তারপর হঠাৎ যেন কাজের কথা মনে পড়ে যেত কর্তাবাবুর। বলতেন–তারপর কী হলো কৈলাস, তারপর পড়ে যাও–
একটা অর্ধ সাপ্তাহিক বাংলা খবরের কাগজ কিনতেন কর্তাবাবু। কৈলাস গোমস্তা সেটা অবসরমত পড়ে পড়ে শোনাতো।
–কই, থামলে কেন? পড়ে যাও?
কৈলাস গেমস্তা ভালো করে পড়তে পারতো না। হোঁচট খেতে খেতে পড়তো–
বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত সংবাদে প্রকাশ, বরোদার মহারাজা গাইকোয়াড আজ কলিকাতায় আসিয়া পৌঁছাইতেছেন…
কোথাকার কোন্ গাইকোরাড, সে কোন্ দেশ, কে তার মহারাজা, কেনই বা তার নাম গাইকোয়াড তা কৈলাসও যেমন জানতো না, কর্তাবাবুও তেমনি জানতেন না। তবু খবরের কাগজে যখন খবরটা বেরিয়েছে তখন তিনি নিশ্চয়ই কেষ্ট-বিষ্ণু কেউ হবেন। আর মহারাজা মানুষ যখন নিশ্চয়ই তিনি অনেক টাকার মালিক! অনেক টাকার মালিকদের ওপর কর্তাবাবুর খুব শ্রদ্ধা ছিল বরাবর।
কর্তাবাবু বলতেন–আচ্ছা কৈলাস, মহারাজাদের অনেক টাকা আছে, কী বলো?
কৈলাস বলতো-আজ্ঞে, তা তো আছেই–
তা কত টাকা থাকতে পারে মহারাজাদের?
মহারাজাদের কত টাকা থাকতে পারে তার কোনও আন্দাজ জানা ছিল না কৈলাসের। তবু আন্দাজ করে বলতো–দশ বারো লাখ টাকা নিশ্চয়ই–
কর্তাবাবু বলতেন–আরে দূর দশ-বারো লাখ টাকা কি আবার টাকা! তোমার যেমন বুদ্ধি! আমারই তো দশ বারো লাখ টাকার সম্পত্তি আছে। তুমি তো হিসেব জানো, হিসেব করো না–
হিসেব অবশ্য শেষ পর্যন্ত করতে হতো না। কৈলাস জানতো কর্তাবাবু কত টাকার সম্পত্তির মালিক। কিন্তু মহারাজাদের কাছে কখনও গোমস্তাগিরি করে নি বলে তাদের টাকার অঙ্কটাও আন্দাজ করতে পারতো না কৈলাস গোমস্তা।
ভেবে ভেবে শেষ পর্যন্ত যখন কোনও ফয়সালা হতো না তখন অন্য প্রসঙ্গ উঠতো। কর্তাবাবু জিজ্ঞেস করতেন–তা সে যাকগে, গাইকোয়াড মহারাজা কলকাতাতে আসছেনই বা কেন বলো তো? তোমার কী মনে হয় কৈলাস?
কৈলাস বলতো–আজ্ঞে, আমি সামান্য লোক, আমি কী করে তা জানবো!
–তা সামান্য লোক হলেই বা, একটু মাথা খাটিয়ে ভাবো না, কেন আসছে মহারাজা? কাগজে কিছু লিখেছে সে সম্বন্ধে?
কৈলাস পাঁতিপাঁতি করে খুঁজেও মহারাজার কলকাতায় আসার কোনও হদিস পেলে না। শুধু মহারাজার আসার খবরটাই ছাপা হয়েছে, কোনও কারণের উল্লেখ নেই কোথাও।
কর্তাবাবু খুঁজে খুঁজে অনেক কষ্টে একটা কারণ বার করলেন। বললেন–বুঝলে কৈলাস, আমার মনে হয় মহারাজা আসছে শিকার করতে
–শিকার?
