ননীলাল চলে যাচ্ছিলো। ভূতনাথ ডাকলে–ননী—
ননীলাল কুকুরটাকে বুকে নিয়ে মুখ ফেরালে—কিছু বলবি?
—তোর সেই বিন্দী, বিন্দীর কাছে আর যাস না?
ননীলালের মনে পড়লো।–ও-ও-ও-মনে পড়েছে—এখন তাকে ছেড়ে দিয়েছি—এখন আছে মিসেস গ্রিয়ারসন।
–মিসেস গ্রিয়ারসন, সে কে?
—আমার পার্টনারের বউ।
২৬. পায়রা ওড়ানো শেষ হতে
পায়রা ওড়ানো শেষ হতে প্রায় দশটা বেজে গেল।
মেজবাবু যখন নিচে নেমে এলেন তখন রাস্তায় আরো ভিড় জমেছে। দারোগা সাহেব বিধু সরকারের ঘরে বসে বসে তখন প্রায় ক্লান্ত হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে দেয়ালের চারদিকে চেয়ে দেখছে। গোটাকতক ঠাকুর দেবতার ছবি টাঙানো এ-ঘরে। হনুমান গন্ধমাদন পাহাড় বয়ে নিয়ে উড়ে চলেছে সমুদ্রের ওপর দিয়ে। রাবণ রাজা ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে এসে সীতার কাছে ভিক্ষে চাইছে। এমনি আরো সব। সায়েব কিছু বুঝলে কিনা কে জানে।
অধৈর্য হয়ে একবার সাহেব বললে-মেজবাবুকো বোলাও।
বিধু সরকার চশমা তুলে বললে—আর একটু বসুন হুজুর এইবার আসবার সময় হলো, এই দশটা বাজলে এবার।
–কী করছে বাবুসাহেব এতক্ষণ?
—পায়রা ওড়াচ্ছেন হুজুর পিজিয়ন্। সাহেব কী বুঝলো কে জানে। লাঠিটা আর একবার ঠুকে বসে পড়লো তক্তপোশে। বললে—ড্যাম ইট–
কিছু বলাও যায় না। পূজোর সময়ে বড়বাড়ি থেকে প্রতি বছর মোটা রকমের প্রসাদ বিতরণ হয় থানার লোকদের। বিয়ের ব্যাপারেও কাপড়, চোপড়, পোষাক-আশাক দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া পুলিশের লোকদের ওপর বড়বাড়ির বিশেষ কৃপা আছে। সেকালের কর্তাদের আমল থেকে এ-রেওয়াজ। পূজোর পুরোনো খেরো খাতায় লিস্টির মধ্যে থানার দারোগার নাম আছে শ্রীযুক্ত মিস্টার উইলসন কালাইল ব্লেক। নাম লেখা আছে ব্লেক সাহেবের। কিন্তু ব্লেক সাহেব কবে চাকরি থেকে বিদায় নিয়েছে। নিয়ে স্কটল্যাণ্ডের এক কবরের তলায় মাটি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আজো তার নামে খরচ লেখা হয়। ভূমিপতি চৌধুরীকে এই ব্লেক সাহেবই খুনের দায় থেকে বাঁচিয়েছিলেন। যে-রাত্রে ইটালিয়ান শিল্পী তার মেমসাহেবকে গুলী করে পালায়, সেই রাত্রেই থানার দারোগার কাছে পৌঁছে যায় পাঁচ শ’ এক গিনি। তারপর ব্লেক সাহেবের পর থানার ভার নিয়ে এসেছে টাউনসেণ্ড সাহেব। তারও খাতির ছিল এ-বাড়িতে। তারপর যেবার বৈদূর্যমণি চৌধুরী রাজাবাহাদুর হলেন, বড়লাটকে বাড়িতে নেমন্তন্ন করে এনে চীনে-অর্কিড উপহার দেওয়া হলো, সেবার থানার চার্জে ছিল রবিনসন সাহেব। খানা-পিনার অর্ধেক যা বাঁচলো সেদিন, সব গিয়েছিল রবিনসন সাহেবের বাড়িতে। খাটি সব বিলাতী মাল। তারপর হিরণ্যমণি চৌধুরীর বিয়ে গিয়েছে, কৌস্তুভমণির বিয়ে হয়েছে, শেষ বিয়ে হয়েছে চূড়ামণি চৌধুরীর। পুলিশের সঙ্গে দোস্তি না রাখলে সেদিন ঠনঠনের ছেনি দত্তর শবদেহ নিয়ে একটা রক্তারক্তি কাণ্ড বেধে যেতে। ব্রিজ সিং বন্দুকটা সোজা করে ছুঁড়লে দাঙ্গাটা জোর বেধে উঠতো। কিন্তু বাঁচালে দারোগা সাহেব।
