–খবরদার শালাবাবু, আপনি যাবেন না, ও-মাগী ডাইনি, ছোটবাবুর হাড়মাষ শুষে খাচ্ছে। এখনও আশা ছাড়ে নি, কেন বাপু, কলকাতা শহরে তো আরো বাবু রয়েছে, ওই তত শীলেরা রয়েছে, ছেনি দত্তর ছেলে নটে দত্ত রয়েছে—ওরা গাড়ি দেবে–মেয়েমানুষের পায়ের শুকতলা চাটবে—তাদের কাছে যা না—বলে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল বংশী।
ভূতনাথ হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে—আচ্ছা, চুনী দাসী সত্যি সত্যি বৃন্দাবনের কে রে বংশী?
বংশী মাথা নেড়ে উঠলোনা শালাবাবু, মহাপ্রভুর দিবি করেছি, সে আমি কাউকে বলবো না কিন্তু এও আমি বলে রাখছি, নরকেও ঠাঁই হবে না বিন্দাবনের, চামারের অধম ওই বিন্দা–নইলে…না, না, আমি দিব্বি গেলেছি—সে আমি বলতে পারবো না শালাবাবু।
ভূতনাথ খানিক চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করলে—কিন্তু ছোটবাবু তাহলে আবার এতদিন পরে কেন জানবাজার যাচ্ছে?
—কী জানি বাবু, চাকর মানুষ, ভদ্দরলোকের মনের কথা কেমন করে বলবে!
—কিচ্ছু শোনোনি তুমি?
—শুনেছি সব, কিন্তু বুঝতে পারি নি কিছু।
–কী শুনলে শুনি?
বংশী বললে—তবে শুনুন, সেদিন ছোটমা’র কাছে গিয়েছি, তখনও সন্ধ্যে হয়নি, দেখি ভেতরে ছোটবাবু, ছোটবাবুকে দেখে আমি আর ঘরে ঢুকলুম না। খুব ঝগড়া হচ্ছে দুজনে তখন—ছোটমা বলছে-আমার কিছু অন্যায় হয়েছে-সত্যি করে বলো তো তুমি।
ছোটবাবু বললে—সে তুমি ঠিক বুঝবে না ছোটবউ-মন্তর পড়ে যাকে বিয়ে করা যায়—তার সঙ্গে ঠিক ফুর্তি হয় না তাতে পুরুষমানুষের ঠিক তৃপ্তি হয় না—বিশেষ করে বড়বাড়ির পুরুষমানুষের।
ছোটমা বললে—কিন্তু তুমি যা-যা বলেছে, সব তো আমি করেছি, তোমার জন্যে ঠাকুর পূজো পর্যন্ত ছেড়ে দিয়েছি, জানোভেবেছি তুমিই আমার ঠাকুর-দেবতা সব–তুমি ছাড়া আর কোনো ঠাকুর-দেবতাকে তত আমি জানি না। আমার যশোদাদুলাল যে, তুমিও সেকত জন্মের তপস্যার ফলে তোমার মতো স্বামী পেয়েছি আমি। তোমার জন্যে আমার কত গর্ব জানো-এ-বাড়ির কোনো বউ যা পারেনি, আমি তাই-ই পেরেছিলুম—আমি তোমাকে পেয়ে হাতে স্বর্গ পেয়েছিলুম জানো।
ছোটবাবু বললে—স্বর্গ-নরকের কথা চিন্তা করবো বুড়ো বয়েসে। এখন এ-বয়েসে ও-সব মাথায় ঢুকবে না ছোটবউ–এই ক’মাস বাড়িতে থেকে হাঁফিয়ে উঠেছি আমি—সমস্ত দিনটা ছটফট করে মনটা।
ছোটমা বললে তোমার জন্যে আমি আরো দামী মদ আনিয়েছিলাম—একটু খাবে?
