প্রকাশ মামা বলতো–তুমি অত ভাবছো কেন বলো তো দিদি। আমিও তো আছি। আমাকে যদি তুমি এ-কথা আগে বলতে তো অনেক আগেই আমি মুশকিল আসান করে দিতুম। তুমিও বলো নি, সদাও কিছু বলে নি। আমি ভেবেছি সদা ফুলশয্যের রাত্তিরে বউয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়েছে। আমি কি এ-সব ছাই আগে জানতুম!
দিদি বলতো–তুই কী করে ঠিক করতিস?
প্রকাশ মামা বলতো–আমি? আমি কী করে ঠিক করতুম তা আমি এবারই দেখিয়ে দেব তোমাকে। আমি সদাকে বউমার শোবার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরের দরজায় শেকল তুলে দেব। দেখি কী করে সদা বউকে রেখে পালায়! তাহলে আর এত যাগ-যজ্ঞ করতে হতো না, আর এত টাকাও খরচ করতে হতো না।
তারপরই আবার নিজেকে শুধরে নিয়ে বলতো–তা যাগ-যজ্ঞ করছো ভালোই করছো। বাবাজী ওদিক থেকে কল চালাবে আর আমি এদিক থেকে কল চালাবো, দেখি এবারে বাছাধন কী করে পার পায়?
দোতলায় বসে কর্তাবাবুর কানে সব শব্দই যায়।
বলেন–বেহারি পালের বড় বাড় বেড়েছে কৈলাস, বড় বাড় বেড়েছে–এত বাড় ভালো নয়
কৈলাস গোমস্তাও সায় দেয়। বলে–হ্যাঁ কর্তাবাবু, আপনি ঠিকই বলেছেন, বড় বড় বেড়েছে
কর্তাবাবু বলেন–সুদখোর মানুষ তো। সুদখোররা এদিকে পয়সার পিশাচ আর বাইরে ওই দেব-দ্বিজে ভক্তি, ওই কাঁসর-ঘণ্টা শাঁখ ও-সব ভড়ং–
হঠাৎ দীনু এসে খবর দিলে–কেষ্টনগর থেকে বউমা এসেছে–
কর্তাবাবুর মুখ প্রসন্ন হলো। কাঞ্চন স্যাকরাকে কুড়ি ভরির হার গড়াতে দিয়েছেন। একশো টাকা বায়নাও দিয়েছেন তার জন্যে। তার গয়না গড়ানো সার্থক হোক!
জিজ্ঞেস করলেন–বউমাকে কে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে?
–আজ্ঞে বউমার বাবা।
এই-ই প্রথম বলতে গেলে কালীকান্ত ভট্টাচার্য মেয়ের শ্বশুরবাড়ি এলেন। মেয়ের বিয়ের আগে একবার এসেছিলেন, কিন্তু সে আসা বেয়াই হিসেবে আসা নয়। এ বাড়ির কুটুম হিসেবে এই-ই তার প্রথম আসা। কিন্তু বেশিদিন যে তিনি থাকতে পারবেন না সেটা প্রথমেই জানিয়ে দিলেন। দুপুরে এলেন আবার বিকেলের গাড়িতেই চলে যাওয়া।
বললেন–থাকলে কি আমার চলে বেয়াই মশাই, ওদিকের কাজ-কর্ম তো সবই ফেলে রেখে এসেছি–আর বাড়িতেও তো কেউ নেই। বাড়িও একেবারে ফাঁকা রয়েছে।
তারপর বউমার মায়ের কথা উঠলো। শেষকালে কী হয়েছিল, ডাক্তার দেখে কী বললে, আগে কোনও অসুখ-বিসুখ হয়েছিল কিনা। জীবন-মৃত্যু সম্পর্কে যে-সব বাঁধা বুলি সবাই-ই বলে থাকে সেই সব কথাও হলো। জীবনকে যারা বেশি আঁকড়ে ধরে থাকে তারাই জীবনের অনিত্যতা সম্বন্ধে বেশি মুখর। তাই কর্তাবাবুই বেশি করে জীবনের নশ্বরতা সম্পর্কে বক্তৃতা করতে লাগলেন।
কালীকান্ত ভট্টাচার্য বললেন–আমাদের শাস্ত্রে আছে ফল যখন পাকবে তখন তার বোঁটা আলগা হবেই, তা তার জন্যে আমার দুঃখ নেই। কিন্তু অকালমৃত্যুটাই দুঃখের কারণ। আমার গৃহিণীর বয়েস হয়েছিল তাই তিনি গেছেন। তাই আমি তার জন্যে কোনও দুঃখ করি নে কর্তাবাবু। আর তিনি তো নিজের হাতেই নয়নতারার বিয়ে দিয়ে গেছে। দেখে যেতে পেরেছেন কন্যা তাঁর সৎপাত্রেই পড়েছে–
প্রকাশ মামা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সে বললে–সৎ পাত্র যে তাতে আর কোনও সন্দেহ নেই, সদানন্দ আমার ভাগ্নে বলে বলছি না, অমন সৎ পাত্র এ-যুগে জন্মায় না বেয়াই মশাই। আমি নিজে সে-সম্বন্ধে সার্টিফিকেট দিচ্ছি–
ভট্টাচার্যি মশাই হঠাৎ বললেন–কই, আমার বাবাজীকে তো দেখছি নে? কোথাও কাজে গেছে বুঝি?
