ভূতনাথ বলে–শেষ পর্যন্ত দারোগা সাহেব কী বলে গেল বংশী?
—বলবে আবার কী মাথামুণ্ডু শালাবাবু, কাল সিধে যাবে সাহেবের কুঠিতে—চুকে যাবে ল্যাঠা। আমার ভাবনা শুধু ওই চিন্তাকে নিয়ে—সোয়ামীকে খেয়েছে, এদিকে আবার খেটে খাবার যুগ্যিতা নেই—তার ওপর এই তো দেখছেন বড়বাড়ির হালচাল।
কৌতূহলটা আর চাপতে পারলে না ভূতনাথ। বললে—এসব কার কাজ বংশী?
-এ-কাণ্ড এই কি প্রথম দেখলেন শালাবাবু, মাঝখান থেকে শশীর চাকরি গেল শুধু মধু পারা হয়েছে বলে—তা এদানি গিরির চেহারা কী হয়েছে দেখেছেন?
-গিরি?
-আজ্ঞে মেজবাবু তো এই মারে আর সেই মারে, বলে-বার বার পারবো না ঠেকাতে। মেজমাও চেঁচিয়ে উঠলো। বললে—যত দোষ মেয়েমানুষের, আগে বাড়ির ছেলেকে সামলাও তোমার, আজ বাদে কাল যার বিয়ে হবে তার প্রবৃত্তির বলিহারি, তোমাদেরই তো শিক্ষা, তোমাদেরই তো রক্ত—কত আর ভালো হবে। মেজবাবু ধীর স্থির মানুষ, বেশি কিছু বললে না—কিন্তু তারপর চুলোচুলি বাধলো বড়মা’তে আর মেজমা’তে।
ভূতনাথ বললে—কী রকম?
—বড়মা সাজাঘরে গিয়েছিল, কানে গিয়েছে কথাটা—সেই অবস্থাতেই বেরিয়ে এল। বললে—আমার ছেলের নামে তুই এই অপবাদ দিস মেজবৌ? আমার ছেলে রূপে গুণে কার্তিক, সে আর মেয়েলোক পেলে না! শহরে কি মেয়েলোক নেই, না খাজাঞ্চীখানার পয়সা কম পড়েছে, কত্তা বেঁচে থাকতে বাড়িতে নাচউলী আসেনি? খেমটাউলী আসেনি? না কর্তার নজরের কথা কেউ জানে না? কত্তা একরাতে ল্যাখ টাকা ওড়ায়নি? তোর বাপ পেরেছে তেমন ওড়াতে? তোর চোদ্দপুরুষ পেরেছে? আমার ছেলের নামে অপবাদ! সে আর মেয়েলোক পেলে না, নজর দিতে গেল তোর ঝি-এর ওপর!
–তারপর, নতুনবউ সব শুনলে তো?
বংশী বলে—সে এক কুরুক্ষেত্তোর কাণ্ড শালাবাবু, আপনি দেখতেন যদি, সিন্ধু তাড়াতাড়ি এসে ভিজে গামছাখানা বড়মা’র গায়ে ঢাকা দিলে—তাই একটু আবরু হলো।
–আর নতুনবউ?
—ছুটুকবাবু ঘরের মধ্যেই ছিল, বাইরে বেরিয়ে এসে মাকে বললে—তুমি থামো মা, থামো তুমি…সে অনেক কাণ্ড, পরে বলবো অখন, আমার এখন মরবার ফুরসত নেই—চললুম আজ্ঞে।
এত কাজ তোমার কিসের বংশী?
—না শালাবাবু, ছোটবাবু আজ আবার বেরোবেন আজ্ঞে। ছোটমা’র সঙ্গে আবার ঝগড়া হয়েছে।
বলেই চলে যাচ্ছিলো বংশী। কিন্তু ভূতনাথ চেপে ধরলো। বললে—কোথায় যাবে ছোটবাবু আবার?
–আবার কোথায়, জানবাজারে?
–সে কি!
