ভূতনাথের কেমন ভয় হলো কথাটা শুনে।
—নে, চাবি নে।
বৌঠানের গলায় ধমকের সুর নয়, আদেশের সুর নয়। সুরটা কিসের তাই বিচার করতে গিয়ে ভূতনাথ ছোটবৌঠানের মুখের দিকে একবার চাইলে। চোখে কি সুর্মা পরেছে বৌঠান! না কালি পড়েছে! রাত জাগার কালিমা! আশ্চর্য লাগে, এই চোখের এত আকর্ষণ কী করে ছোটকর্তা এতদিন এড়াতে পেরেছিল। এত মোহ, এত মায়া, এত নেশা আছে মেয়েমানুষের সহজ চাউনিতে, ভাবা যায় না। সেই ফতেপুরের রাধা! সেও যখন অভিমান করতো এত নেশা ছিল না সে-চোখে। আর সেই যে টিটকিরি দিতে কথায় কথায় আন্না! আন্নাকালী! এত টানতো না। সে মেয়েও। হরিদাসী ছিল গম্ভীর প্রকৃতির। কিন্তু পেটে পেটে দুষ্টমি ছিল তার-ও। সে-ও যখন ঠাট্টা করতে ভূতনাথকে নিয়ে, তখন খুব রাগ হতো বটে, কিন্তু ভালোও লাগতো! জবা যখন কথার মারপ্যাচ দিয়ে পাড়াগেঁয়ে বলে তাকে উপহাস করে বিদ্রূপ করে, হাজার রাগ হলেও তা ভালো লাগে। কিন্তু ভালো লাগারও তো একটা তারতম্য আছে। এ-ভালো লাগার যেন শেষ নেই।
ভূতনাথ বললে—আমি কি চাবি খুলতে পারবো?
–খুব পারবি, আমি এখন উঠতে পারছিনে তা বলে।
—যদি না পারি?
–খুব পারবি, না পারবি তো পুরুষমানুষ হয়েছিলি কী জন্যে?
সিন্দুকের ভেতর চোখ মেলে সেদিন ভূতনাথ অবাক হয়ে গিয়েছিল। ওটা বুঝি মুক্তোর হার, তার পাশে একগাদা গিনি। হীরের কয়েকটা গয়না অন্ধকারের ভেতর জ্বল জ্বল করছে। একটা রূপোর রেকাবি ছিল, তারই ওপর টাকার তোড়াটা রেখে দিলে ভূতনাথ। রাখতেই একটা ঝন ঝন শব্দ করে উঠলো। চমকে উঠলো ভূতনাথ। কেমন যেন শরীরের সমস্ত শিরা-উপশিরাতে তার ঝঙ্কার চলতে লাগলো কিছুক্ষণ ধরে। মনে হলো যেন বৌঠানের গায়ে হাত ঠেকে গিয়েছে তার। পাতলা নরম গা। হাত ঠেকতেই বৌঠান চমকে উঠেছে, আর হাতের চুড়িগুলো বেজে উঠলো ঠুন ঠুন করে।
—সিন্দুকটা বন্ধ করে, দেরাজ থেকে ওই বোতলটা আন তো ভূতনাথ।
ভূতনাথের নজরে পড়লো কালো একটা বোতল। তার ওপর কাগজের লেবেল আঁটা।—কী আছে ওতে? মদ?
—হ্যাঁ, নিয়ে আয় না।
নিতে গিয়েও ভূতনাথের হাতটা সরে এল। একবার দ্বিধা হলো। মনে হলো যেন একটা সাপ কুণ্ডলী পাকিয়ে ওখানে মিট মিট করে মাথাটা তুলে তাকাচ্ছে। হাত ছোঁয়ালেই ছোবল মারবে। ভূতনাথ এবার পেছন ফিরলো। বললে—এখন কি আবার ওইটে খাবে নাকি!
বৌঠান উঠে বসলো। বললে—শরীরটা কেমন যেন লাগছে।
—তা বলে ওইটে খেলে কি সারবে?
বৌঠান হাসলো এবার। বললে–-সারবে রে সারবে, সেদিন নীলের উপোস ছিল, সারাদিন তো জল মুখে দিইনি, কিন্তু সন্ধ্যেবেলা ওই একটু খেয়ে বেশ তাজা হয়ে উঠলুম।
—এখন আর বমি আসে না বৌঠান? সেই প্রথম যেমন হয়েছিল?
