ছোটকর্তা বললে—না ছোটবউ, আমি দেখছি তোমার নেশা পরে গিয়েছে।
কথাটা বলেই ছোটকর্তা চোখ বুজলো। চেয়ে দেখি, দু’চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। জানিস ভূতনাথ, মানুষটাকে এতদিন আমরা কেবল ভুল বুঝেছি। আসলে বড়বাড়িতে কেউ ওকে বুঝলে না, তাই কাউকেই ও বুঝতে চায় না। ওই তো মেজভাসুর রয়েছেন, তার তো একটা নেশা নয়, দশ রকমের নেশা নিয়ে কাটাচ্ছেন, কিন্তু ছোটকর্তার শুধু জানবাজার, আসলে জানবাজারের চুনীদাসীর ওপর ওর নেশা নয়, ওর নেশাটা বাইরের জিনিষ, ও ভারী অভিমানী, তাই অভিমান করে নেশায় ড়ুবিয়ে রাখে নিজেকে। দেখেছি তো-বাড়িতেও খুব যে মদ খায় তা নয়, বরং আমাকেই খাওয়ায় বেশি—আদর করলে গলে যায়, ভালোবাসা পেলে কৃতার্থ হয়।
ভূতনাথ বললে—কিন্তু বৌঠান সত্যি সত্যিই যদি তোমার নেশা ধরে যায়?
বৌঠান বললে—ওটা নেশা নয় ভূতনাথ, তুই খেয়ে দেখ, তুইও বুঝবি, কেমন যেন একটা আমেজ আসে, সে-সময়ে মনে হয় সকলকে বুঝি ক্ষমা করতে পারি, সকলকে ভালোবাসতে পারি, কাবোর খারাপটা আর চোখে পড়ে না। আমার যোদাদুলাল আমার ছোটকর্তা সব তখন একাকার হয়ে যায়—তোকেও ভালোবাসতে ইচ্ছে করে তখন।
ভূতনাথ বললে কিন্তু এমন করলে—আমার আর এ-বাড়িতে বেশিদিন থাকা চলবে না।
বৌঠানের মুখের ভাব হঠাৎ বদলে গেল।–কেন?
–সবাই বলাবলি করে তোমার সঙ্গে আমার নাকি খুব মাখামাখি, তুমি আমাকে জামা-জুতো-কাপড় কিনে দিয়েছে, বিধু সরকার তত খোরাকির খাতা থেকে আমার নাম কেটেই দিয়েছিল—তুমিই জোর করে…
–বলে নাকি? বৌঠান বসে বসেই যেন সামনের দিকে ঝুঁকে পড়তে লাগলো। তারপর সেইভাবে ঝুঁকে পড়ে ভূতনাথের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল, খানিকক্ষণ। তারপর আর একটু হলেই যেন পালঙ থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যেতো।
হঠাৎ ঠিক সময়ে ভূতনাথ খপ করে ধরে ফেলেছে বৌঠানকে। বললে—এখনি কি সর্বনাশ হতো বলে দিকিনি বৌঠান।
—হাত ছাড়, গায়ে হাত দিসনে বলে বৌঠান নিজের কাপড় সামলে নেবার চেষ্টা করলে একবার।—যা, বেয়রা এখন তুই—বলে বৌঠান আবার বোতল উপুড় করে গেলাশে ঢালতে গেল।
ভূতনাথ বললে—আবার খাবে নাকি তুমি ওই—
—যদি খাই, তোর কি?
ভূতনাথ সামনে সরে এগিয়ে দাঁড়ালো। বললে—আর খেতে পাবে না তুমি!
—জোর নাকি?