জানবাজারে! আবার সেই চুনীদাসীর কাছে! এতদিনের সব আয়োজন, সব সাধনা ব্যর্থ হলো বুঝি! কোথাও কোনো ত্রুটি হয়েছে নাকি! সাধনায় কোনো বাধা! ব্যাঘাত! এতদিন ছোটবাবু ঘর থেকে একদিনের জন্যেও বেরোয়নি। ছোটবাবুর ল্যাণ্ডে। এক’দিন আস্তাবলে আলসে হয়ে পড়েছিল। ঘোড়া দুটো কেবল খামকা দানা খেয়েছে আর জিরিয়েছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুটিয়েছে। এত বড় বিয়ে গেল বাড়িতে, দু’একবার ছাড়া ছায়াও দেখা যায়নি ছোটকর্তার। অন্দরমহলে কোথায় নিজের ঘরে বসে কী করেছে কেউ জানে না। বরযাত্রীর দলের মধ্যেও যায়নি সেদিন পাথুরেঘাটাতে।
অবাক শুধু ভূতনাথই হয়নি। অবাক হয়েছে বাড়িশুদ্ধ লোক। লোচন, মধুসূদন, শ্যামসুন্দর, বেণী, ঝি, ঝিয়ারী, বিধু সরকার। কেউ বাদ যায়নি। অবাক হয়েছে ইব্রাহিম কোচোয়ান, দাসু জমাদার, সবাই। সবাই!
মেজবৌ মুখ টিপে হেসেছে।—তুই কিছু তুকতাক করলি নাকি ছোটবৌ?
বিধবা বড়বৌও কথাটা শুনেছে সিন্ধুর কাছে।-বলিস কি সিন্ধু, এ-বংশে রাত্তিরে মাগের কাছে শোয়া এই প্রথম দেখলুম মা, বড়বাড়ির কর্তাদের নাম ডোবাবে ছোটবাবু এবার!
গিরির আজকাল আর সে-তেজ নেই। দুপ-দাপ সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে তেতলায় উঠতে পারে না। গলা চড়িয়ে ঝগড়া করতে পারে না আর সৌদামিনীর সঙ্গে। কিন্তু সৌদামিনী তারকেশ্বরের প্রকাণ্ড বঁটিটা নিয়ে এচোড় কুটতে কুটতে নিজের মনেই ফোড়ন কাটে তেমনি—অমন ভাতারের নিকুচি করেচে মা, দিনরাত মাগের আঁচল ধরে পড়ে থাকে, এ কেমন ধারা ভাতার মা, ভোলার বাপ তাই বলতো-ফুলবৌ, চোখ থাকতে থাকতে তিভুবন চিনে নাও। তা ভোলার বাপ নিজেও মলল, আমাকেও মেরে রেখে গেল মা।
ভাড়ার ঘরের পাশের কুঠুরিতে বসে যদুর মা একমনে হলুদ, লঙ্কা ধনে বেটে চলে পাথরের শীল-নোড়া নিয়ে। হলুদের সোনালি জল নর্দমা দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে উঠোনে পড়ে একাকার হয়ে যায়। সেই অন্ধকার ঘরের মধ্যে বাটনা বাটতে বাটতে সব শোনে বুড়ী। বলে—কার কথা বলছিস লা সদু?
সৌদামিনী উত্তর না দিয়ে চুপ করে যায় হঠাৎ।
সেদিন গিরির একেবারে সামনাসামনি পড়ে গেল ভূতনাথ। সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল গিরি। গজ গজ করছে আপন মনে—শতেক খোয়ারিরা চোখের মাথা খা, আমার দিকে নজর দিতে আসে, আমার গতর ভেঙেছে তো তোদের কি লা, তোদের কী সব্বনাশ করেছে গিরি, গতরখাগীদের গতরে পোকা পড়ক—বলছি আমি গিয়ে মেজমার কাছে।
তারপর সামনে মাথা তুলে ভূতনাথকে দেখেই হঠাৎ একগলা ঘোমটা টেনে পাশে সরে দাঁড়ালো। এক পলকের দেখে নেওয়া। ঘোমটার ভেতর থেকেই গিরি তেমনি গজ গজ করতে লাগলো কোন্ অদৃশ্য শত্রুকে লক্ষ্য করে—মর হারামজাদিরা— আবাগীরা মরলে আমার হাড় জুড়োয়, পিণ্ডি দিয়ে আসি গয়ায় গিয়ে, কাঁধে করে তুলে নিয়ে পুড়িয়ে আসি নিমতলায়, কলসী করে জল ঢালি তার চিতের ওপর।
এরই মধ্যে কিন্তু যেটুকু দেখা গেল, ভূতনাথের মনে হলো যেন পোড়া কাঠের মতো চেহারা হয়েছে গিরির। অথচ এই ক’দিনের মধ্যেই। এমন তো ছিল না। কিছুদিন আগেও গোলগাল ভারী মানুষ ছিল।
