বাবাকে দেখে নয়নতারা বিছানা থেকে নেমে এসে বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়াল।
ভট্টাচার্যি মশাই আশীর্বাদ করলেন–সুখে থাকো মা, স্বামীর সংসারে লক্ষ্মী হয়ে থাকো, মনেপ্রাণে স্বামীর সেবা কোর, মেয়েমানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর নেই–
নয়নতারার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল। ভট্টাচার্যি মশাই বললেন কাঁদতে নেই মা, ছিঃ, বাপ-মা কারো চিরকাল থাকে না। তোমাকে সুখী দেখতে পেলেই আমাদের সুখ। তুমি মনেপ্রাণে স্বামীর সংসার করো, তাই দেখেই তার স্বৰ্গত আত্মা সুখী হবে–তোমার দুঃখ কী মা, তোমার মতন স্বামী ক’জন পায় বলো তো। তা এবার চলি, সদানন্দর সঙ্গে দেখা হলো না, শুনলাম সে নাকি মামলার কাজে রানাঘাটে গেছে। বাড়ি এলে তাকে বলে দিও মা যে আমি এসেছিলুম, তাকেও আশর্বাদ করে গেছি–
নয়নতারা আর একবার বাবার পায়ে প্রণাম করলে। ভট্টাচার্যি মশাই আর দাঁড়ালেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। মায়া জিনিসটা এমন যে তা যত বাড়াও ততই বেড়ে যায়। বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল।
চৌধুরী মশাই বললেন–আবার আসবেন বেয়াই মশাই–
প্রকাশ মামা বলে উঠল–এবারের আসা ঠিক মনের মত আসা হলো না বেয়াই মশাই, এবার এসে জামাই-এর বাড়িতে রাত কাটিয়ে যেতে হবে কিন্তু
ভট্টাচর্যি মশাইও ভদ্রতা করে বললেন–ওদিকপানে গেলে আপনারাও কিন্তু যাবেন, একবার পায়ের ধুলো দেবেন।
প্রকাশ মামা বললে–আমাকে সে আর বলতে হবে না, নিশ্চয়ই যাবো, নিশ্চয়ই যাবো, গিয়ে আবার সরপুরিয়া সরভাজা খেয়ে আসবো–
আর তারপর ‘দুর্গা’ ‘দুর্গা’ বলে যাত্রা। গাড়ি ছেড়ে দিলে রজব আলি।
২.৬ ফুলশয্যার সেই অমোঘ রাত
আবার সেই রাত। ফুলশয্যার সেই অমোঘ রাতটার পর এই দ্বিতীয়বার নয়নতারা আবার একবার রাত কাটাবে এই ঘরে। এই রাতটার কথা ভাবতেই কেমন যেন তার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। এতদিন মা ছিল, তাই ততো ভয় করে নি, কিন্তু এবার কেউ নেই তার। অভিযোগ করবার, আবদার করবার, আত্মসমর্পণ করবারও যেন কোনও লোক তার নেই। তবে এবার থেকে তাকে তার অদৃশ্য ভাগ্যের কাছেই অভিযোগ আবদার আত্মসমর্পণ যা-কিছু সব করতে হবে। নিজেকে তার নিজের কাছেই বড় অসহায় মনে হলো।
শাশুড়ী সামনে বসিয়ে খাওয়ালে। বললে–তোমার মা নেই বউমা, কিন্তু আমি তো আছি, তোমার কোনও কষ্ট হলে তুমি আমাকে বলবে। বলতে যেন কোনও লজ্জা কোর না–
খাওয়ার পর বউমা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল চুপ করে।
শাশুড়ী বললে–তুমি আবার দাঁড়িয়ে রইলে কেন বউমা, তুমি তোমার ঘরে যাও–
নয়নতারা বললে–আপনাদের কারো যে খাওয়া হয় নি মা–
–আমাদের খাওয়া হোক না-হোক, তুমি বাচ্চা মেয়ে বসে থাকবে কেন? তুমি এতদূর থেকে এলে, এত ধকল গেল তোমার শরীরে, তুমি তোমার ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ো গে—যাও–
