কুড়ি ভরির একটা হার। তার ওপর মিনের কাজ করা। লোকে দেখে যেন বলে– হ্যাঁ, কর্তাবাবু একটা জিনিসের মত জিনিস দিয়েছে বটে!
বাইরে এসে কাঞ্চন স্যাকরা টাকাগুলো ভালো করে ট্যাঁকে গুঁজে নিলে। কৈলাস গোমস্তা সঙ্গে সঙ্গে আসছিল। কাঞ্চন জিজ্ঞেস করলে–আচ্ছা গোমস্তা মশাই, কার জন্যে এ হার গড়ানো হচ্ছে বলুন তো? এ কাকে দেবার জন্যে? কর্তাবাবু কাকে হার দেবেন?
কৈলাস হাসতে লাগলো। বললে–চৌধুরী মশাই-এর নাতির জন্যে
–চৌধুরী মশাইয়ের নাতি? কিন্তু এই তো সবে সেদিন চৌধুরী মশাই-এর ছেলের বিয়ে হলো, এর মধ্যে নাতি হয়ে গেল তার? এখনও তো দশ মাস হয় নি গো?
কৈলাস গোমস্তা আরো হাসতে লাগলো। বললে–নাতি হয় নি, কিন্তু হবে তো একদিন!
কাঞ্চন অবাক হয়ে গেল। যে নাতি হয় নি তারই জন্যে কর্তাবাবুর এত হাঁক ডাক! একেবারে এই মারে তো সেই মারে! যেন নাতির অন্নপ্রাশন আটকে যাচ্ছে হারের জন্যে!
কৈলাস গোমস্তা বললে–পাগল হে কাঞ্চন, আস্ত পাগল। নেহাৎ চাকরি করতে হয় তাই এত কথা শুনি নইলে আমাকে তো দুবেলায় যাচ্ছেতাই করে বলেন। তুমি ভেবেছ চৌধুরী মশাই-এর নাতি হবে? হবে না। তুমি দেখে নিও, হবে না–
–হবে না? হবে না মানে?
কৈলাস বললে–সে-সব পরে তোমাকে বলবো। তুমি এখন যাও–
কাঞ্চন বললে–কিন্তু শেষকালে হার নেবেন তো কর্তাবাবু? নইলে আমার মেহনতই যে সার হবে গোমস্তা মশাই?
কৈলাস বললে–আরে তোমার কী? তুমি মাল দেবে পয়সা নেবে। চৌধুরী মশাই-এর নাতি হোক না-হোক তোমার কী? তুমি তো মজুরী পেলেই খুশি!
–কিন্তু কেন নাতি হবে না গোমস্তা মশাই?
কৈলাস গোমস্তা তখন বাড়িতে খেতে যাচ্ছিল। তার খিদে পেয়ে গিয়েছিল। বললে– আরে, তোমার কেবল ওই এক কথা। বলছি তো সে তোমাকে পরে বলবোখন। আমি আসি–
বলে কৈলাস বাড়ির দিকে চলে গেল।
.
কালীগঞ্জের বউ যে একদিন কর্তাবাবুকে নির্বংশ হবার অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিল সে কথাটা এখন কাউকে না বলাই ভালো। ওটা চাপা থাক। ওটা আর কারো মনে না থাকলেও শুধু কৈলাস গোমস্তারই মনে থাকুক। যে-কথাটা মনে করলেও বুকটা কেঁপে ওঠে সেটা তোমাদের কারো জানবার দরকার নেই। দশ হাজার টাকা মাত্র! দশ হাজার টাকার খেসারত দেবে কর্তাবাবুর নাতি! সেই খেসারত দেবার বৃন্তান্ত কাঞ্চন স্যাকরা নাই বা জানলো!
তা সত্যিই কেষ্টনগর থেকে একদিন বেয়াই মশাই-এর চিঠি এসেছিল।
শ্রাদ্ধশ্রান্তি নির্বিঘ্নে চুকে গেছে। তিনি নিজেই নয়নতারাকে নিয়ে নবাবগঞ্জে আসছেন।
কিন্তু এ আসা বড় মর্মান্তিক আসা। নিয়ম ছিল মেয়ের সন্তান না হলে বাবা-মা কাউকেই বেয়াই বাড়িতে আসতে নেই! কিন্তু কী করা যাবে? আর কে আছে তার? কার সঙ্গে পাঠাবেন মেয়েকে?