–হ্যাঁ, বাঘ শিকার করতে আসছে, বুঝলে? কলকাতার কাছেই তো সুন্দরবন। সুন্দরবনে অনেক রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার আছে, তা-ই শিকার করতে আসছে। বুঝতে পেরেছি। নইলে সেই বরোদা থেকে মহারাজা কলকাতায় আসবেনই বা কেন?…তারপর অন্য কী খবর আছে, পড়ো–
এই রকম করেই দিন কাটতো কর্তাবাবুর। সদানন্দের বিয়ের পর থেকেই কর্তাবাবুর মনটা বেশ সরেস ছিল, তাই খবরের কাগজের খবরে বেশি মন দিতেন। কখনও বরোদার গাইকোয়াডের কলকাতায় আসার খবর, কখনও ধান-চাল-পাটের দর, আবার কখনও বেহারি পালের টাকার গরমের কথা। সব কথাই হতো।
হঠাৎ একদিন কৈলাস বললে–কেষ্টনগরের চিঠি এসেছে কর্তাবাবু
–চিঠি? কে লিখেছে? বউমার বাবা? বউমা আসছে নাকি?
–আজ্ঞে হ্যাঁ, শ্রাদ্ধশ্রান্তি মিটে গেছে তো, এবার আসছেন বউমা।
কথাটা বলতেই মনে পড়ে গেল কর্তাবাবুর। বললেন–কই, তুমি তো কাঞ্চন স্যাকরাকে ডাকলে না কৈলাস? আমি যে তোমাকে ডাকতে বলেছিলুম।
–আজ্ঞে, আমি তো খবর দিয়েছিলুম।
–তা তবু সে এল না কেন? তাহলে আবার একবার ডেকে পাঠাও তো—
কাঞ্চন স্যাকরাকে শেষ পর্যন্ত একদিন লোক পাঠিয়েই ডেকে আনতে হলো। কাঞ্চন আসতেই কর্তাবাবু খুব একচোট ধমক দিলেন। বললেন–তুমি যে একেবারে লবাব-পুত্তুর হয়ে গেলে হে, কাঞ্চন! তোমার বুঝি খুব টাকা হয়েছে? টাকার গরম হয়েছে খুব? তা অতই যদি টাকার গরম তো তুমি এলে কেন হে বাপু? না এলেই পারতে!
কাঞ্চন খুব বিনয় করে জানালে যে তার অসুখ হয়েছিল বলেই এতদিন আসতে পারে নি। নইলে আগেই আসতো ইত্যাদি ইত্যাদি…
কিন্তু তবু কিছুতেই কর্তাবাবুর রাগ কমে না। বললেন–তুমি বেরিয়ে যাও। আমার চোখের সামনে থেকে বেরিয়ে যাও। আমি তোমাকে দিয়ে আর জীবনে কখনো গয়না গড়াবো না। যাও–তুমি বেরিয়ে যাও–
এ-সব কথা যে রাগের কথা তা কাঞ্চন স্যাকরা জানতো।
শেষকালে বুঝি অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর কর্তাবাবুর রাগ কমলো।
বললেন–তুমি আমার গয়না গড়াবে কিনা আগে সেই কথা বলে দাও, নইলে বাজারে অন্য অনেক স্যাকরা আছে। স্যাকরার অভাব নেই দুনিয়াতে। পয়সা ফেললে অমন তোমার চেয়ে অনেক ভালো ভালো স্যাকরা এসে আমার খোশামোদ করবে, তা জানো?
তারপর একটু কেশে নিয়ে বললেন–তুমি ভেবেছ কী শুনি? তুমি ভেবেছ কী? তুমি কী ভেবেছ তুমি ছাড়া বাড়ির নাতি-নাতবউ-এর গয়না গড়াবার লোক পাব না।
শেষকালে একসময় কর্তবাবু কাঞ্চন স্যাকরাকে ক্ষমা করলেন। শুধু যে ক্ষমা করলেন তাই নয় আগাম টাকাও দিলেন শখানেক। ওটা বায়না। কাঞ্চন বায়না নিতে চায় নি। তবু কর্তাবাবু টাকাটা দিলেন। বললেন–ওটা তুমি নাও কাঞ্চন। তুমি গরীব লোক, তুমি টাকা পাবে কোত্থেকে? টাকা না পেলে তোমার চাড় হবে না। আমার অনেক টাকা আছে, বুঝলে? গাইকোয়াডের মহারাজাদের মত টাকা নেই বটে, কিন্তু টাকা আমার অনেক আছে। সোজা কথা, জিনিসটা ভালো আর খাঁটি হওয়া চাই–এটা মনে রেখো