চৌধুরী মশাই বললেন–হ্যাঁ, একটু বেরিয়েছে–
প্রকাশ মামা বাকিটা পূরণ করে দিলে। বললে–সদার কাজের কি অন্ত আছে বেয়াই মশাই। এই এত বড় জমিদারি সবই বলতে গেলে একলা ওই সদাই দেখছে। জামাইবাবু বুড়ো হয়ে গেছে তো, তাই সদা বাবাকে বলেছে–তোমাকে কিছুছু দেখতে হবে না বাবা, এবার থেকে আমি নিজেই সব দেখবো–
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–উপযুক্ত ছেলের মতই কথা বলেছে–
প্রকাশ মামা বললে–উপযুক্ত ছেলে মানে? সদা কি ভাবছেন উপযুক্ত ছাড়া অনুপযুক্ত কথা বলবে? বাপ-ঠাকুর্দার তেমন শিক্ষাই নয় বেয়াই মশাই। এই যে আমার জামাইবাবুকে দেখছেন, ইনিও বাপের উপযুক্ত ছেলে। এই এখনও এই বুড়ো বয়েস পর্যন্ত জামাইবাবু বাপ বলতে অজ্ঞান–। আপনার মেয়ের অনেক পুণ্যবল তাই এমন বংশে পড়েছে–
প্রকাশ মামা একটু আবার বলে উঠলো–আর তা ছাড়া এই আমার কথাই ধরুন না, আমি তো এবংশের কেউ নই, কিন্তু সদা ঠিক আমার ক্যারেক্টারের ধাঁচ পেয়েছে। আমি পিতৃ-মাতৃ ভক্ত, সদাও পিতৃ-মাতৃ ভক্ত। আপনাদের সংস্কৃতে যে শ্লোক আছে না, নরানাং মাতুলঃ ক্রমঃ, সদা একেবারে হুবহু তাই…
কথাটা বলে প্রকাশ মামা চৌধুরী মশাই-এর দিকে চাইলে। বললে–কী বলেন জামাইবাবু, ঠিক বলি নি?
কেউ তার কথায় সায় দিলে না দেখে প্রকাশ মামা তখন অন্য প্রসঙ্গ ওঠালো। বললে– তবে হ্যাঁ, একটা কথা, আপনি বেয়ানের শ্রাদ্ধে খাইয়েছিলেন বটে। বুঝলেন জামাইবাবু, অমন খাওয়া আমি বহুদিন খাই নি। আমি বোধ হয় দু’ডজন সরভাজা খেয়েছি। আঃ কী সোয়াদ–
কিন্তু এ কথাটাও কারো মনে গিয়ে দাগ কাটলো না। ওদিকে ভট্টাচার্যি মশাইএরও যাবার সময় হয়ে যাচ্ছিল। তিনি বললেন–এবার আমাকে উঠতে হয় বেয়াই মশাই–
যাবার আগে একবার মেয়ের সঙ্গে দেখা করবেন। প্রকাশ মামা সে ব্যবস্থা করে দিলে। বেয়াই মশাইকে একেবারে অন্দরমহলে নিয়ে গেল। ভট্টাচার্যি মশাই ঘরে ঢুকে চারিদিকে চেয়ে দেখলেন। বেশ সাজানো ঘর। আসবাবপত্রে মোড়া, দামী আয়না, দামী আলমারি, দামী চাদরে ঢাকা বালিশ বিছানা। তিনি নিজে ফুলশয্যার তত্ত্বের সঙ্গে যা পাঠিয়েছিলেন তা ছাড়াও আরো অনেক আসবাব দিয়েছে মেয়ের শ্বশুর-শাশুড়ী। ভট্টাচার্যি মশাই-এর মনটা ভারি হয়ে উঠলো। এসব কিছুই দেখে যেতে পারলে না নয়নতারার মা। মেয়ের এই সুখ এই ঐশ্বর্য চোখে দেখতে পেলে তিনিও খুশী হতেন।
