প্রীতি বললে–বউমা বাড়িতে এসেছে সে-খবরটা সে পেয়েছে নাকি?
–সে-খবর সে পাবে কী করে?
–যদি রাস্তায় কেউ গাড়ি দেখে থাকে তো সে হয়ত বলে দিয়েছে খোকাকে।
প্রকাশ মামা কথাটা শুনে খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বললে–তাহলে আমাদের বাবাজী কী করছে?
প্রীতি বললে–যখন বলেছে সব ঠিক হয়ে যাবে তখন নিশ্চয়ই হবে। আমি তো ওই ভরসাতেই আছি–
–যজ্ঞ কবে হবে?
–সে আমি কী করে বলবো? যেদিন বাবাজীর আদেশ হবে।
–এই বাড়িতেই হবে তো?
–সেই রকমই তো কথা আছে।
বাবাজী ততদিনে বেশ বহালতবিয়তেই আছেন। সারা বাড়িতেই বাবাজীর জন্যে তোড়জোড় চলে সারা দিন। রেলবাজার থেকে ফল-ফুলুরি-মিষ্টি আসে। বাড়িতে দুধ আছে, তার বেশির ভাগটাই ছানা তৈরি হয় বাবাজীর জন্যে। বাবাজী চাল-আটা-মাংস-ডিম কিছুই স্পর্শ করে না। বাবাজীর কাছে শালগ্রাম-শিলা আছে। তিনি সকালে সন্ধ্যেয় সেই শালগ্রাম শিলার সামনে আরতি করেন। সেই আরতির জন্যে গব্যঘৃত, চন্দন, দুগ্ধ, তুলসীপত্র, ফুল, বেলপাতা যোগাড় করতে হয়। গৌরী পিসী সারাদিন সেই সব তদারকিতেই থাকে। কর্তাবাবুর বাড়িতেই অনেক বিগ্রহ। সে বিগ্রহ নামে মাত্র। প্রত্যেক বিগ্রহের মাথা পিছু পঁচাত্তর বিঘে জমিজমা বরাদ্দ। পূজারী ঠাকুর রোজ ফুল-বেলপাতা চড়িয়ে নিয়ম করে পূজো করে যায়। তার জন্যে কোনও দিন কোনও ঘটাও হয় নি, উৎসবও হয় নি। সে-পূজো কখন হলো তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তার জন্যে বরাদ্দ ব্যবস্থা আছে। পূজারী ঠাকুর তার জন্যে জমি পেয়েছে। পুরোপুরি সে-পূজোর জিম্মাদারি তারই।
কিন্তু এ আলাদা পূজো।
বেহারি পালের বউ এসেও খানিকটা হাত চালায়। কখনও ফল কেটে দেয়, কখনও আরতির সময়ে গিয়ে হাজির থাকে। তারপর যখন আরতি হয়ে যায় তখন গলবস্ত্র হয়ে আর সকলের সঙ্গে প্রণাম করে।
বাড়িতে যেতেই বেহারি পাল গিন্নীকে জিজ্ঞেস করে–আজকে কী হলো গো ওদের বাড়িতে?
গিন্নী বলে–কী আবার হবে, ওই পূজো–
বেনে-মশলার দোকান করেই বেহারি পালের অনেক বাড়তি পয়সা। সেই বাড়তি পয়সাতেই আবার মহাজনি কারবার চলে। ধান-পাট-তিসি-সরষের বদলে টাকা ধার দেয়। তবে মালের দরটা বাজারের থেকে কম। কিন্তু দর কম হলে কী হবে, অমন নগদ টাকা কে দেবে হাতে তুলে! কর্তাবাবুও এককালে ওই কারবার করেছিলেন। তারপর যখন অনেক টাকা হয়ে গিয়েছিল তখন জমি কিনে ফেললেন সেই টাকায়। সুদের কারবারে ইজ্জৎ নেই তেমন। কর্তাবাবু তখন একটু ইজ্জতের দিকে ঝুঁকে পড়লেন।
বেহারি পাল জিজ্ঞেস করে–তা হঠাৎ বাবাজীকে কোত্থেকে আমদানি করলে?
–হিমালয়ের সাধু। রাণাঘাটে এসেছিলেন কোন্ শিষ্যের বাড়িতে। সেখান থেকে নাকি চৌধুরী মশাই নিজের বাড়িতে এনে তুলেছে। এবার যজ্ঞ হবে, তারপর সাধু আবার চলে যাবেন হিমালয়ে।
–তা সাধুবাবাজী কী করে সারাদিন?
