বংশী বলেছিল—এই নিয়ে তো ওর চারবার হলে শালাবাবু। এই হালচালের মধ্যে চিন্তাকে রেখেছি শুধু পেটের দায়ে—মাইরি বলছি আজ্ঞে শুধু পেটের দায়ে।
হাবুল দত্তর মেয়ের দশ বছর বয়েস। এ-বাড়িতে নতুনবো হয়ে এসেছে। সে-ও অবাক। অবাক হয়ে গিয়েছে সে-ও।
এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসার আগে শুনেছিল অনেক কথা। পুরুষরা কেউ রাত্রে বাড়ি থাকে না। না-থাকাটাই নাকি আইন। আরো অনেক কথা। বনেদী বাড়ির হালচাল সম্বন্ধে!
মেজখুড়শাশুড়ীকে জিজ্ঞেস করেছে—ছোটঠাকুর বুঝি রাতের বেলায় বাড়ি থাকেন?
মেজমা হেসেছে। হেসে ঠেলা মেরেছে গিরিকে—শোন লা গিরি, কথা শোন বৌ-এর।
বাঘ বন্দি খেলতে খেলতে গিরি বলে—যাই বলে মা, আমার তো মন বলে, ছোটমা ছোটকর্তাকে তুক করেছে পূজো আচ্চা সব বাজে কথা, ওযুদ-বিষুদ খাইয়েছে কিছু।
সত্যিই সবাইর অবাক লেগে গিয়েছিল ছোটবাবুর কাণ্ড দেখে। বনেদী বাড়ির ছেলের এ কী অ-বনেদীয়ানা!
ছোটবৌঠানও এতদিনের মধ্যে আর তেমন ডেকে পাঠায়নি ভূতনাথকে। ভূতনাথও মনে মনে ভেবেছে মদ খাওয়াটা হলো উপলক্ষ্য। আসলে ফল ফলেছে ‘মোহিনী-সিঁদুরের গুণে! মন্ত্রপূত সিঁদুরের অলৌকিক ক্রিয়া। গাদাগাদা যে-সব চিঠি আসতো আপিসে, তখন এতটা বিশ্বাস হয়নি তার। কিন্তু আজ বিশ্বাস হয়েছে যেন। মনে হলো—হবেও বা। সব জিনিষের কি প্রমাণ পাওয়া যায়।
মাঝখানে একবার ছোটবৌঠানের কাছে গিয়েছিল ভূতনাথ। গিয়েছিল নিজের গরজেই।
চোরকুইরির বারান্দাটা পেরিয়ে চুপিসাড়ে গিয়ে পৌচেছে একেবারে ছোটবৌঠানের ঘরের সামনে। তখন সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। বারান্দায় কেউ নেই কোথাও। মেজবোঠানের ঘরের ভেতর তখন একমনে বাঘ বন্দি খেলা চলেছে। আর বড়মাও তখন নিজের ঘরে সিন্ধুর সঙ্গে গল্প জুড়েছে আবোল তাবোল। যেমন সচরাচর হয়। বারান্দার কোণে সাজাঘরের সামনে ঘোট বাতিটা টিম টিম করে জ্বলছে। এই সুযোগ! আর ছুটুকবাবুর বিয়েও তখন হয়নি। নতুনবৌও আসেনি বড়বাড়িতে!
ঘরের সামনে গিয়েই ভূতনাথ চাপা গলায় ডাকলে—ছোটবৌঠান—
ঘরের ভেতর বৌঠান কী করছিল কে জানে। মিষ্টিগলার আওয়াজ এল—কে রে, ভূতনাথ না?
ভূতনাথ কী উত্তর দেবে ভাবছে। এমন সময় ঘোমটা টেনে চিন্তা বেরিয়ে এসে মুখ নিচু করে বললে—ভেতরে যান—বলে চিন্তা ঘরের বাইরে অন্ধকারের আড়ালে মিলিয়ে গেল।
পা কাঁপছিল ভূতনাথের। ছোটবৌঠানের কাছে এলেই ভূতনাথের কেমন যেন পা দুটো কাঁপে। শুধু পা কেন—সর্বাঙ্গ। কেন কাপে তা বলা শক্ত! বোঝানো শক্ত! অথচ জবাও তত তার যে খুব ঘনিষ্ঠ তা নয়। জবাও তার কাছে আকাশের চাঁদের মতো দূরের মানুষ। তাকে এত ভয় করে না। বোধহয় এতখানি ভালোও বাসে না তাকে। তবু কেন যে এমন হয় কে বলবে!
