নি আমার সঙ্গে দেখা হলেই বলবো।
ছোটমা বললে—দেখা হলে নয়, দেখা করবি, বিকেল বেলা যেন কোথাও না বেরোয় আজ—ছোটবাবু জানবাজারে বেরিয়ে যাবার পরই আমি বেরোবো। ভূতনাথ সঙ্গে থাকবে আমার—তা আপনি যেন কোথাও বেরোবেন না হুজুর—তা হলে খেয়ে ফেলবে আমাকে ছোটমা।
ভূতনাথের কেমন যেন ভয় হলো। পটেশ্বরী বৌঠানের সঙ্গে আড়ালে যত ঘনিষ্ঠতাই থাক, তার সঙ্গে প্রকাশ্যে গাড়িতে করে যাওয়া সে কেমন দেখাবে। এ-বাড়ির চোখে অস্বাভাবিক ঠেককে না! তারপর চারিদিকে এত শত্রুতা! কোথাও যদি কোনো কথা ওঠে, ছোটমা হয় তো পার পেয়ে যাবে। আর মাঝখান থেকে আশ্রিত ভূতনাথ, আত্মীয় নয়, স্বজন নয়, বন্ধুবান্ধব কেউ নয়—সে নিজেকে ঠেকাবে কেমন করে? এ-বাড়িতে তার কতটুকু পরিচয়! কীসের অধিকার। ব্রজরাখাল তো কবে কতদিন আগে এ-বাড়ির আশ্রয় ছেড়ে চলে গিয়েছে। ব্রজরাখাল থাকলে না হয় তবু কথা ছিল। সে যে আশ্রিতের আশ্রিত! কত সুদূর সম্পর্ক। তাও আপন ভগ্নীপতি নয়। শুধু ছোটমা’র কৃপার পাত্র সে! সেইটুকুই যা ভরসা। কিন্তু ভয়ও তো আবার সেই কারণেই। এ-বাড়ির অসূর্যষ্পশ্যা বন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্কটা তো অসামাজিক, অবৈধ, বে-আইনী। তারপর আরো একটা কথা ভাববার আছে। ছোটকর্তার সঙ্গে ছোটবৌঠানেরও সদ্ভাব নেই। তা ছাড়া ছোটবৌঠান হয় তো অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় কী কাণ্ড করে বসবে কে জানে। সেদিন যেমন কাণ্ড করেছিল। টানাটানিতে কাচের বোতল চুরমার হয়ে যাবার পর সেই উন্মাদের মতো হাসি! রাস্তায় গাড়ির মধ্যে যদি তেমন কোনো ঘটনা ঘটে। তখন কেমন করে সে পালাবে! অথচ এতখানি অনুগ্রহ পেয়েছে বলে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করাই তো উচিত! যেদিন সে ব্ৰজরাখালের চিঠি পেয়ে বনমালী সরকার লেন-এর ভেতরে বড়বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সেদিন কে ভাবতে পেরেছিল এমন করে এত ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠবে এ-বাড়ির ছোটবউ-এর সঙ্গে।
ভূতনাথ জিজ্ঞেস করলে আবার কিন্তু তোমার কী মনে হয় বংশী—আমার যাওয়া উচিত?
—আপনি লেখাপড়ি শিখেছেন আজ্ঞে—আপনাকে কী বলবো শালাবাবু।
—তবু তুমি তো এ-বাড়ির হালচাল জানো কতকটা?
—আমি শালাবাবু, আমার জন্মে এমন কাণ্ড দেখিনি, শুনিনি। এ-বাড়িতে বউরাণীরা যদি কখনও বেয়োয় তো খিড়কীর দরজা খুলে পাল্কি করে যায় তারা। আগে পেছনে পেছনে ঝি-এর সঙ্গে সঙ্গে দৌড়তে দৌড়তে যেতো, তা-ও কালে ভদ্রে পালা-পাব্বণে। এদানি গাড়ি হয়েছে, পাল্কি গাড়ির দরজা জানালা বন্ধ করে তবে গিয়েছেযেমন মেজমা বাপের বাড়ি যায়, আগে তাও মানা ছিল—আর গাড়ি থেকে নামবার সময় চারদিকে মশারির মতন চাদরের ঢাকা পড়ে যেতো—কিন্তু এমন কখনও শুনিনি। ছোটমা তো আর মেজমা নয়—ছোটমা এ-বাড়ির আলাদা ধরনের মানুষ আজ্ঞে। অত অভিমানও যেমন কারো নেই, অত ভালোবাসতেও কেউ জানে না এই যে তিন মাস আমরা ভাইবোনে মাইনে পাইনি কেউ, তবু তো আছি এখানে বুক ঠুকে।