নয়নতারা আস্তে আস্তে নিজের ঘরে গিয়ে ঢুকলো। ঢুকে চার পাশের জানালার পাল্লা বন্ধ করে দিলে। বিছানার ওপর দুটো মাথার বালিশ, দুটো পাশবালিশ পাশাপাশি সাজানো। বাবা এতক্ষণ কেষ্টনগরের পথে ট্রেনে চড়ে চলেছে হয়ত। হয়ত নয়নতারার কথা ভুলেও গেছে বাবা। কেষ্টনগরে গিয়ে বাবা আবার হয়ত তার কাজের মধ্যে ডুবে যাবে। বাবার কি সময় কাটাবার কাজের অভাব? সকাল-সন্ধ্যেয় ছাত্ররা আসবে পড়া জানতে। তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে করতেই কোথা দিয়ে বেলা পুইয়ে যাবে বাবা তা টেরও পাবে না, তখন খাওয়ার জন্যে তাগাদা দিতে হবে। বাবা খেয়ে নিলে তবে তো রান্নাঘর দেওয়া এঁটো বাসন মাজা শেষ হবে। বাবা খেয়ে নিতে যত দেরি করবে সংসারে কাজ শেষ হতে ততই দেরি হবে। বাবা কখনও নিজে সংসার দেখে নি। সব দেখতো মা-ই। নিজের হাতে সংসার করলেই তবে সংসারের জ্বালা মানুষ বুঝতে পারে। নইলে দূর থেকে হুকুম দিতে পারে সবাই।
কাপড় ব্লাউজ বদলে নয়নতারা শুতে গিয়েও কেমন একটু দ্বিধাগ্রস্ত হলো। দরজায় খিল দিয়ে শোবে নাকি সে?
কী করবে বুঝতে পারলে না। ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসছে। মনে হচ্ছে এখনই বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
হঠাৎ বাইরে থেকে শাশুড়ীর গলা শোনা গেল-বউমা, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?
নয়নতারা তাড়াতাড়ি দরজার কাছে এসে বললে–না মা–
শাশুড়ী বললে–হ্যাঁ, তোমাকে তাই বলতে এলাম, তুমি এতদূর থেকে এসেছ, জেগে থাকবার দরকার নেই, কিন্তু দরজায় যেন খিল দিও না, কিছু ভয়ডর নেই এখানে। খোকা খেয়ে-দেয়ে এই ঘরেই শুতে আসবে—
কথাটা শুনেই নয়নতারার বুকটা ছাঁৎ করে উঠলো। শাশুড়ী কথাটা বলে আবার তার নিজের কাজে চলে গেল। কিন্তু নয়নতারার মনের মধ্যে তার জের চলতে লাগলো অনেকক্ষণ ধরে।
প্রকাশ মামা দিদির কাছে এসেছিল। জিজ্ঞেস করলে–কী হলো দিদি? বউমা দরজা খুলে শুয়েছে?
দিদি বললে–হ্যাঁ, পাছে দরজায় খিল দিয়ে দেয় তাই বলে এলাম—
তারপর যেন মনে পড়লো। জিজ্ঞেস করলে–খোকাকে পেলি?
প্রকাশ মামা বললে–সেই তাকে খুঁজতেই তো গিয়েছিলুম। কোথাও নেই। বারোয়ারিতলায় গোপাল কেদার ওদের সঙ্গে দেখা হলো। সবাই তাস খেলছে। ওরা বললে–সদা ওখানে অনেকক্ষণ ছিল। বসে বসে তাস খেলা দেখছিল, তারপর কখন কোথায় চলে গেছে কেউ টের পায় নি–
–তাহলে কোথায় গেল?
প্রকাশ মামা বললে–তারপর বারোয়ারিতলা থেকে আমি ওদের যাত্রা পার্টির ক্লাবে গিয়েছিলুম, সেখানে দেখি ওদের ‘পাষাণী’র রিহার্সাল চলেছে। পূজোর সময় পাষাণী প্লে হবে কিনা। সেখানে গিয়েও জিজ্ঞেস করলুম, তারা বললে–বাড়ির দিকে গেছে সদা। তাই ভাবলুম হয়ত বাড়ির দিকেই এসেছে সে, বাড়িতে এসে দেখি সে আসে নি–এখন কী করা যায় বলে দিকিনি। আমি তো মহা ভাবনায় পড়লুম–
