বাবাজী বললেন–ছিল বৈকি। অনেকগুলো ভূত ছিল। তার মধ্যে আবার একটা ছিল পেতনী
কথাটা শুনেই চৌধুরী মশাই-এর বুকটা যেন ছাঁৎ করে উঠলো। কালীগঞ্জের বউ কি তাহলে অশরীরী হয়ে এই বাড়িতেই আশ্রয় নিয়েছিল নাকি?
–তা এখন সবই দূর হয়েছে তো?
–দূর হবে না মানে? চোখের জল ফেলতে ফেলতে সবাই পালিয়েছে।
–কিন্তু যজ্ঞ করবেন কবে? আপনি যে বলেছিলেন যজ্ঞ করলে অমঙ্গল কেটে যাবে?
–আরে আগে-ভাগে যজ্ঞ করলেই হলো? ভৃগুর কষ্ট হচ্ছিল ভূত-প্রেতের উপদ্রবের জন্যে। এবার তারা দূর হলো, এখন ভৃগু সুস্থ হলেন।
ঠিক এই সময়েই কেষ্টনগর থেকে বেয়াই মশাই তার মেয়েকে নিয়ে এসে হাজির হলেন। বেয়াই মশাই কিম্বা তার মেয়ে কেউই জানতে পারলে না তাদের অসাক্ষাতে এই বাড়ি এই বংশ ভূতের উপদ্রব থেকে মুক্ত হয়ে গেছে।
কর্তাবাবুও জানতে পারলেন না ভেতরে ভেতরে এত কাণ্ড চলেছে। তার নাকে তখনও ধূপ-ধুনোর গন্ধ যায় আর কানে যায় কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ। বলেন–বেহারি পালের দেব-দ্বিজে ভক্তি-টক্তি ওসব ভড়ং, বুঝলে কৈলাস! সব ভড়ং। ও হলো আসলে টাকার গরম। সুদে টাকা খাটিয়ে খাটিয়ে টাকা করে এখন লোককে দেখাচ্ছে–ওগো তোমরা দ্যাখো, আমার কত টাকা হয়েছে
সেদিন বাবাজীর কাছে গিয়ে চৌধুরী মশাই বললেন বাবাজী, আজ আমার বউমা এসেছে–
–এসে গেছে? তা ভালোই হয়েছে।
–এবার ছেলেকে বউমার কাছে শুতে পাঠাবো তো?
–নিশ্চয় পাঠাবি।
–কিন্তু ছেলে যদি আবার বিগড়ে বসে?
বাবাজী হাসলেন। বললেন–না রে না, সে ভয় তোর নেই। আমি তো দিগ্বন্ধন করে দিয়েছি, এর পর আমি একটু পাদোদক দিয়ে দেব সেইটে খাইয়ে দিস। এখন এই পর্যন্তই চলুক, তারপর তো আমি আছিই–তোর কিছু ভয় নেই–
অনেক রাত্রে কখন নিঃশব্দে সদানন্দ বাড়িতে ঢুকলো। রোজ এমনি করে নিঃশব্দেই সে ঢোকে। কখন কোথায় থাকে, কার সঙ্গে মেশে তাও যেন কেউ জানে না। কখনও দেখা যায় বারোয়ারিতলায় গিয়ে বসেছে। তারপর আবার কখন সেখান থেকেও সে উঠে যায় কেউ টের পায় না। তারপর একে একে যখন রাস্তায় লোকজনের চলাফেরা পাতলা হয়ে আসে তখন ক্ষিধে পেয়ে যায়। নদীর ধারে বিরাট চড়া পড়ে থাকে। সেখানেই হয়ত শুয়ে পড়লো। এপারে নবাবগঞ্জ ওপারে কালীগঞ্জ। নদীটা পেরিয়ে ওপারে খানিকটা হেঁটে গেলেই হর্ষনাথ চক্রবর্তীর ভাঙা দোতলা বাড়িটা। সেই বাড়ির সামনে গিয়েও খানিক দাঁড়ায়।
সেই বাড়ির রাস্তায় চলতি কোনও লোক দেখতে পেলে ভালো করে ঠাহর করতে পারে না।
জিজ্ঞেস করে–কে?
সদানন্দ বলে–আমি।
বুড়ো লোকটা জিজ্ঞেস করে–তুমি কাদের বাড়ির?
