ছোটবাবু কিন্তু থামলো না। বললে—থামলে কেন, বলল–কিন্তু কী…
ছোটমা হঠাৎ এতক্ষণ পরে গেলাশটা উপুড় করে সমস্তটা টক ঢক করে গিলে ফেললে। আমি জানালার ফাঁক দিয়ে দেখতে লাগলুম। বিষ খেলে বুঝি মানুষের মুখের চেহারা ওইরকমই হয়। চোখ, মুখ, কান, নাক দিয়ে ছোটমা’র যেন আগুন বেরোতে লাগলো শালাবাবু। ঘোটবাবু আমার মনিব, কিছু বলতে পারিনে, কিন্তু মনিব না হলে কী যে করতুম বলা যায় না।
তারপর খিল খিল করে পাগলের মতন হেসে উঠলো ছোটমা! আমার মনে হলো ছোটমা হাসছে না, যেন কাঁদছে। অন্তত মনে হলো ছোটমা যেন খানিকটা বুক ভরে কাঁদতে পেলেও ঠাণ্ডা হতো। সে কী মজার হাসি। যেন মাতালের মতো, পাগলের মতো হাসি। সে-হাসি আর থামতে চায় না শালাবাবু। হেসে ছোটমা গড়িয়ে পড়লো বিছানার ওপর।
ছোটবাবু তখন ছোটমা’র কাণ্ড দেখে অবাক হয়ে গিয়েছে। মদ খেয়ে মেয়েমানুষের কী রকম নেশা হয়, তা ছোটবাবু খুব ভালো রকমই জানে। তবু ছোটমা’র মতো কাণ্ড যেন আর দেখেনি ছোটবাবু। পালঙ-এর কাছে গিয়ে বললে-কী হলো, হাসছো কেন এত?
ছোটমা মুখ তুললল। ছোটবাবুর চোখে চোখ রাখলে খানিকক্ষণ। তারপর আবার হেসে গড়িয়ে পড়তে লাগলো। বললে —তুমি মেজদিদির সঙ্গে তুলনা করলে আমার—আমি গয়না ভাঙবো আর গয়না গড়াবে আর বাঘবন্দি খেলবে ঘরে বসে!
ছোটবাবু বললে-কেন, কী অন্যায়টা বলেছি—চিরকাল ধরে, ঠাকুরবাবার বাবার আমল থেকে তাই তো হয়ে আসছে, কেউ তো আপত্তি করেনি। কর্তারা মদ খেয়েছে, পায়রা পুষেছে, মেয়েমানুষ রেখেছে, বউদের গয়নাগাটি, শাড়ি, ঝি-চাকর, সব যুগিয়েছে, কেউ আপত্তিও করেনি, আত্মহত্যাও করেনি অপমানে—অপমানও মনে করেনি তাতে—চিরকালই চলে এসেছে তাই–আর আজ হঠাৎ তোমার কথায় সব বদলে যাবে রাতারাতি!
ছোটমা খানিকক্ষণ কিছু কথা বললে না। চুপ করে বিছানায় মুখ গুজে রইল।
ছোটবাবু খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে ঘর থেকে চলে আসছিল।
ছোটমা পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ তুললো। বললে—তুমি বলে যাও—আমার কথার উত্তর দিয়ে যাও।
ছোটবাবু ফিরে দাঁড়ালো। বললে—কিসের উত্তর?
–ওই যে তুমি কেন অন্য বউদের সঙ্গে তুলনা করলে আমার?
—তা তুমি কি আলাদা? তুমি কি সৃষ্টিছাড়া?
ছোটমা যেন বাঘিনীর মতো চিৎকার করে উঠলোহ্যাঁ, আলাদা-আলাদা না হলে আমার এ কপালের ভোগ কেন? আর কেউ এমন করে সর্বস্ব জলাঞ্জলি দিয়েছে, বিশ্ব-সংসারে? হিন্দুঘরের বউ হয়ে এমন করে আর কেউ মদ খেয়েছে—বলো তুমি, তোমায় বলতেই হবে—উত্তর না দিয়ে যেতে পারবে না।
ছোটবাবু গম্ভীর গলায় শুধু একবার বললে–ছোটবউ!
ছোটমা আবার সাপের মতো মাথা তুললো। বললে—কী বলবে বলে?
