ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–আরে বাপু, জামাই কি আমার বেকার মানুষ যে বললেই হুট করে চলে আসবে! জমিদার মানুষ, কাজকর্ম থাকতে নেই? হয়ত কোর্টকাছারির দিন পড়েছে। তা জামাই না এলেও মামাকে তো পাঠিয়ে দিয়েছে–
–কিন্তু বেয়াই মশাই? বেয়াই মশাই একবার আসতে পারতেন না?
–তোমরা বিশ্বনিন্দুক। সবাই তোমরা বিশ্বনিন্দুক হে! বেয়াই মশাইদের কত বড় জমিদারি কত বড় তালুক তা তোমরা জানো? না যদি জানো তো ওই বিপিন দাঁড়িয়ে রয়েছে, বিপিনকেই জিজ্ঞেস করো না। বিপিন ফুলশয্যার তত্ত্ব নিয়ে গিয়েছিল। ও দেখে এসেছে। এক হাজার লোক পাত পেড়ে কালিয়া পোলোয়া খেয়ে গিয়েছে। আর নয়নতারাও তো ছিল, ওকেও জিজ্ঞেস করো। ও–ও দেখেছে। ওর শাশুড়ী কত বড় সীতাহার দিয়েছে দেখেছ? ওজন করলে অন্তত দু’শো ভরি হবে–
প্রশ্নকর্তারা দু’শো ভরি ওজনের কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। বলে–না, না, কী যে বলেন আপনি পণ্ডিত মশাই, দু’শো ভরির হার কখনও নয়–
–কখনও নয়? আচ্ছা এখখুনি প্রমাণ করে দিচ্ছি–ও নয়ন, নয়ন–
বলে তখনি পাশের ঘরে চলে যান। একেবারে নয়নতারার সামনে গিয়ে দাঁড়ান। বলেন– হ্যাঁরে তোর শাশুড়ী যে-হারটা তোকে গায়েহলুদে দিয়েছিল সেটার ওজন কত রে? দু’শা ভরি নয়? নিখিলেশ বলে কি না, দুশো ভরি কখনও হতে পারে না–
নয়নতারা বলে–আমি জানি না–
-জানি না মানে? তুই সে হার দেখিস নি? তুই আয় না আমার সঙ্গে, একবার বাইরে আয়। ওদের বুঝিয়ে বলবি আয় তো!
নয়নতারা আর পারে না। বলে–তুমি চুপ করো তো বাবা। আমি বলতে পারবো না–
–আয় না মা, আয় না। একবার এলে তোর ক্ষতিটা কী?
নয়নতারা শেষকালে অধৈর্য হয়ে ওঠে। বলে–তুমি যাও তো বাবা, আমি যেতে পারবো না, আমায় আর বিরক্ত করো না তুমি যাও
বলে নিজের দুই হাতে নিজের মুখটা ঢেকে ফেলে।
কিন্তু মুখ ঢাকলেই কি আর মান ঢাকা যায়! যার নিজের মান ঢাকবার দায় পরের ওপর নির্ভরশীল, তার মান-অপমানের দামই বা কতটুকু! কতটুকুই বা তার দায়িত্ব। কেমন করেই বা পরের অপরাধ সে তার মুখের কথা দিয়ে ঢাকবে! একটা পাতলা লজ্জাবস্ত্র দিয়ে যে তার সমস্ত মান-সম্ভ্রমের দায়িত্ব নেবার শপথ নিয়েছে তার পক্ষ নিয়ে কৈফিয়ৎ দেওয়াটাই তো লজ্জাকর। এ যেন সেই চোরের পক্ষ নিয়ে চোরের মা’র গলাবাজি।
তবু আশ্চর্য, শেষ পর্যন্ত আবার মাথা নিচু করে সেই অপরাধীদের কাছেই কিনা আসতে হয়। মেয়ে-মানুষের জীবনে এ-বিড়ম্বনার চেয়ে বুঝি বড় বিড়ম্বনা আর কিছু নেই। তাই বাবার সঙ্গে যখন আবার নয়নতারা নবাবগঞ্জে তার শ্বশুরবাড়িতে এসে নামলো তখন কে যেন ঘোমটা দেওয়া নিচু মাথাটাকে আরো নিচু করে দিয়ে তবে অব্যাহতি দিলে।