সদানন্দ বলে–আমি নবাবগঞ্জের চৌধুরী মশাই-এর ছেলে
–ও, তুমি গোমস্তা মশাই-এর নাতি? তা এত রাত্তিরে এখেনে কেন? কী দেখছো?
সদানন্দ বলেনা, কিছু দেখছি না, এমনি।
–এ বাড়ি কার জানো? হর্ষনাথ চক্কোত্তির বাড়ি। তোমার ঠাকুর্দাদা এই চক্কোত্তি মশাই এর গোমস্তা ছিলেন। এ কী বাড়িই ছিল এককালে বাবা, আর এখন কী বাড়িই হলো। একেবারে ভুতের বাড়ি হয়ে গেল রাতারাতি।
সদানন্দ আর বেশি দাঁড়ায় না সেখানে। ক’দিন আগেও সে এখানে এসেছিল। এই বাড়ির মধ্যে ঢুকেছিল। এরই মধ্যে যেন জঙ্গলে ভর্তি হয়ে গেছে জায়গাটা। দু-চারটে গাছ, ভাঙা ইটের ফাঁকে ফাঁকে উঁকি দিতে শুরু করেছে। লোকজন কেউ নেই কোথাও। ভেতরে কোথাও একটা আলোও জ্বলছে না। সত্যিই ভূতের বাড়ি হয়ে গেছে দেখছি।
আবার হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির দিকে ফেরে। মনে হয় যেন পেছন পেছন কে আসছে। পেছন ফিরে দেখে একবার। কেউ কোথাও নেই। আবার যেন কার গলা শোনা যায়। সদানন্দ আবার পেছন ফেরে। কাউকে দেখতে পায় না।
হঠাৎ যেন কে বলে ওঠে–আমার দিকে চেয়ে দেখ, এই যে আমি—
আবার পেছন ফেরে সদানন্দ। একেবারে ঠিক কালীগঞ্জের বউ-এর গলা।
–তুমি বাবা আমার জন্যে কেন কষ্ট পাচ্ছো? আমি তো মরে গিয়েছি।
সদানন্দ সামনের ধূ-ধূ নিঃসীম অন্ধকারের দিকে চেয়ে অশরীরী শব্দটার মধ্যে একটা অবয়ব খুঁজতে চেষ্টা করে।
–তুমি নতুন বিয়ে করেছ, তোমার সামনে অনেক ভবিষ্যৎ পড়ে রয়েছে, তুমি আমার কথা আর ভেবো না বাবা। বুঝলে? ভাবলে তোমার জীবন নষ্ট হয়ে যাবে, তুমি বাড়ি ফিরে যাও
সদানন্দ কাঁদো কাঁদো গলায় একবার ক্ষীণ প্রশ্ন করলে–তুমি কই কালীগঞ্জের বউ? তুমি কই?
–আমি? আমি তো আর নেই বাবা?
–তুমি নেই তো কথা বলছো কী করে? তুমি কোথায়?
–আমি? আমি আর কোথায় থাকবো? আমাকে যে তোমার গোমস্তা মশাই একবারে শেষ করে দিয়েছে। আমি যে হারিয়ে গিয়েছি বাবা।
বলতে বলতে একটা কাঠফাটা আর্তনাদে হঠাৎ যেন বাতাসটা চৌচির হয়ে গেল আর সদানন্দর সমস্ত শরীরটা সেই শব্দে থর-থর করে কেঁপে উঠলো। হঠাৎ নজরে পড়লো তার সামনেই একটা কুকুর দাঁড়িয়ে আছে। রাস্তার বেওয়ারিশ কুকুর অচেনা মানুষ দেখে তার দিকে চেয়ে তারস্বরে ঘেউ ঘেউ করছে।
সদানন্দ চিৎকার করে বলে উঠলো–আমি এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবো কালীগঞ্জের বউ, তুমি দেখে নিও, আমি আমার দাদুর সব পাপের প্রায়শ্চিত্ত করবো একদিন–
আশ্চর্য! একটা তুচ্ছ কুকুরও তাকে আজ পর মনে করছে। তাকে অবিশ্বাস করছে। তাকে অশ্রদ্ধা করছে। সে যে এক নিষ্ঠুর হত্যাকারী পরস্বাপহারীর বংশধর তা এই রাস্তার কুকুরটাও যেন কেমন করে বুঝতে পেরেছে।