-হ্যাঁ জোর, ছোটকর্তার সামনে যা করো। আমি কিছু বলতে যাচ্ছিনে, কিন্তু আমার সামনে আর খেতে পাবে না-বলে ভূতনাথ জোর করে বোতলটা বৌঠানের হাত থেকে কেড়ে নিতে গিয়েই পিছলে পড়ে গেল মেঝের ওপর। আর সঙ্গে সঙ্গে ঝন ঝন শব্দে চুরমার হয়ে গিয়ে ঘরময় ছড়িয়ে গেল কাচের টুকরো। সমস্ত ঘরময় মদের স্রোতে সব ভিজে গেল। কাচের টুকরো লেগে ভূতনাথের হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরতে শুরু করেছে তখন। অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছে ভূতনাথ সেই মুহূর্তে।
কিন্তু আর এক কাণ্ড করে বসলো পটেশ্বরী বৌঠান।
হঠাৎ-কী যে হলো কে জানে—খিল খিল করে সশব্দে হেসে উঠলো বৌঠান। সে-হাসি আর থামতে চায় না। ঘর ফাটানো সে-হাসি। হাসতে হাসতে বৌঠানের যেন দম আটকে আসবে। বোতল ভাঙার শব্দের সঙ্গে বৌঠানের হাসির শব্দ যেন একাকার হয়ে গিয়েছিল সে-রাত্রে।
২৭. সেদিন সেই ঘটনার পর
সেদিন সেই ঘটনার পর ভূতনাথ নিঃশব্দে চোরকুঠুরির দরজা দিয়ে নিচের ঘরে এসে খিল লাগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আজ বংশীর কথা শুনে যেন অবাক লাগলো। কিসের ঝগড়া হলো ছোটবাবুর সঙ্গে। আবার কেন জানবাজারে যাবে ছোটকর্তা। বৃন্দাবন কি আবার কোনো সূত্রে ফুসলে নিয়ে যাবার সুযোগ পেয়েছে।
বংশী বললে—ওই দেখুন না, ছোটবাবুর ল্যাণ্ডো আবার ধোয়ামোছা সাফ সুতরো হচ্ছে। নতুন আতর বের করতে হবে-সাজগোজ সব করে দিতে হবে—আজকে বড় কাজ শালাবাবু, চললুম।
ভূতনাথ বললে—আচ্ছা বংশী, একটা কথা বলতে পারিস?
–কী! বংশী ফিরে দাঁড়ালো।
—চুনী দাসী বৃন্দাবনের কে হয় জানিস?
বংশী যেন আকাশ থেকে পড়লো। আপনি কেমন করে জানলেন শালাবাবু?
-বৃন্দাবনের সঙ্গে যে আমার দেখা হয়েছিল।
—আপনার কাছেও এসেছিল-খবরদার শালাবাবু, ওকে আমল দেবেন না। ঠনঠনের ছেনি দত্তের বাড়িতে গিয়েও অমনি ক’দিন ঘোরাঘুরি করেছে আজ্ঞে, এখন তো ছেনি দত্ত মারা গিয়েছে, এখন আবার নটে দত্তের পেছনে লেগেছে, এখন যে হাড়ির হাল ওদের, ছোটবাবু তো যায় না, খাবার জোটে না এখন দু’বেলা ভালো করে হুজুর–ছোটবাবুর দেওয়া মোটরগাড়িটা পর্যন্ত বেচতে হয়েছে। হবে না, বাজার যা পড়েছে-মাংস সাত আনা, চৌদ্দ পয়সা সরষের তেল, দশ পয়সা দুধ, এক সের ঘি কিনতে গেলে বারো গণ্ডা পয়সা লাগে। পারবে কোত্থেকে শুনি—এখন কোত্থেকে বরফ সোড়ার খরচ আসে দেখবো। তারপর একটু থেমে বংশী জিজ্ঞেস করলোতা কী বলছিল আপনাকে বিন্দাবন?
-বলছিল, তার নতুন-মা নাকি একবার দেখা করতে বলেছে আমাকে—জানবাজারের বাড়িতে।
বংশী তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলো।-কী আম্পদ্দা দেখুন বিন্দাবনের, আপনাকে কি না যেতে বলে নতুন-মা’র কাছে, নতুনমা ডেকেছে না ছাই। ওসব বিন্দাবনের চালাকি শালাবাবু, বিন্দাবম আপনাকে কোনো রকমে নিয়ে গিয়ে ফেলতে চায় ওখানে, তারপর খাইয়ে-দাইয়ে ভুজং-ভাজং দিয়ে
—তুমি কি আমাকে তেমনি তোক পেয়েছে। নাকি বংশী–আমাকে যা বলবে, আমি তাই শুনবো!
—তা আর কী-কী বললে শালাবাবু?
–এই সব দুঃখ করছিল আর কি। গাড়ি বেচতে হয়েছে, পেট চলে না, ছোটবাবুকে বলে-কয়ে পাঠিয়ে যদি দিতে পারি এই বোধ হয় মতলব, খুলে কিছু বললে না, কেবল বললে—আমাকে নতুন-মা ডেকেছে।