কিন্তু ততদিনে চৌধুরীবাড়িতে আরো অনেক কাণ্ড ঘটে গেছে। সন্ধ্যেবেলা শাখ-কাঁসর ঘন্টা বাজে আর বাবাজী যজ্ঞ করে। যজ্ঞের সময় বাবাজীর সে কী মুর্তি। যজ্ঞের মন্ত্র পড়া। দেখে চৌধুরী মশাই-এর গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। প্রীতিও যজ্ঞস্থলে গলাবস্ত্র হয়ে হাত-জোড় করে বসে থাকে।
বাবাজী মন্ত্র পড়তে পড়তে এক-একবার বিকট চিৎকার করে ওঠেন–মা মা—মা–
প্রকাশ মামা আর থাকতে পারে না। দু’হাতে গায়ের জোরে কাঁসরে ঘা দেয়। আর চেঁচিয়ে ওঠে–জয়, জয় জগদম্বা–
এব্যাপারে প্রকাশ মামারই যেন সব চেয়ে বেশি উৎসাহ। এই সেদিন বাড়িতে একটা বিয়ের ঘটা গেছে। তখন গোগ্রাসে গিলেছে কদিন ধরে। তার পরে গেছে কেষ্টনগরে শ্রাদ্ধ বাড়িতে। সেখানেও গণ্ডে-পিণ্ডে খেয়েছে। সেখান থেকে এসেই আবার এই উৎসব। উৎসব মানেই সেবা। বাবাজী তো আহার করেন না, শুধু সেবা করেন। প্রকাশ মামাও এসে পর্যন্ত আহার করা ছেড়ে দিয়ে সেবা শুরু করে দিয়েছে। গাওয়া ঘিয়ে ভাজা দিস্তে দিস্তে ময়দার লুচি, নলেনগুড়ের কাঁচাগোল্লা, বেলের পানা, মিছরির সরবৎ, পেস্তাবাদাম আর আরো কত রকমের মেওয়া।
বাবাজী বলেন–যজ্ঞ সার্থক করতে হলে মনটা সাত্ত্বিক করার সঙ্গে সঙ্গে সাত্ত্বিক সেবাও চাই–
প্রকাশ মামা বলে–নিশ্চয়ই, সাত্ত্বিক সেবাই শ্রেষ্ঠ সেবা বাবাজী। ওতে মনটাও ভালো থাকে, পেটটাও তেমনি–
এই সাত্ত্বিক সেবার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ মামার পেটটা ভালো যাচ্ছিল বলে মনটাও বেশ উদার হয়ে উঠছিল। সে বলতো আপনি কিছু ভাববেন না জামাইবাবু, ও সদা এবার ঠিক হয়ে যাবে। দেখবেন একেবারে কেঁচোর মতন বউ-এর পায়ে লেপটে থাকবে–
লেপটে থাকলেই ভালো। চৌধুরী মশাই সেই ভরসাতেই দু’হাতে টাকা খরচ করেন। কাজকর্ম সব ছেড়ে-ছুঁড়ে বাবাজীর পায়ের ওপর পড়ে আছেন।
প্রীতি ভক্তিগদগদ হয়ে বাবাজীকে প্রশ্ন করতো আমার ছেলে সংসারী হবে তো বাবা?
বাবাজী বলতেন–হবে না মানে? ওর কপালে ভৃগু-পদচিহ্ন রয়েছে, আর সংসারী হবে না?
প্রীতির বোধ হয় তবু সন্দেহ যেত না। জিজ্ঞেস করতো–কবে সংসারী হবে বাবা?
বাবাজী বলতেন–তোর বউমা এবার আসুক, বউমা এলেই দেখতে পাবি কেমন সংসারী হয়েছে তোর ছেলে।
প্রীতি জিজ্ঞেস করতো–তা আমার ছেলে বউতে ভাব হবে তো?
–হ্যাঁ রে হ্যাঁ, হবে। আমি যখন বলছি তখন হবেই–দেখে নিস–
–বউ-এর সঙ্গে একঘরে শোবে তো বাবা? ফুলশয্যার রাত্তিরে সারারাত আমি বউমার সঙ্গে শুয়েছি বাবা। আমার কপালে সে যে কী কষ্ট গেছে তা আপনাকে আমি আর কী বলবো! বউমাও যত কাঁদে আমিও তত কাদি। এত কান্নার ফল ফলবে তো বাবা?