-বমি আসবে কেন?
—মনে নেই, প্রথম প্রথম কী রকম ঝঝ লেগেছিল—সেই আমি যেদিন প্রথম কিনে এনে দিলাম, মনে নেই-ছিপি খুলতে গিয়েই কেমন বমি-বমি ভাব এসেছিল তোমার?
বৌঠান হো হো করে হেসে উঠলো।
-হাসছো যে?
—হাসবো না, এখন যে উল্টো হয়েছে, সারাটা দিন না খেলেও চলে—কিন্তু সন্ধ্যে হলেই কেমন হাই ওঠে, ফাঁকা ফাকা মনে হয়, কিন্তু একটু জিভে ছোঁয়ালেই সব ঠাণ্ডা।
ভূতনাথ গম্ভীর হয়ে গেল—তোমার তাহলে নেশা হয়েছে বৌঠান। ঠিক নেশা হয়েছে—আমি বলছি।
–দূর, ছোটকর্তা যতদিন চায় ততদিন খাবো, তারপরই দেবো ছেড়ে।
–তা হলে এখন কেন আবার খাচ্ছো?
—শরীরটা কেমন করছে তাই—দে তুই, একটুখানি খাবো। সত্যি বলছি—বিছানায় শুয়ে শুয়েই হাত বাড়ালো বৌঠান।
–দেবো না আমি—আমাকে তুমি কথা দিয়েছিলে যে বেশি খাবে না।
–সত্যি বেশি খাই না রে ভূতনাথ, সত্যি বলছি বেশি খাই না। যেদিন ছোটকর্তার পাল্লায় পড়ে খাই—সেদিন খুব শরীর খারাপ হয়, মাথা তুলতে পারি না সকালবেলা, একদিন সারাদিন জ্ঞান হয়নি, আবোল-তাবোল কী সব বকেছি, চিন্তা দিনভোর আমার পাশে বসে বরফ দিয়েছে মাথায়। ছোটকর্তাকে বললাম, উনিও ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, বললেন—প্রথম প্রথম অমন একটু হয়—অভ্যেস হয়ে গেলে আর হবে না। দেখছিস না ওটা খাবার পর থেকে কেমন মোটা হয়ে গিয়েছি।
বৌঠান সত্যিই মোটা হয়েছে কিনা ভূতনাথ তাকিয়ে দেখলে। বললে—মোটা কোথায়-তবে তোমায় দেখতে আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছে।
—ছোটকর্তা বলেছে মদ খেলে কখনও শরীর খারাপ হয় না। মদ তো আঙুরের রস-ফলের রস।
ভূতনাথ বললে-কখখনো না, মদ যদি আঙুরের রস হবে তো ওটা খেলে অমন নেশা হবে কেন? মদের নেশায় লোকে সর্বস্বান্ত হয় কেন? কেন মদ খেলে মাথা ঘোরে, পা টলে, আবোলতাবোল কথা বলে?
বৌঠান এবার শুয়ে পড়লো আবার বালিশে মাথা দিয়ে। বললে—তা তুই কি বলতে চাস ভূতনাথ যে, ছোটকর্তার কথা না শুনে তোর কথাই শুনি?
ভূতনাথ হঠাৎ আবার কাছে সরে এল। বললে–আমি কি তাই বলেছি? আমার নামে মিছিমিছি দোষ দিচ্ছো কেন বৌঠান?
—তবে তুই যে বড় বারণ করতে আসিস?
–আমি বারণ করি, সেকি বৌঠান আমার জন্যে? তুমি বসে বসে চোখের সামনে আত্মঘাতী হবে তাতে তোমারই ক্ষতি আমার কী?
বৌঠান বললে—আত্মঘাতী যদি হই-ই, তবু তো ছোটকর্তার পায়ে মাথা রেখে আত্মঘাতী হতে পারবো। স্বামীসেবা করতে করতে মরবো-সধবা মেয়েমানুষের এর চেয়ে আর বড় সাধ কী থাকতে পারে বল তো?
ভূতনাথের তখন সত্যিই বেশ রাগ হয়েছে। খপ করে কালো বোতলটা দেরাজ থেকে নিয়ে এসে হাতে দিয়ে বললে—তবে তুমি মরে বৌঠান, গেলো, প্রাণের সাধ মিটিয়ে খাও।
