বৌঠান হাসতে হাসতে এবার উঠে বসলো। বললে—তা হলে যখন এটা দিলি সোডার বোতলটাও দে—বলে বোতলের ছিপিটা নিজেই খুলে ফেললে।
ভূতনাথ এক দৃষ্টে চেয়ে দেখতে লাগলো। একদিন মদের বোতল হাতে তুলে নিতে এই পটেশ্বরী বৌঠানেরই হাত কেঁপে উঠেছিল। বোধহয় কিছুটা আতঙ্কও হয়েছিল। বোধহয় বুকচাপা কান্না ঠেলে উঠেছিল গলায়। সেদিনের সে-দৃশ্যটা ভাবতে গেলে এখন যেন আর বিশ্বাস হয় না। অথচ আজ কত সহজ হয়ে গিয়েছে। কত সংক্ষিপ্ত। অভ্যস্ত হাতের কৌশলে বৌঠান গেলাশে ঢেলেছে বিষ! টল টল করতে লাগলো পাত্রটা ইলেকটি ক আলোর তলায়।
তারপর?
তারপর বিস্মিত ভূতনাথের নির্নিমেষ দৃষ্টির সামনে…পটেশ্বরী বৌঠান একবার শুধু একটু ঘোমটা তুলে দিলো মাথায়। তারপর নিঃশেষ হয়ে গেল গেলাশটা। একটু মুখ-বিকৃতি নেই। একটু সঙ্কোচ নেই। সমস্তটা খেয়ে নিয়ে হাসতে লাগলো বৌঠান। বললে—তোকে ঠিক কালপেঁচার মতো দেখাচ্ছে ভূতনাথ—তারপর আর একটু ঢেলে বললে—তুই একটু খাবি ভূতনাথ?
ভূতনাথ কথা বললে না।
—খেয়েই দেখ না একবার—আয় না এক সঙ্গে দুজনে মরি।
ভূতনাথ এবারও কথা বললে না।
পটেশ্বরী বৌঠান মাথায় ঘোমটা তুলে দিয়ে গেলাশটা এক চুমুকে আবার নিঃশেষ করে দিলে। তারপর যেন কেমন স্থির হয়ে এল। থিতিয়ে এল। সমস্ত শরীরে সেই আগেকার মতন প্রশান্তি। যেন নিজের মনেই বৌঠান বলতে লাগলো—আমি যদি খাই, কার কি বলবার আছে শুনি, পরের পয়সায় খাচ্ছি না আমি। বেশ করবে খাবো…আলবৎ খাবো…এই তো আবার খাচ্ছিকে কী বলে দেখি—বলে সত্যি সত্যিই বৌঠান আবার ঢাললে গেলাশে। তারপর আবার এক চুমুকে নিঃশেষ হয়ে গেল গেলাশটা। এবার ঘোমটা খসে গেল মাথা থেকে। বললে—বেশ করছি খাচ্ছিআমার খুশি আমি খাবো–যার ভালো লাগে না। সে সরে যাক এখান থেকে—বেরিয়ে যাক ঘর থেকে—আমি কারো খাই না পরি।
এবারও ভূতনাথের মুখ দিয়ে কিছু কথা বেরোলে না।
বৌঠানের চোখ দুটো দেখতে দেখতে লাল হয়ে এল। গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। পাতলা ঠোট দুটো যেন হঠাৎ রসালো হয়ে উঠলো। পালঙ-এর ওপর তাকিয়াটা হেলান দিয়ে উঠে বসলো একবার। বললে–কি দেখছিস ভূতনাথ?
ভূতনাথ বললে–তোমার লজ্জা করছে না—-ছিঃ!
বৌঠান–হেসে উঠলো খিল খিল করে। হাসির দমকে সমস্ত শরীর যেন উথলে উঠতে লাগলো। তারপর থেমে বললে—লজ্জা! লজ্জা করবো কোন দুঃখে শুনি–আমার মতন কে এত সুখী বলতে পারিস, আমার মতো রূপসী কেউ আছে, আমার মতো এত বড় লোকের বাড়ির বউ-ছোটকর্তার মতো স্বামী—যা এ বংশে কেউ কখনও করেনি, ছোটকর্তা আমার জন্যে তাই করেছে জানিস। ছোটকর্তা রাত্তিরে বাড়িতে শোয়-আমার মতো সুখী কে লজ্জা করবো কোন্ দুঃখে রে? হিংসেয় তোদের বুক ফেটে যাচ্ছেবুঝতে পারছি।
ভূতনাথ চুপ করে রইল। মনে হলো—বৌঠান যেন তার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
একটু থেমে বৌঠান আবার বলতে লাগলো—ছোটকর্তাকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলুম—তুমি সুখী হয়েছে তো? ছোটকর্তা কি বললে জানিস—বললে…
-কী বললে?