যতবার সিধে গিয়েছে পুলিশ সাহেবের বাড়িতে, বিধু সরকার পুরোনো খেরো খাতাটা পেড়ে নিয়ে ততবার লিখেছে—শ্ৰীযুক্ত মিস্টার উইলসন কার্লাইল ব্লেক সাহেবকে মিষ্টান্ন বিতরণ বাবদ…।
খাওয়া-দাওয়ার পর ভিস্তিখানায় আঁচাতে গিয়ে বংশীর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মনে হলো বড় যেন ব্যস্ত আজ বংশী। বংশীর তখনও স্নান হয়নি। তাড়াতাড়ি মাথায় দু’ ঘটি জল ঢেলে সরে পড়বার মতলব।
ভূতনাথকে দেখেই বংশী বললে—আজ আর কথা বলবার সময় নেই শালাবাবু—চললুম আজ্ঞে।
ভূতনাথ বললে—কাজ তোমার খুব বেড়েছে বংশী এদানিসত্যি কথা।
কথাটা মিথ্যে নয়। যতদিন ছোটবাবু বাড়িতে থাকতো না, ততদিন বংশীরও বেশি কাজ ছিল না। গল্প করে কাটাতে এ-ঘর ও-ঘর। তোষাখানায় বসে তাস নিয়ে বিন্তি খেলেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মাঝে মাঝে ফাইফরমাশ খেটেছে ছোটমা’র। আজকাল দেখাই হয় না শালাবাবুর সঙ্গে। ভূতনাথ ও চাকরির চেষ্টায় ঘুরেছে কেবল। অনেক লোকের বাড়ি-বাড়ি গিয়েছে। ব্রজরাখালের পরিচয় সুবাদে যেখানে যেখানে একটু সামান্য পরিচয় ছিল সব জায়গায় গিয়ে ধন্না দিয়েছে। সুবিনয়বাবুর নাম করে সমাজের কয়েকজনের সঙ্গেও দেখা করেছে। সামান্য একটা চাকরি, যে-কোনো রকমের। যে-কোনো মাইনের। পাঁচ টাকা, ছ’ টাকা, যা হয়। তারপর ডালহৌসি স্কোয়ারের বড় বড় হোঁসগুলোতে দুপুরবেলা গিয়ে খোঁজ করেছে। নতুন আপিস হয়েছে সব এদিকে। র্যালি ব্রাদার্স, মালকম এণ্ড কোং, মার্টিন পিলার্স এণ্ড কোং, টার্নার ক্যাডোগান এণ্ড কোং। তারপর দেশী কোম্পানীও আছে। প্রেমাদ কিলস এণ্ড কোং, দত্ত লিনজি এণ্ড কোং…
কেউ কেউ শুধু বক্তৃতা দিয়েই বিদায় দিয়েছে—মতি শীলের নাম শুনেছো হে ছোকরা, তোমার মতো গরীব অবস্থা থেকেই বড়লোক হয়েছিলেন—শুধু বসে বসে তাস খেললে তো চলবে না!
ভূতনাথ হয় তো মৃদু প্রতিবাদ করেছে—তাস খেলতেই জানি স্যার তা–
—ওই দেখো সামান্য তাস, ওই তাসের ব্যবসা করেই কত লোক লাখ লাখ টাকা কামাচ্ছে, আর তোমরা তাসটা খেলতে শিখলে না। মতি শীল বোতল আর কর্কের ব্যবসা করে কত পয়সা কামিয়েছেন, জানো সেকালে বিস্কুট চালান দিতেন অস্ট্রেলিয়ায় ওই মতি শীল। শুধু মতি শীল কেন, বিশ্বম্ভর সেন আট দশ টাকা নিয়ে ব্যবসায়ে নেমে শেষে দু’ লক্ষ পাউণ্ড গচ্ছিত রেখে গিয়েছিলেন ব্যাঙ্কে—আর রাজা নবকেষ্ট–
উদাহরণ বাড়িয়ে লাভ নেই। তবু উদাহরণ দেয় সবাই। উপদেশ দেয় সবাই। হুইলার সাহেবের দেওয়ান দর্পনারায়ণ ঠাকুর, ফেয়ারলি সাহেবের দেওয়ান রামদুলাল দে, নুনের এজেন্ট হ্যারিস সাহেবের দেওয়ান রামহরি বিশ্বাস, কলকাতার জমিদারী কাছারির দেওয়ান গোবিন্দরাম মিত্র, রসদের ঠিকেদার গোকুলচঁদি মিত্র, পামার কোম্পানীর খাজাঞ্চী গঙ্গানারায়ণ সরকার, মুনের কারবারি কৃষ্ণচন্দ্র পাল চৌধুরী, শ্রফের ব্যবসায় মথুর সেন, হেস্টিংস-এর সরকার রামমোহন.. ইত্যাদি ইত্যাদি অজস্র উদাহরণ!