নয়নতারা বলেছিল–বাবা এত তাড়াতাড়ি কেন আমাকে পাঠাচ্ছো, আর কিছুদিন না-হয় তোমার কাছে থাকি। আমি চলে গেলে কে তোমার দেখাশোনা করবে?
কালীকান্ত ভট্টাচার্য মশাই-এর কিন্তু অনেক সহ্যক্ষমতা। পাছে মেয়ের কান্না পায় তাই স্ত্রী-বিয়োগের শোকে মেয়ের সামনে নিজেও কোনোদিন কাঁদেন নি। মেয়ের সামনে বলেছেন–তাতে কী হয়েছে মা! মানুষ কি চিরকাল বাঁচে? একদিন না একদিন তো তাকে যেতেই হয়। তোমার মাও তাই চলে গেছেন–
এও এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে তার ঠিক নেই। মেয়ে বাবার মুখের দিকে চায় আর বাবা চায় মেয়ের মুখের দিকে। তবু যে তিনি যাবার আগে মেয়ের বিয়ে দিয়ে যেতে পেরেছেন এইটেই তো সান্ত্বনা। নইলে কী হতো বলো তো মা!
ভট্টাচার্য মশাই বলেন–তুমি আমার জন্যে ভেবো না মা। আমার ছাত্ররা রয়েছে তারাই আমাকে দেখবে।
মেয়ে বলে–তুমি তোমার শরীরের দিকে একটু দেখো বাবা। তুমি নিজেকে না দেখলে কেউ তোমাকে দেখবে না।
–সে তোকে বলতে হবে না রে। আমি দেখবি ঠিক চালিয়ে যাবো। আমার তো কোনও অসুখ নেই
–অসুখ না-ই বা থাকলো, অসুখ হতে কতক্ষণ! এতদিন মা ছিল তাই তোমাকে দেখেছে, এখন তো আর মা নেই! আর আমাকেও তো তুমি আবার নবাবগঞ্জে পাঠিয়ে দিচ্ছ। আমি আর কিছুদিন থাকলে কী এমন ক্ষতি হতো!
ভট্টাচার্যি মশাই বলেন–আমার কিছু ক্ষতি হতো না মা, কিন্তু তোর?
–বা রে, আমার কী ক্ষতি?
ভট্টাচার্যি মশাই বলেন—না না মা, তোর শ্বশুর-শাশুড়ী, সদানন্দ তারা কী ভাববে বল দিকিন–
মেয়ে বলে–হ্যাঁ, আমার জন্যে তাদের ভাবতে বয়ে গেছে। আমার কথা যদি তারা এতই ভাবতো তো এতদিনের মধ্যে তারা অন্তত একবার একখানা চিঠি দিত। কই, মার শ্রাদ্ধে তো খবর দিয়েছি, তা তারা কেউ এল?
কথাটার মধ্যে যুক্তি আছে। সত্যিই তো, তারা তো কেউই আসেনি। শুধু মেয়ের মামাশ্বশুরকে পাঠিয়ে দিয়েছিল একবার নামমাত্র। তাও তো আবার নিজের মামাশ্বশুর নয়।
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–তাই তো মা, সদানন্দও তো একবার আসতে পারতো?
মেয়ে বলে–কেন আসবে? কেন আসতে যাবে তারা?
ভট্টাচার্যি মশাই বললেন–সে কি কথা, আসবে না? জ্ঞাতি কুটুমের বিপদে-আপদে আসবে না?
মেয়ে বলে–না, তারা আসবে না। বড়লোক কেন গরীব লোকের বাড়ি আসবে? তুমি তো বড়লোক বলেই তাদের বাড়িতে আমার বিয়ে দিয়েছিলে! আমি খেয়ে পরে সুখে থাকবো বলে তোমার লোভ লেগেছিল। এখন? এখন দেখলে তো?
এসব কথা শুনে ভট্টাচার্য মশাই মনে মনে কষ্ট পেয়েছেন। পাড়ার লোকেরাও কেউ কেউ মন্তব্য করলে। বললে–এত বড় একটা কাণ্ড হলো, অথচ জামাই তো কই এল না–