—বললে—আমার কথা থাক, তুমি সুখী হয়েছে? তুমি যা চেয়েছিলে পেয়েছে তো?
আমি বললুম—তোমার সুখেই আমার সুখ, আমার আলাদা সুখ বলে কিছু নেই, স্বামীর সুখেই স্ত্রী সুখী—কিন্তু তুমি? তুমি কি সুখী হওনি? আমি কি পারি নি তোমায় সুখী করতে? তুমি যে বলেছিলে—আনন্দ দিতে পারে বাগানবাড়ির মেয়েরা, ওরা কায়দা-কানুন জানে। আমি যে বড় গলায় বলেছিলুম—আমি পারবে, তোমার জন্যে সব করতে পারবে—তুমিই বলো তো আমি কি পেরেছি? ছোটকর্তা হাসতে লাগলো। রাত তখন শেষ হয়ে আসছে। আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে তখন ছোটকর্তা। মাথার চুলের ভেতর হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। আবার বললুম—উত্তর দিচ্ছে না যে—কথা বলে?
ছোটকর্তা অনেকক্ষণ কি ভাবলে। বললে—মন্ত্রে বিশ্বাস করে। তুমি ছোটবউ?
বললুম—তুমি কী যে বলো-মন্ত্রে যদি পৃথিবীতে কেউ একজন বিশ্বাস করে তো সে আমি। আজ যে তোমাকে বুকে পেয়েছি সে তো মন্ত্রের জোরে। আমার এই মুখের দিকে চেয়ে দেখো তো—দেখো চেয়ে।
ছোটকর্তার চিবুকটা ধরে আমার দিকে ফেরালুম। বললুমকী দেখছো বলো তো?
-কই কিছু না।
—কপালে কী দেখছো আমার?
—কপালে? কিছুই দেখছি না তো?
—সিঁদুর দেখতে পাচ্ছে না?
—হ্যাঁ, সিঁদুরের টিপ দেখছি।
-ওই তো মন্ত্র, মন্ত্রপড়া সিঁদুর, ‘মোহিনী-সিঁদুর’, ওই সিঁদুরের জোরেই তোমায় ফিরিয়ে পেয়েছি—এই যে তুমি আমার কাছে রয়েছে—এ ওরই জন্যে।
কথাটা শুনে ছোটকর্তা হাসতে লাগলো। হাসলে ছোটকর্তাকে খুব ভালো দেখায়। কখনও তো আগে হাসি দেখিনি। বললাম-হাসছো যে।
ছোটকর্তা বললে—আমি ও মন্ত্রের কথা বলছি না। ও তো বুজরুকি–পয়সা নেবার ফিকির—আমি বলছি অন্য মন্ত্রের কথা, মনে আছে বিয়ের সময় রূপলাল ঠাকুর মন্ত্র পড়িয়েছিল—তোমার হয় তো মনে নেই ছোটবউ, তোমার তখন বোধ হয় দশ বছর বয়েস। সে মন্ত্রের মানেও তখন বুঝিনি—তবু যেটুকু মানে বুঝেছি তাতে তোমার ওপর আমি অন্যায় করেছি ছোটবউ।
মুখটা চাপা দিয়ে দিলাম হাত দিয়ে। বললাম—তুমি কিছু অন্যায় করোনি গো, সে আমার কপালের দুর্ভোগ—তুমি কী করবে।
ছোটকর্তা বললেন ছোটবউ-আমি অন্যায়ই করেছি তোমায় আমি যে মদ ধরিয়েছি।
সারারাত দুজনে তখন অনেক মদ খেয়েছি, তবু দেখলাম ছোটকর্তার জ্ঞান রয়েছে খুব। সান্ত্বনা দিয়ে বললাম-ও আমি যেদিন তুমি বলবে সেইদিনই ছেড়ে দেবোতোমার ভালো লাগে বলেই তত খাই।