ছোটবৌঠান বোধহয় পালঙ-এর ওপর শুয়েছিল, আর গা হাত পা টিপে দিচ্ছিলো চিন্তা!
ঘরের ভেতর মাথা গলিয়ে ওই অবস্থা দেখে কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল ভূতনাথ।
ছোটবৌঠানও ওঠবার বা শশব্যস্ত হবার চেষ্টা করলো না।
–আয়, দাঁড়িয়ে রইলি কেন রে? আয়, বোস এখেনে।
ভূতনাথ পায়ে-পায়ে সামনে এগিয়ে গেল। কিন্তু কেমন অহেতুক লজ্জা করতে লাগলো যেন। বললে—শরীর খারাপ বুঝি বৌঠান?
ছোটবৌঠান শুয়ে শুয়ে হাসলো—শরীর খারাপ কেন হতে যাবে? আমি খুব ভালো আছি রে আজকাল। তারপর একটু থেমে হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করলে—আমাকে তোর মনে পড়ে
এখনও?
-রোজই আসতে ইচ্ছে করে তোমার কাছে।
–তা বলে যেন রোজ আসিস নে তুই!
-কেন? প্রশ্নটা করে ভূতনাথ কেমন চমকে উঠলো। যেন অধিকার আছে তার রোজ এ-ঘরে আসবার।
-না, রোজ আসতে নেই, আজকাল ছোটকর্তা আসে যে এ-ঘরে।
—সে তো রাত্রে।
–তুই জানিসনে ভূতনাথ, রাত্রে ছোটকর্তা আসে বটে কিন্তু দিনের বেলাও সেই রাত্রের কথাই ভাবি যে। আমার দিনরাত যে একাকার হয়ে গিয়েছে আজকাল। জানিস, সময় মতো যশোদা-দুলালের পূজো করতেও ভুলে যাই আজকাল।
—সে কী!
—কেন, তাতে দোষ কী! যশোদাদুলাল আর স্বামী কি আলাদা নাকি! যে-যশোদাদুলাল সেই তো…
ভূতনাথ চুপ করে রইল। কথা বলতে বলতে ছোটবৌঠানের মুখটা কেমন যেন আরো সুন্দর হয়ে উঠলো। এ ক’দিনে যেন ছোটবৌঠান শুধু আরো সুন্দরই হয়নি, আরো শুচি শুভ্র হয়েছে, পবিত্র হয়েছে। আরো সম্পূর্ণ হয়েছে। আরো নতুন, আরো নরম।
ভূতনাথ বললে-একটা কাজে এসেছিলাম তোমার কাছে বৌঠান।
—কী কাজ, বল?
হাতের একটা ন্যাকড়ায় বাধা পুটলি দেখিয়ে বললে—এই কিছু টাকা এনেছিলাম—রেখে দেবো তোমার কাছে। আমার তো বাক্স-পেটরা কিছু নেই।
—টাকা কিসের?
—এই পাঁচ শ’ টাকা পেলাম সুবিনয়বাবুর কাছে। জবার বাবা দিলেন, চাকরি চলে গেল কিনা—আপিসই উঠে গেল তা চাকরি থাকবে কী করে?
—চাকরি চলে গেল, ভালোই হয়েছে।
—বারে, চাকরি চলে গেল থাকবো কোথায়, খাবো কী— চিরকাল তো তুমি খাওয়াবে না।
–খাওয়াবো রে, চিরকাল খাওয়াবো, আমি যদি বেঁচে থাকি, তোর খাবার অভাব হবে না। তুই থাকবি বড়বাড়িতে, কে তোকে কী করবে শুনি, ছোটকর্তাকে এখন যা বলবে শুনবে। তুই আমার এত বড় উপকার করলি ভূতনাথ—আমি যে আবার স্বামীসেবা করতে পেলাম, বাঘের মুখ থেকে ছোটকর্তাকে ফিরে পেয়েছি—এ কার জন্যে শুনি—ছোটবৌঠান এবার পাশ ফিরলো। বার দুই আড়ামোড় ভাঙলো। একবার হাই তুললে।
ভূতনাথ বললে–তোমার ঘুম পাচ্ছে—আমি এখন তাহলে
—না রে পাগল, ঘুম পায় নি, সারারাত ছোটকর্তা ঘুমোতে দেয় না বটে—কিন্তু তা বলে এত সকাল-সকালও ঘুম আসে না। এই নে, চাবিটা নে, ওই যে সিন্দুকটা দেখছিস, ওখানে গিয়ে চাবি দিয়ে ওটা খুলে ভেতরে রেখে দে।