ছোটবাবু বললে—আমাকে তুমি ভুলিয়ে রাখবার চেষ্টা কোরো না ছোটবউ।
ছোটমা একবার লম্বা করে নিঃশ্বাস নিয়ে বললে—তোমাকে যদি সত্যি-সত্যিই ভোলাতে পারতুম। তারপর মদের বোতলটা খুলতে খুলতে বললে লোকে বলে তোমাকে নাকি বশীকরণ করেছি, তোমাকে যাদু করেছি, কিন্তু মেয়েমানুষের যা কিছু অস্ত্র ভগবান দিয়েছেন, সব তো খাটিয়ে দেখেছি, শিবকে ভোলানো যায়— কিন্তু তোমাকে! তুমি পাথরের দেবতা হলেও বুঝতুম যে, তার তবু একটা মানে আছে, তোমাকে আমি আমার কোলে শুইয়ে তোমার মুখের হাসি দেখেছি—আর কিছু না হোক, যখন কিছু থাকবে না, তখন ওই স্মৃতিটা নিয়েই ভাববো কেবল। তারপর গেলাশে খানিকটা মদ ঢেলে ছোটবাবুর সামনে ধরে ছোটমা বললেনাও-নেবে?
—মদে আমার কখনও অরুচি নেই ছোটবউ–দিচ্ছো খাচ্ছি।
ছোটমা বললে-তুমি একে মদ বলো, আর আমি বলি অমৃত। একদিন মনে আছে কী ঘেন্নাই ছিল মদের ওপর-মাতালের ওপর–কিন্তু এই অমৃতই একদিন তোমাকে আমার কাছে ফিরিয়ে এনেছিল
—একথা আমি ভুলবো না। আমি এখাই এখন কেন জানো?
-কেন?
-তোমার জন্যে, নেশা আমার হয়নি, হবেও না কোনো কালে। নেশা যদি হয়েই থাকে, সে মদের নয়, তোমার ওপর আমার নেশা-তোমাকে ছেড়ে আমি বাঁচবো না। এ-ক’মাসে তোমার ওপর আমার নেশা হয়ে গিয়েছে। তোমার পায়ে পড়ছি— তুমি দিনের বেলা যেখানে যাও-যাও রাত্তিরে আমার কাছে থেকো।
ছোটবাবু বললে-ফুর্তি কি দিনের বেলা হয় ছোটবউ?
ছোটমা বললে—তাহলে এক কাজ করে।
-কী কাজ?
—আমাকে তুমি তোমার বাগানবাড়িতে নিয়ে গিয়ে রেখে দাও। বরানগরে কি খড়দ’য়—কিংবা জানবাজারে আর একটা বাড়ি কেনো—সেখানেই আমি থাকবো।
-এ-বাড়ির বউ হয়ে এ-বাড়ির বাইরে থাকবে?
—তা, তুমি রাত্তিরে এ-বাড়িতে না থাকলে এ-বাড়ি যে আমার কাছে অরণ্য-বরং বাইরে থাকলে তবু তুমি রোজ যাবে সেখানে, রাত্তিরে আমার কাছে থাকবে—এমনি করে তোমার সেবা করবো আমি, তুমি না হয় মনে করবে চুনী দাসীর কাছে এসেছো, আমাব নাম বদলে তুমি নতুন নাম রাখবে, যে-নাম তোমার খুশি, তাতেও আমি রাজী।
ছোটবাবু বললে–কিন্তু তুমি যে এ-বাড়ির বউ—তা কি করে হতে পারে। বড়বাড়ির বদনাম হবে তাতে-এ-বাড়ির বউ হয়েছে যখন, তখন চিরকাল এ-বাড়িতেই থাকতে হবে তোমাকে।
–আর তুমি বাইরে বাইরে রাত কাটালে বুঝি বদনাম হবে না!
-–বরং বাড়িতে রাত কাটালেই বদনাম হবে, যেমন এখন হচ্ছে।
—এ কেমন ব্যবস্থা তোমাদের বাড়ির বলো তো?
–ব্যবস্থা নয়, আইন, এ-বাড়ির আইন এই যে, পুরুষরা বাইরে বাগানবাড়িতে রাত কাটাবে বাইরের মেয়েমানুষ নিয়ে, কিন্তু বাড়ির বউদের সতী হতে হবে। একটু পদস্খলন হলে তার আর ক্ষমা নেই, মার্জনা নেই।
—তাহলে আমি কী করি?
ছোটবাবু বললে—কেন, মেজবৌরাণী, বড়বৌরাণী যেমন বাঘবন্দি খেলে, গয়না ভাঙে, গয়না গড়ায়, তেমনি তুমিও করো–ভাবনা কি তোমার?
ছোটমা খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। কিন্তু তারপরেই সাপের মতন ফণা তুললো-মেজদি আর বড়দি’র সঙ্গে তুলনা করলে তুমি—কিন্তু…বলে হঠাৎ থেমে গেল ছোটমা।