গিন্নী বলে–সাধু-সন্নিসীদের ব্যাপারে তুমি অমন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কোর না, কার মনে কী আছে কে বলতে পারে! ভাল না করুক মন্দও তো করতে পারে। তখন? আর আমার তো এতে পয়সা খরচ হচ্ছে না—
বেহারি পাল বলে–ওসব কর্তাবাবুর বুজরুকি। বুঝলে? যাকে বলে ভড়ং–ভেতরে ভেতরে কালীগঞ্জের হর্ষনাথ চক্রবর্তীর সব সম্পত্তি গ্রাস করে এখন বোধ হয় পরকালের ভয় ঢুকেছে মনে! যাবে একদিন সব এই তোমায় বলে রাখলুম, সব যাবে। ওই নাতিই ওদের বংশে পেল্লাদ হয়ে জন্মেছে–দৈত্যকুলে পেল্লাদ-। কপিল পায়রাপোড়া, মানিক ঘোষ, ফটিক প্রামাণিক কি মিছিমিছি মরেছে বলতে চাও?
তা বেহারি পাল যা-ই বলুক তাতে কারোর কিছুই আসে যায় না। টাকা হলেই ও রকম পরস্পর হিংসা-ঈর্ষা দ্বেষ বিদ্বেষ থাকেই। তা নিয়ে মাথা ঘামালে সংসার চলে না। নইলে বাবাজীদেরই বা চলবে কেমন করে? তাদেরও তো খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা চাই। চৌধুরী মশাই-এর সংসারে যদি শান্তিই থাকবে তো তাহলে কি আর বাবাজীকে বাড়িতে এনে এত খাতির করতো কেউ? না, দিনরাত তার সেবার জন্যে এত খরচান্তের আয়োজন অনুষ্ঠান হতো।
বাবাজী এক একদিন এক-এক ব্রত করেন।
বলেন–আজ ‘ভূতাপসারণ দিগ্বন্ধন’ করবে–
–সেটা কী?
বাবাজী বলেন–তার অর্থ এই বাড়ির চৌহদ্দি থেকে ভূত-প্রেত দূর করবো। তাদের দৃষ্টি পড়েছে এ বাড়িতে
–তাতে কী কী উপচার চাই?
বাবাজী ফর্দ দেন-–গঙ্গাজল, পুষ্প আর শ্বেতসর্ষপ। বেশি কিছু নয়।
তা তারই ব্যবস্থা হলো। সবাই এসে জুটলো। সত্যিই যদি বাড়ির ওপর ভূত-প্রেতের নজর পড়ে থাকে তো তা আগে দূর করতে হবে।
যখন সব যোগাড় হলো তিনি দিগ্বন্ধন করতে করতে মন্ত্র পড়তে লাগলেন। ধূপ-ধূনোর গন্ধে তখন চোখে অন্ধকার দেখছে সবাই।
বাবাজী বলল–কাঁসর-ঘন্টা কই?
প্রকাশ মামা কাঁসর নিয়ে ঝাঁইঝাঁই করে বাজাতে লাগলো। আর একজন ঘণ্টা।
বাবাজী চিৎকার করে মন্ত্র পড়তে লাগলেন–ওঁ অপসৰ্পন্তু তে ভূতা যে ভুতা ভুবি সংস্থিতাঃ…
আরো কী সব অদ্ভুত শব্দ উচ্চারণ করতে লাগলেন তার মানে কেউ বুঝতে পারলে না। তা না পারুক, শব্দ যত দুর্বোধ্য হয় সকলের ভক্তি ততই বাড়ে। শেষকালে হাতে তুড়ি দিতে লাগলেন বাবাজী। ওঁ যং লিঙ্গ শরীরং শোধয় শোধয় স্বাহাঃ..
যখন পূজো শেষ হয়ে আসছিল তখন হঠাৎ বাবাজী চিৎকার করে বলতে লাগলেন– ফট…ফট…ফট…ফট স্বাহাঃ…
শেষ পর্যন্ত দিগ্বন্ধন হলো, ভূতাপসারণও হলো। পরের দিন চৌধুরী মশাই জিজ্ঞেস করলেন–হ্যাঁ বাবা, ভূত কি ছিল বাড়িতে?