—মদ আমরাও খাই—কিন্তু নেশা হলে তোমার মতন এমন মাতাল হই না।
ছোটমা বললে—এই কি আমার কথার উত্তর হলো?
—মাতালের কথার উত্তর দিই না আমি—বলে দরজার দিকে ছোটবাবু পা বাড়ালো।
ছোটমা এবার চিৎকার করে উঠলো। বললে-শোনো, আমার কথার উত্তর আমিই দেবো। অন্য বউ-এর সঙ্গে আমার তুলনা করলে তুমি কোন মুখে, ওদের যা আছে, যা ছিল, আমার কি তাই আছে? আমাকে তুমি কি সংসার দিতে পেরেছো-ছেলে দিতে পেরেছো?
হঠাৎ বোমা ফাটলে যেমন চমকে উঠতে হয়, তেমনি চমকে উঠলো যেন ঘরখানা শালাবাবু। কিন্তু যাকে লক্ষ্য করে বলা, সেই ছোটবাবুর কানেও বোধ হয় গেল না কথাটা। গট গট করে বেরিয়ে গিয়েছে তখন ছোটবাবু। আমি অন্ধকারে পাশ কাটিয়ে লুকিয়ে পড়েছি তখন। ঘরের ভেতরে চেয়ে দেখলুম ছোটমা বিছানার ওপর উপুড় হয়ে তখন ফুলে-ফুলে উঠছে। হয় হাসছে নয় কাঁদছে। ঠিক হাসি কি কান্না, তা কিন্তু বুঝতে পারলুম না।
ভূতনাথ বললে—তারপর?
বংশী বললে—তারপর আর কী! কী করবো বুঝতে পারছিলুম না-হঠাৎ ছোটমা ডাকলে—বংশী–
আমি ঘরের মধ্যে গেলাম। বললাম-আমাকে ডাকছে ছোটমা?
ছোটমা বললে চিন্তা কোথায় রে?
বললুম-চিন্তা রাঙাঠাকমা’র কাছে গিয়েছে তোমার খাবারের বন্দোবস্ত করতে।
ছোটমা বললে-বলে দে, আমি খাবো না আজ—আর চিন্তাকে ডেকে দে—এখুনি, বলবি আমার কাপড়-গয়না বার করে দেবে–আর গাড়ি ঠিক করতে বল আমার–আমি বেরুবো।
জিজ্ঞেস করা অন্যায় হবে কিনা ভাবলাম একবার। কখনও তো বেরোয় না ছোটমা। গঙ্গায় চান করতেও যেতে দেখিনি। বরাবর দেখে এসেছি, মেজমা, বড়মা, যদিও-বা বেরিয়েছে পালা-পাব্বণে পাল্কি করে, নয় তো গাড়িতে, কিন্তু ছোটমা কখনও বেরোয় নি। সেই বিয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত এ-বাড়ির বাইরে কখনও পা বাড়ায় নি। ছোটমা’র বাবা মারা যাবার পর একবার যেতে হয়, তা-ও যায়নি। কার জন্যেই বা যাবে। আপন বলতে সংসারে শুধু ছিল বাপ, তা, তা-ও তো কেবল গুরুদেব-গুরুদেব করেই নাকি দিন কাটত। সংসার-ধর্ম সব তার চুকে গিয়েছিল ছোটমা’র বিয়ে হয়ে যাবার পর থেকে। তাই ছোটমা’র কথায় যেন অবাক হলাম শালাবাবু। কিন্তু তবু জিজ্ঞেস করলাম—কোথায় বেরুবে ছোটমা?
ছোটমা রেগেই ছিল। বললে—তোর কাছেও কি তার জবাবদিহি করতে হবে নাকি বংশী?
কথাটা শুনে চলে আসছিলাম। ছোটমা’র গাড়ি তো বহুদিন এস্তোক বাইরে বেরোয় না। সাফ-সুফ করতে হবে, খবর দিতে হবে মিয়াজানকে—কিন্তু ছোটমা আবার ডাকলে—বংশী, শোন।
গিয়ে দাঁড়ালাম কাছে।
ছোটমা বললে—আর দেখ তত ভূতনাথ আছে কি না-যদি থাকে বলবি জামাকাপড় পরে যেন তৈরি হয়ে নেয়—আমার সঙ্গে ভূতনাথ যাবে।
ভূতনাথও অবাক হয়ে গেল—আমার নাম করলে নাকি ছোটবৌঠান?
